পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যার স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও ‘সংবিধানকে’একটি ত্রুটিমুক্ত ও সর্বজনীন গ্রহণযোগ্য শাসনতন্ত্রের প্রতীক হিসেবে দাঁড় করাতে পারেনি। যতবারই সরকার পরিবর্তন হয়েছে ততবারই ক্ষমতাসীন দল ‘সংবিধানের বৈধতার’ দোহাই দিয়ে শাসন করলেও সেই শাসনকে ‘অসাংবিধানিক’ ও ‘অবৈধ’আখ্যা দিয়ে ‘কার্যকর সংসদ’গঠনে এর বাইরে থেকেছে বিরোধী শিবিরে থাকা অন্য দলগুলো।
কারণ যে দলই যখন সরকার গঠন করেছে, তাদের দাবি ছিল দেশের প্রচলিত ‘বিধান’ (আইন) মেনেই তারা ক্ষমতায় গেছে। আর যারাই ক্ষমতার বাইরে থেকেছে তাদেরও অভিযোগ সংবিধানের নামে ক্ষমতাসীন সরকার মূলত জনগণের সাথে ‘সং’ বা তামাশা/কৌতুক করছে। সরকার ও বিরোধী দলের এমন পারস্পরিক দোষারোপের মাঝখানে জনগণ বরাবরই ‘গিনিপিগ’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এভাবে ‘সং’আর ‘বিধান’র জাঁতাকলে পড়ে ৫৫ বছর কেটে গেছে জাতির। সবশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দীর্ঘ আঠারো মাস পর একটি বহুকাঙ্ক্ষিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও সেই ‘জুলাই সনদ’বাস্তবায়ন নিয়ে সংবিধানের এ ‘বৈধ-অবৈধ’র ধারাবাহিকতায় বর্তমান সংসদও যেন তার সর্বশেষ সংস্করণ হিসেবেই যাত্রা করছে।
জানা গেছে, স্বাধীনতা-পরবর্তী ৫৫ বছরের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় যে দলই ক্ষমতার বাইরে ছিল সবাই সংবিধানকে ক্ষমতাসীনদের ‘সং’(তামাশা) বলে সরকারবিরোধী আন্দোলনে মাঠ গরম রেখেছিল। পক্ষান্তরে ক্ষমতায় থাকা দলও ‘সংবিধান’কে বৈধ ‘বিধান’(আইন) বলেই সরকার পরিচালনা করছে বলে দাবি করত। বিরোধী দলে থাকলেই সংবিধানকে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপের হুমকি দিলেও সরকারে যাওয়ার সাথে সাথে সেই সংবিধানই বারবার হয়ে উঠেছে তাদের রক্ষাকবচ। অথচ মাঝখানে সরকার ও বিরোধী দলের সংবিধান ইস্যুতে ‘সং’ও ‘বিধান’-এর জাঁতাকলে পড়ে চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়েছে জনগণ। এখনো যেন সেই ‘সং’ আর ‘বিধান’-এর বৃত্তেই আটকে আছে সাধারণ মানুষ।
কারণ সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দেশের শাসন-ব্যবস্থার সংস্কার ইস্যুতে বিবদমান রাজনৈতিক দলগুলো একটি ‘কার্যকর সংস্কার’নিয়ে ঐকমত্য কমিশনে যুক্ত হয়। তারা দীর্ঘ ৬ মাসেরও বেশি সময় নিয়ে চলা কমিশনের মিটিং শেষে বেশ কিছু সংস্কার ইস্যুতে একমত হয়ে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করে। পরবর্তীতে জুলাই সনদের আলোকে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সরকার ও বিরোধী দল নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়। তখন বলা হয় জুলাই সনদ অনুযায়ী পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের শাসন-ব্যবস্থা নির্ধারিত হবে। কিন্তু সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠনের পর গণভোট অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সংবিধানের বিষয়টি আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। বিএনপির দাবি, জুলাই সনদের সাংবিধানিক দিক বিবেচনায় কিছু জটিলতা রয়েছে বিধায় সেটা পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। সে জন্য সংসদেই এর সমাধানের পথ দেখছে দলটি।
অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটভুক্ত দলগুলোর দাবি, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হলে বর্তমান সরকার-ব্যবস্থাই ‘অবৈধ’। বিষয়টি নিয়ে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে চলমান অসন্তোষ ও বিরোধ চরম আকার ধারণ করছে। এর প্রেক্ষাপটেই আগামী ১২ তারিখে নতুন সংসদের অধিবেশন বসতে যাচ্ছে। সেই সংসদে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে জাতি আরেকটি বাহাস দেখবে বলেই অনুমেয়। কারণ প্রথমবারের মতো বিরোধী দলে যাওয়া জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটভুক্ত দলগুলো জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ইস্যুতে ইতিমধ্যেই আন্দোলনের ছক কষছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার আলী আক্কাস দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যমতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়ার ফলই আমাদের এ বিভক্তি। তারা যেদিন দেশের জনগণের কথা চিন্তা করবে, তখনই এসব আলোচনা ফলপ্রসূ হবে। একই সঙ্গে জনগণকেও সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা কতটা সচেতনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও চলমান বিতর্ক ইস্যুতে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে নানা সময় আন্দোলন-সংগ্রাম হলেও দেশের সরকার প্রধান পালিয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি এর আগে কখনো হয়নি। শেখ হাসিনাই যার প্রথম উদাহরণ। সেই অবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরা মিলে পারস্পরিক অঙ্গীকার করেছে, জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতার স্বার্থেই সেই সনদ বাস্তবায়ন করবে বলে মনে হয়।
সূত্র জানায়, ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন হওয়ার পর উক্ত সংবিধানে যে চারটি মূলনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, কালের পরিক্রমায় সেগুলোর সংশোধনী নিয়ে নানা ধরনের বিতর্ক ও মতভেদ সৃষ্টি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের সংবিধানে ১৭টির বেশি সংশোধনী হয়েছে। এসব সংশোধনীর মূল বিতর্ক ছিল রাষ্ট্রের আদর্শ, শাসনব্যবস্থা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে।
