সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

ক্লিনার-বাবুর্চির হাতে স্বাস্থ্যের গুরুভার

প্রকাশিত: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০৬ পিএম

আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:২২ পিএম

ক্লিনার-বাবুর্চির হাতে স্বাস্থ্যের গুরুভার

আপনি কি জানেন, আপনার মেডিকেল রিপোর্টটি কে তৈরি করছেন? অনুসন্ধান বলছে, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে কোটি কোটি টাকার আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামাদির বেশিরভাগের নিয়ন্ত্রণ এখন মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের পরিবর্তে আউটসোর্সিং কর্মীদের হাতে। প্যাথলজি ও রেডিওলজির মতো অতি স্পর্শকাতর বিভাগগুলোয় দক্ষ জনবল থাকা সত্ত্বেও অদক্ষ ও অস্থায়ী কর্মীদের মাধ্যমে মেডিকেল রিপোর্ট তৈরি করা হচ্ছে। জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে থাকা রোগীদের জন্য ভুল রিপোর্টের এই ঝুঁকি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নত যন্ত্রপাতির সঠিক পরিচালনা ও নির্ভুল রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এই অব্যবস্থাপনা এখন চিকিৎসা খাতের বড় সংকট।

সরেজমিন দেখা যায়, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক্সরে কক্ষের সামনে উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন ষাটোর্ধ্ব আছমা খাতুন (৬৫)। ভেতরে তার জীবন-মরণ পরীক্ষার মেশিনটি চালাচ্ছেন এমন একজন তরুণ, যিনি হাসপাতালটিতে নিয়োগপ্রাপ্ত ওয়ার্ডবয় আউটসোর্সিং কর্মী। জানা গেছে, তার নাম সবুজ সরকার। তার প্রাতিষ্ঠানিক কোনো ডিগ্রি নেই, নেই কোনো টেকনিশিয়ান হিসেবে লাইসেন্স। সরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ টেকনোলজিস্টদের বদলে দেশের সব সরকারি হাসপতালে এখন এভাবেই আউটসোর্সিং কর্মীদের হাতে শপে দিতে হচ্ছে লাখ লাখ রোগীর জীবন। যা সরকারের আউটসোর্সিং নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং সাধারণ জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। 

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগে কর্মরতদের একটি তালিকা দৈনিক এদিনের হাতে এসেছে। তালিকায় দেখা যায়, রোকেয়া (পদ ক্লিনার ) কাজ করছেন রেডিওলজি বিভাগে এক্সরে পজিশন কাজে। রিপন ব্যাপারী (পদ ওয়ার্ডবয়), কাজ করছেন রেডিওলজি বিভাগে এক্স-রে এক্সপোজার অপারেটর হিসেবে। ইমরান হোসেন (পদ ওয়ার্ডবয়), কাজ করছেন সিটি স্ক্যান পজিশন কাম অপারেটর হিসেবে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মবহির্ভূত কার্যক্রমে হাসপাতালটির প্রশাসন এ কাজে যাদের দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন তারা হলেন- বিশ্বজিৎ দাস (ওয়ার্ডবয়),  হাফসা আক্তার (ওয়ার্ড বয়) এবং বিলকিল আক্তার (আল্টাসনোগ্রাফি)।

শুধু তাই নয়, এই হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগেও অদক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কাজে ডিগ্রিহীন জনবল (আয়া, ক্লিনার বা বাবুর্চি) দিয়ে রোগীদের রক্ত সংগ্রহসহ রিপোর্ট তৈরি করানো হয়। এ তালিকায় আছেন- তানিয়া নাসরিন সিমু (আয়া), কাজ করছেন মেডিকেল রিপোর্ট তৈরির কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে। শফিকুল আসলাম (পদ ক্লিনার), কাজ করছেন মেডিকেল রিপোর্ট তৈরির বিভাগে। প্যাথলজি বিভাগে আরো আছেন  সুমন শেখ (ক্লিনার), মরিয়ম (আয়া), পার্থ সেন গুপ্ত (সহকারী বাবুচী), মানিক চন্দ্র বর্মণ (সহকারী বাবুর্চী), শফিকুল ইসলাম দুপু (ক্লিনার) এবং মো. হাসিবুর রহমান শাওন (আয়া)।

ল্যাব কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কাজ করছেন আশিক আহমদ (জেনারেটর অপারেটর) আরিফুল হক (ওয়ার্ডবয়), সুমন সিকদার (ক্লিনার) ওজিয়ার রহমান (ক্লিনার), মেহেদী হাসান মুরাদ (ক্লিনার),অলিদ ইসলাম (বাবুর্চী),শফিকুল  ইসলাম ‍দিপু (ক্লিনার), হাসিবুর রহমান শাওন (ক্লিনার), সোহেল রানা (ক্লিনার), কামরুন্নাহার (আয়া), সজিব হোসেন (আয়া), সানজিদুজ্জামান (ক্লিনার) এবং লাবিয়া রাইসা অনি (পাম্প অপারেটর)। 

