পুরান ঢাকার সাবেক এমপি হাজী সেলিম ভূমিদস্যুতার কারণে মুম্বাই স্টাইলে উপাধি পেয়েছিলেন কুখ্যাত হাজী মাস্তানা। পুরান ঢাকার হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি নানা কৌশলে দখল করেছেন। ঢাকার নবাব ও ভাওয়াল রাজাদের বাড়ি পর্যন্ত তার নীল ছোবল থেকে রক্ষা পায়নি। অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা তার কারসাজিতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। এমনকি ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) তিব্বত হল পর্যন্ত হাজী সেলিমের শ্যেনদৃষ্টি থেকে রক্ষা পায়নি।
ভুয়া মালিক ও সাজানো মামলার কারসাজিতে হলের প্রায় ৯ কাঠা জমির ওপর গড়ে ওঠা দোতলা ভবনটি কুক্ষিগত করেন। সেখানে স্ত্রীর নামে গড়ে তোলেন বিলাসবহুল বহুতল বিপণী বিতান ‘গুলশান আরা সিটি’। আর এই পুরো দখল প্রক্রিয়ায় তাকে চূড়ান্ত সহায়তা করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য (ভিসি) ড. মিজানুর রহমান। সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তার বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই হাতছাড়া হয়েছে এই বহুমূল্য সম্পত্তি। আর পাকাপোক্তভাবে মালিক হয়েছে হাজী সেলিমের পরিবার।
তবে দৈনিক এদিনের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে আরো চমকানো তথ্য। যে দলিলের বলে হাজী সেলিম তিব্বত হল দখল করেছেন, সেই দলিলটিই সম্পূর্ণ জাল বা ভুয়া। জানা গেছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সম্পাদিত একটি জাল দলিলের মাধ্যমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিব্বত হল দখল করে নেন সাবেক এমপি হাজী সেলিম। ঘটনাটি প্রকাশ্যে ঘটলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কোনো রকম পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। আর সম্পত্তিটি রক্ষা করার সুযোগ থাকলেও তৎকালীন ভিসি (বর্তমানে পলাতক) ড. মিজানের ইচ্ছাকৃত উদাসীনতার কারণে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে নীরব ছিল।
রেকর্ডপত্র ঘেঁটে জানা যায়, ১৯৪৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেজিস্ট্রিকৃত ২১৩৭ নম্বর দলিলের সূত্রে হাজী সেলিম ৮ ও ৯ নম্বর জিএল গার্থ লেনের (কুমারটুলী) ৮ দশমিক ৮৮৯ কাঠার বাড়িটি নিজের বলে দাবি করেন। দলিলে উল্লেখ করা হয়, ১৯৪৫ সালের ২৪ এপ্রিল বাড়ির মালিক শরৎচন্দ্র রায় চৌধুরীর কাছ থেকে জনৈক খলিলুর রহমান বিশ্বাস সেটি কিনে নেন। খলিলুর রহমানের কাছ থেকে হাজী সেলিলেম স্ত্রী গুলশান আরা বেগম বাড়িটি সাফ কবলা দলিলে ক্রয় করেন।
এদিনের অনুসন্ধানে জানা যায়, পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ার কৃষ্ণনগর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের যে দলিলটিকে হাজী সেলিম মালিকানার মূল ভিত্তি ধরেছেন, প্রকৃতপক্ষে সে দলিলটাই জাল। ঢাকায় বসে জালিয়াতচক্র সেই কাল্পনিক দলিলটি সৃষ্টি করেছে। যার হোতা খলিলুর রহমান বিশ্বাস। মূলত শরৎচন্দ্র রায়চৌধুরীর প্রায় ১০০ কোটি টাকার মূল্যের বাড়িটি দখল করে বিক্রির জন্য জাল দলিল বানানো হয়েছে।