১৯৭২ সালের সংবিধানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল মূলনীতি। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন সংশোধনীর মাধ্যমে এগুলোর কিছু পরিবর্তন করা হয়। বিশেষ করে পঞ্চম সংশোধনী (বাংলাদেশ সংবিধান)-এর মাধ্যমে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’বাদ দিয়ে ‘আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’যুক্ত করা হয়। পরে আদালতের রায়ে ধর্মনিরপেক্ষতা আবার ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়নের এক বছরের মাথায় ১৯৭৩ সালে প্রথম সংশোধনী আনা হয়। তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার জন্য সংবিধানে পরিবর্তন এনে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার সুযোগ রাখা হয়।
১৯৭৩ সালে দ্বিতীয় সংশোধনীর মাধ্যমে জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান যুক্ত করে কিছু মৌলিক অধিকার সীমিত করার সুযোগ রাখা হয়। তার পরের বছর (১৯৭৪) সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত চুক্তি কার্যকর করার জন্য সংবিধানের তৃতীয় সংশোধনী করা হয়। এরপর ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা চালু করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’(বাকশাল) প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখন পর্যন্ত কোনো শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকায় এসবের তেমন বিরোধিতা করা হয়নি। কিন্তু ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় এলে ১৯৭৫-১৯৭৯ সালের সামরিক শাসনের সময় করা সব আদেশকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ১৯৭৯ সালে পঞ্চম সংশোধনী আনা হয় যা পরবর্তীতে আদালত অবৈধ ঘোষণা করেন।
ইতিমধ্যে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর এ প্রেক্ষাপটে সামরিক শাসন জারির মধ্য দিয়ে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এসে ১৯৮১ সালে ষষ্ঠ সংশোধনী নিয়ে আসেন। এতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা সংক্রান্ত বিধান পরিবর্তন করা হয়। এর মধ্যে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় আসার আগে প্রচলিত সংবিধানকে ‘অবৈধ’বললেও পরবর্তীতে সেই সংবিধানের আলোকেই ক্ষমতায় বসে নিজেকে ‘সংবিধান মোতাবেক’ বৈধ রাষ্ট্রপতি হিসেবেই ঘোষণা দেন এবং ১৯৮৬ সালে সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৮২ থেকে ১৯৮৬ সালের সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়া হয়, যা পরে আদালত বাতিল করেন।
এ পর্যায়ে ১৯৮৮ সালে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয় এবং কিছু প্রশাসনিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হয়। তারপর সামরিক শাসক এরশাদ ১৯৮৯ সালে নবম সংশোধনীর মাধ্যমে নিজেকে সুরক্ষা দিতে রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতির নির্বাচনের বিধান পরিবর্তন করেন এবং রাষ্ট্রপতির মেয়াদ সম্পর্কিত বিষয় নির্ধারণ করা হয়।
তখন বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীসহ সবার আন্দোলনে ১৯৯০ সালে দশম সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা ও মেয়াদ বাড়ানো হয়। পরবর্তীতে একযোগে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের আগে ১৯৯১ সালে একাদশ সংশোধনী এনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রমকে বৈধতা দেওয়া হয়। তখন বিরোধী দলগুলো প্রচলিত সংবিধানের আলোকে এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণকে ‘অবৈধ’ বলে বিরোধিতা করলেও ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আবার সংসদীয় শাসনব্যবস্থা চালুর ব্যবস্থা করা হয়। তখন আগের নিয়মের বিরোধিতা করলেও ১৯৯৬ সালে আবার ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হয়।
এরই মধ্যে দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় সংবিধান সংশোধন ইস্যুতে মাঠে ‘বিরোধিতা’ করলেও পরবর্তীতে ক্ষমতায় গিয়ে সেই সংবিধানকেই ‘বৈধ’বলে ক্ষমতার স্বাদ গ্র্রহণ করেছে সবগুলো দল। এ পর্যায়ে ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি-জামায়াত জোট ২০০৪ সালে চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে নারীদের জন্য সংসদে সংরক্ষিত আসন বাড়ায় এবং কিছু সাংবিধানিক পদে অবসরের বয়স বাড়ানোর ব্যবস্থা করে।
এর মধ্যে মাঠের বিরোধী দল আওয়ামী লীগ আগের সংবিধানের বিরোধিতা করলেও সেই সংবিধানের আলোকে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনর্ব্যক্ত করা হয়। পরবর্তীতে আবার ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার অভিপ্রায়ে ২০১৪ সালে ষোড়শ সংশোধনী এনে সংসদের মাধ্যমে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা পুনর্বহাল করে দলটি। পরে আদালত এটি বাতিল করেন।
সর্বশেষ ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার সপ্তদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদে নারীদের সংরক্ষিত আসনের মেয়াদ আরো ২৫ বছর বাড়ায়। এভাবেই স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি চলে আসছে ‘সং’ আর ‘বিধানের’ ইঁদুর-বিড়াল খেলা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









