সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩২

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

প্রাপ্তির সুখে না-পাওয়ার দুখ

প্রকাশিত: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫৯ এএম

আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫৯ এএম

প্রাপ্তির সুখে না-পাওয়ার দুখ

নিরঙ্ক‍ুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরুর এক সপ্তাহের মাথায় স্বপ্নভ্রম হচ্ছে বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীদের। দীর্ঘদিন জেল-জুলুম, মামলা-হামলা ও নির্যাতন সহ্য করেও যারা কোনো পদ পাননি, তাদের অনুসারী কর্মীদের মধ্যে হতাশা ছড়িয়ে পড়ছে। পাশাপাশি এমন অনেককে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যা তাদের বিগত দিনের কর্মকাণ্ডের তুলনায় অনেক বেশি ও ভারসাম্যহীন বলে মনে করছেন তারা।

সবশেষ বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর নিয়োগ ইস্যুটি এতটাই টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে যে, ১৭ বছর পর ক্ষমতায় এসে পাহাড়সম স্বপ্ন আর প্রত্যাশার পালে আনন্দের চেয়ে হতাশার বাতাসই যেন বেশি। বিশেষ করে সরকার গঠনের পরপরই বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে চাপা অসন্তোষ ও হতাশার সুর বাজছে।

জানা গেছে, নতুন মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের পর থেকে একের পর এক ঘটনায় বিএনপির তৃণমূলে হতাশা বিরাজ করতে শুরু করেছে। এ নিয়ে বিভিন্ন জেলা, মহানগর ও উপজেলা পর্যায়ে দলীয় অঙ্গনে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার পরও কেন তারা মূল্যায়িত হলেন না। মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক দুর্দিনে যারা রাজপথে ছিলেন, বারবার গ্রেপ্তার হয়েছেন, পরিবার-পরিজন ছেড়ে কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন, তাদের অনেকেই মন্ত্রিসভা তো দূরের কথা, গুরুত্বপূর্ণ দলীয় বা সরকারি দায়িত্ব থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। অনেকে বলছেন, ‘ত্যাগের রাজনীতি’এখন আর প্রাধান্য পাচ্ছে না; বরং সুবিধাভোগীরাই অগ্রাধিকার পাচ্ছেন। এছাড়া পুলিশের আইজি এবং এক ব‍্যবসায়ীকে বাংলাদেশ ব‍্যংকের গভর্নরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগই যার সর্বশেষ সংযোজন বলেও অভিযোগ করছেন অনেকেই। 

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সদ্য ঘোষিত মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়া কয়েকজন নেতা অতীতে মাঠের রাজনীতিতে ততটা সক্রিয় ছিলেন না- এমন অভিযোগ রয়েছে। অনেকেই নিয়মিত সভা-সমাবেশ বা আন্দোলন কর্মসূচিতে অংশ নিতেন না। বরং রাজনৈতিক সংকটকালে নীরব অবস্থানে ছিলেন বলে দাবি তৃণমূলের একাংশের। অথচ তারাই এখন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের দায়িত্ব পেয়েছেন। এতে দীর্ঘদিন মামলা ও নির্যাতনের শিকার নেতা-কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ আরো বেড়েছে।

নাম প্রকাশ না করা্র শর্তে এরই মধ্যে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ক্ষমতাসীন দলের একাধিক তৃণমূল নেতার। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা প্রায় এক সুরেই বলেন, “আমরা বছরের পর বছর রাজপথে থেকেছি। পুলিশের মামলা মাথায় নিয়ে ঘুরেছি। ঘরে ফিরতে পারিনি। এখন দেখছি যারা কখনো সামনে ছিল না, তারাই বড় পদে আসীন।’ তাদের অভিযোগ, ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কোনো সুস্পষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি।

এছাড়া নির্বাচনে পরাজিত কয়েকজন প্রার্থীকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ায়ও প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের মতে, ভোটে জনগণের প্রত্যাখ্যানের পরও দলীয় বিবেচনায় উচ্চ পদ দেওয়া হলে মাঠের কর্মীদের কাছে ভুল বার্তা যায়। অন্যদিকে, নির্বাচনে জয়ী কিংবা এলাকায় দীর্ঘদিন প্রভাবশালী ভূমিকা রাখা নেতাদের কেউ কেউ মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। বিশেষ করে রাজধানীর কয়েকজন পরিচিত ও প্রভাবশালী নেতাকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি দলীয় অন্দরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

দলটির একাধিক সিনিয়র নেতা প্রকাশ্যে মন্তব্য না করলেও ঘনিষ্ঠ মহলে হতাশার কথা জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। কেউ কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলেও দলীয় সূত্রে জানা যায়। তাদের অনুসারী কর্মীদের মাঝেও নেমে এসেছে হতাশা। অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, আবার কেউ কেউ পালন করছেন নীরবতা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আশির দশকের ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বর্তমানে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা এক নেতা বলেন, ‘ক্ষমতার পালাবদল বা মন্ত্রিসভা গঠনের সময় প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে ফারাক তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে সেই ফারাক যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং তৃণমূলের সঙ্গে নেতৃত্বের দূরত্ব বাড়ায়, তাহলে সংগঠনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে যে দল দীর্ঘ সময় বিরোধী অবস্থানে থেকে আন্দোলন করেছে, সেখানে ত্যাগী কর্মীদের প্রত্যাশা তুলনামূলক বেশি থাকে।’

তিনি বলেন, আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বহু ত্যাগী নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে এখনো বহু মামলা ঝুলে আছে। গত দেড় দশকের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন, তাদের অনেকেই এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। সহায়-সম্বল হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন এমন পরিবারের সংখ্যাও কম নয়। তাদের অভিযোগ, দলের দুঃসময়ে পাশে থাকলেও সুসময়ে তারা উপেক্ষিত হচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন, ‘আমাদের মামলা প্রত্যাহার বা পুনর্বাসনের বিষয়ে এখনো কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।’ যদিও সম্প্রতি ২২০৮টি রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের ঘোষণা এসেছে। 

তৃণমূল নেতা-কর্মীরা বলছেন, এ পরিস্থিতিতে দ্রুত সমন্বয়মূলক পদক্ষেপ না নিলে ভেতরের ক্ষোভ বাড়তে পারে। তারা চান, ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হোক। মামলা-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে আইনি সহায়তা প্রদান, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং সংগঠনের ভেতরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন অনেকে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের কথাও উঠছে।

দলীয় উচ্চপর্যায়ের নেতারা আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করলেও ঘনিষ্ঠ মহল বলছে, নেতৃত্ব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। শিগগিরই তৃণমূলের সঙ্গে মতবিনিময় সভা আয়োজনের মাধ্যমে অসন্তোষ নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। সংগঠনের ঐক্য অটুট রাখতে এবং কর্মীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও স্বীকার করছেন অনেকে।

সব মিলিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনকে ঘিরে দলীয় অন্দরে এক ধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ত্যাগী কর্মীদের প্রত্যাশা ও নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত কমানো না গেলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব দলীয় ঐক্য, সাংগঠনিক শক্তি ও রাজনৈতিক কার্যক্রমে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Advertisement
এদিনের সব

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.