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্যাথলজি ল্যাবে অদক্ষ জনবল ও নীতিমালার চরম লঙ্ঘন নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপিত হলেও পরিচালক ডা. মোহাম্মদ সেহাব উদ্দিনের ভূমিকা হতাশাজনক। জনস্বাস্থ্যঝুঁকি উপেক্ষা করে তিনি বিষয়টিকে গতানুগতিক ও দায়সারা মন্তব্যে এড়িয়ে গেছেন। 
এমন চিত্র ঢাকাসহ সারাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে। টেকনোলজিস্টের অভাব-অভিযোগের ধুয়া তুলে আউটসোর্সিং কর্মীদের দ্বারা এক্স-রে ও প্যাথলজি পরীক্ষা চালাচ্ছেন। নরসিংদী ১০০ শয্যা হাসপাতালে কাউসার নামে ক্লিনার পদের জনবল দিয়ে এক্স-রে মেশিন পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। 
তথ্য বলছে, সরকারি অর্থ বিভাগের আউটসোর্সিং নীতিমালা ২০১৯-২০২৫ অনুযায়ী, সাংগঠনিক কাঠামোভুক্ত কোনো শূন্যপদে এই পদ্ধতিতে সেবা ক্রয় নিষিদ্ধ। অথচ সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো নীতিমালা লঙ্ঘন করে বিশেষজ্ঞ টেকনোলজিস্টদের পরিবর্তে আয়া, ক্লিনার ও বাবুর্চি দিয়ে রক্ত সংগ্রহ ও রিপোর্ট তৈরির মতো সংবেদনশীল কাজ করাচ্ছে। 

ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সিনিয়র ডাক্তার এদিন-কে বলেন, ‘আমরা ল্যাব রিপোর্ট দেখে চিকিৎসা দিই। কিন্তু ল্যাবে যদি দক্ষ লোক না থাকে, পুরো চিকিৎসায় ভুল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।’ 
বাংলাদেশ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এ্যালায়েন্স (বিএমটিএ) বলছে, নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ডিগ্রিধারী টেকনোলজিস্ট নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে আছে। ফলে হাজার হাজার টেকনোলজিস্ট বেকার রেখে হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে অদক্ষ আউটসোর্সিং কর্মীদের দাপট। যা সরকারি হাসপাতালে মেডিকেল পরীক্ষা- নীরিক্ষায় মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর মতে, প্যাথলজি ও রেডিওলজির মতো সংবেদনশীল খাতে আউটসোর্সিং পদ্ধতি চিকিৎসা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়ার শামিল। আধুনিক যন্ত্রপাতির চেয়েও স্থায়ী ও দক্ষ জনবল নিয়োগই এখন মুখ্য। অন্যথায়, কারিগরি কাজে অদক্ষ কর্মীর ব্যবহার জনস্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকি ও আস্থাহীনতার মুখে ঠেলে দেবে।
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের পরিচালকের বক্তব্যে দেশের স্বাস্থ্যসেবার এক ভয়াবহ ও স্ববিরোধী চিত্র ফুটে উঠেছে। একদিকে তিনি কারিগরি নিখুঁততার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন, অন্যদিকে খোদ তার প্রতিষ্ঠানেই অদক্ষ জনবল দিয়ে স্পর্শকাতর পরীক্ষা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। চিকিৎসায় এই অপেশাদারিত্ব ও কাঠামোগত অব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে বলে মত জনস্বাস্থ্য বিশেষকজ্ঞদের। টিআইবির মতে, আউটসোর্সিংয়ের ওপর নির্ভরশীলতা ও অব্যবস্থাপনা রোগীদের বেসরকারি ল্যাবে যেতে বাধ্য করছে, যা আর্থিক বোঝা ও দুর্নীতি বাড়াচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে আস্থা ফেরাতে তড়িৎ ভিত্তিতে স্থায়ী ও দক্ষ জনবল নিয়োগ এখন সময়ের দাবি।

এদিকে সররকারি হাসপাতালে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদে কোনো সংকট নেই বলে দাবি করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডাঃ শফিউর রহমান। তিনি স্পষ্ট করেন, আউটসোর্সিং জনবলকে নির্ধারিত পদের বাইরে ব্যবহারের সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট কাজে প্রশিক্ষণ থাকলেও টেকনোলজিস্ট হিসেবে তাদের নিয়োগ দেয়া সম্পূর্ণ অবৈধ। এ ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। 

ভুল ল্যাব রিপোর্ট ও চিকিৎসাজনিত জটিলতা এড়াতে প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ ডা. শিরিন গুল জাবিন সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি ল্যাবরেটরি সংশ্লিষ্টদের নমুনার উৎস ও পরীক্ষার প্রক্রিয়া নিয়ে নিশ্চিত হয়ে রিপোর্টে স্বাক্ষরের পরামর্শ দেন। পাশাপাশি রোগীদেরও রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর তাতে বিশেষজ্ঞ প্যাথলজিস্টের নামসহ মূল স্বাক্ষর আছে কি না, তা যাচাইয়ের আহ্বান জানান।

নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তনের অঙ্গীকার করেছেন। তিনি দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও সিন্ডিকেটমুক্ত প্রশাসন গড়ার পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের শূন্য পদ পূরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিতের মাধ্যমে সেবার মান বাড়াতে কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি, যার সুফল দেশের মানুষ দ্রুতই পাবে বলে আশা করেন নতুন এ স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

কাওছার আল হাবীব/এদিন

Advertisement
এদিনের সব

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.