ময়মনসিংহের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ছামিউল হকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পাহাড় কেবল দুর্নীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের এক চরম নজির সৃষ্টি করেছেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্ট সচিবের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন হওয়ার সুবাদে তিনি কাউকেই তোয়াক্কা করছেন না। এই ‘পাওয়ার’ বা প্রভাব খাটিয়ে তিনি পুরো দপ্তরকে নিজের ব্যক্তিগত জমিদারিতে পরিণত করেছেন।
সূত্র জানায়, ছামিউল হকের বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ জমা পড়লেও অদৃশ্য ইশারায় সেগুলো ফাইলবন্দি হয়ে থাকে। প্রধান প্রকৌশলী ও সচিবের সাথে তাঁর ‘বিশেষ সখ্যতা’র কারণে কোনো তদন্ত কমিটিই তাঁর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সাহস পায় না। এই ক্ষমতার দাপটেই তিনি নিচের বিষয়গুলোতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। অবশ্য এ বিষয় তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি তা অস্বীকার করেন।
সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী সকাল ৯টায় অফিসে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও, নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ ছামিউল হক নিজের মর্জিমতো চলেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি দিনের অধিকাংশ সময় অফিসে থাকেন না। দুপুরের পর অফিসে এলেও অল্প সময় অবস্থান করে ব্যক্তিগত কাজে বেরিয়ে যান। তাঁর অনুপস্থিতির কারণে দূর-দূরান্ত থেকে আসা সেবাগ্রহীতারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে ফিরে যান। অনেক গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের ফাইলে তাঁর স্বাক্ষরের অপেক্ষায় কাজ স্থবির হয়ে আছে। কেউ প্রতিবাদ করলে তিনি সরাসরি সচিব বা প্রধান প্রকৌশলীর দোহাই দিয়ে বদলি বা বিভাগীয় মামলার হুমকি দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা জানি তাঁর হাত অনেক লম্বা। প্রধান প্রকৌশলী ও সচিবের সাথে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ। এই পাওয়ারের কারণেই তিনি আইন-কানুনের ঊর্ধ্বে নিজেকে মনে করেন। আমরা সাধারণ কর্মচারীরা কেবল অসহায় দর্শক।’
জানা গেছে, দাপ্তরিক কাজের জন্য বরাদ্দকৃত পাজেরো গাড়িটি এখন ছামিউলের পারিবারিক বাহনে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে গাড়িটি অফিসের কাজের চেয়ে তাঁর পরিবারের বাজার করা এবং স্বজনদের যাতায়াতে বেশি ব্যবহৃত হয়। সরকারি ছুটির দিনেও নিয়ম ভেঙে ঢাকার বাইরে ব্যক্তিগত ভ্রমণে গাড়িটি ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া গাড়ির লগবইয়ে ভুয়া তথ্য দিয়ে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ সরকারি জ্বালানি তেল আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে।
টেন্ডার সিন্ডিকেট ও নিম্নমানের কাজ: ময়মনসিংহের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে ছামিউল হক নিজের একটি ‘পছন্দের সিন্ডিকেট’ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যোগ্য ঠিকাদারদের বাদ দিয়ে কমিশন বা অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর ফলে গ্রামীণ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পের কাজগুলো অত্যন্ত নিম্নমানের হচ্ছে, যা সরকারের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সচিবালয়ের প্রভাবশালী মহলের নাম ভাঙিয়ে তিনি ময়মনসিংহের বড় বড় প্রকল্পের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছেন। সাধারণ ঠিকাদারদের অভিযোগ, ‘সামিউল সাহেবের গ্রিন সিগন্যাল ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না, কারণ তাঁর পেছনে বড় খুঁটির জোর আছে।’
এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে দপ্তরের বদলি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পদাধিকার বলে গত কয়েক বছরে তিনি বিপুল পরিমাণ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে। তাঁর এই বিলাসী জীবনযাপন এবং আয়ের উৎসের সাথে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নজরে আনার দাবি তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর এমন স্বেচ্ছাচারিতায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সেবামূলক কাজগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছে। গ্রামীণ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পের কাজগুলো থমকে আছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন একজন কর্মকর্তার খুঁটির জোর কতটুকু হলে তিনি দিনের পর দিন অফিস ফাঁকি দিয়ে এবং দুর্নীতি করে বুক ফুলিয়ে চলতে পারেন?
এ বিষয় ময়মনসিংহের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ছামিউল হক এদিনকে বলেন, সরকারি নিয়মের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তারপরও ঢাকা প্রধান অফিসের নির্দেশনা থাকে সে অনুসারে কাজ করতে হয়।
নিয়মিত অফিসন না করা ও সরকারি গাড়ি ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি কোন সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি এবং পরে কথা বলবেন বলে ফোন রেখে দেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