তিব্বত হলের বাড়িটি দখলের জন্য যখন হাজী সেলিম মরিয়া, তখন বাড়ির লিজপ্রাপ্তদের মাধ্যমে ২০০৯ সালের ৪ নভেম্বর কৃষ্ণনগর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে ২১৩৭ নম্বর দলিলটির একটি সইমুহরি গ্রহণ করা হয়। সেই সইমুহরিতে দেখা যায়, ১৯৪৫ সালে সম্পাদিত সেই দলিল হলো একটি একরারনামা (ক্ষতি নিষ্কৃতি) দলিল। এতে দাতা হিসাবে শ্রী হযরত উল্লাহ্ সরকার এবং গ্রহীতা হিসাবে শ্রী নূর মহাম্মদ শেখের নাম রয়েছে। দেখা যায়, শরৎচন্দ্র রায়চৌধুরী এবং খলিলুর রহমানের রেজিষ্ট্রিকৃত একই তারিখের একই নম্বরের দলিলের কোনো অস্তিত্ব নেই।
এ বিষয়ে একাধিক সাব-রেজিস্ট্রারের অভিমত, বিশ্বের যেকোনো দেশে একই তারিখে একই নম্বরে ভিন্ন রকম দাতা-গ্রহীতার নাম দিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করার কোনো বিধান নেই। যে দলিলটি বালাম (ভলিয়্যুম) বইভুক্ত হয়ে যায়, সেটাই সঠিক।
এই জাল দলিল দাখিল করেই হাজী সেলিম আদালত থেকে একাধিক রায় নিয়ে তিব্বত হলের দখল নেন ২০০৯ সালে। রায় দেওয়ার আগে আদালত কৃষ্ণনগর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধনকৃত ২১৩৭ নম্বর দলিলের সইমুহরি দাখিলের কথা বারবার বলা হলেও ঢাকা জেলা প্রশাসন কিংবা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (তখন কলেজ) কর্তৃপক্ষ তা দিতে ব্যর্থ হয়। যার কারণে আদালতের পক্ষে সেই দলিলের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে ভূমি বিশেষজ্ঞ আইনজীবী মনির হোসেন মোল্লা এদিনকে বলেন, যাচাই-বাছাই জটিলতার কারণে অনেক সময় জাল দলিলের পক্ষে রায় হয়ে যেতে পারে। কারণ আদালত দাখিলকৃত কাগজপত্র ও সাক্ষীদের মাধ্যমেই বিচারকার্য সম্পন্ন হয়। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি এক্ষেত্রে জাল দলিল এবং দলিল বাতিলের জন্য ডিক্লারেশন স্যুট করতে পারেন ফৌজদারি আদালতে। এতে অবশ্যই প্রতিকার পাওয়া সম্ভব।
ঢাকা জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, দেশ ভাগের পর বাড়িটি পরিত্যক্ত থাকা অবস্থায়ই তা ঢাকা জেলা প্রশাসনের অর্পিত সম্পত্তি শাখায় অন্তর্ভুক্ত হয় যার নম্বর ১২৬/১৯৬৮ ও ৪৪/১৯৬৯। পরবর্তীতে তা আবুল কাসেম মাঝি, মনির হোসেন, মোজাম্মেল হোসেন, বীরেন্দ্র শীল ও নূরুল ইসলামের নামে লিজ হলে তারা প্রতিবছর সরকারকে লিজমানি প্রদান করেন। ১৯৯১ সালে হঠাৎ করে সেই লিজমানি নেওয়া বন্ধ করে দেয় জেলা প্রশাসন।
অভিযোগ রয়েছে, হাজী সেলিম জাল দলিল এবং ভুয়া সাক্ষী দিয়ে আদালতে মামলা করেন। ঢাকা জজকোর্ট থেকে নিজের পক্ষে রায়ও নেন। ২০০৫ সালে হাইকোর্টের আপলি বিভাগেও একইভাবে রায় নেওয়া হয়। কিন্তু জেলা প্রশাসনের পক্ষে তখন কোনো আপিল করা হয়নি। এ সুযোগে হাজী সেলিম তিব্বত হলের বাড়িটি দখল করে নেন। তার রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে জেলা প্রশাসন, ভূমি অফিস ও স্থানীয় মানুষ ছিল অসহায়।
সুপ্রীম কার্টের আইনজীবী তানজিম উল ইসলাম জানান, দেওয়ানী মামলার ক্ষেত্রে জাল বা বানানো কাগজপত্র দিয়ে এ ধরনের রায় নেওয়া সম্ভব। অনেক সময় একপক্ষীয় কিংবা যোগসাজশ করেও আদালতকে ভুল বুঝিয়ে রায় নিয়ে জমি দখলের নজির রয়েছে। এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসন কিংবা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ফৌজদারি আদালতে জালিয়াতির মামলা করে প্রতিকার পেতে পারেন।
কুমারটুলীর স্থানীয় লোকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিব্বত হলের দোতলা ভবনের গায়ে খলিলুর রহমান বিশ্বাসের পক্ষে দীর্ঘদিন একটি সাইনবোর্ড টাঙানো ছিল। সেই সাইনবোর্ডের জায়গায় গুলশান আরা বেগমের নাম উঠে আসে। বলা হয়, সাফ কবলা দলিলের মাধ্যমে তিনি খলিলুর রহমানের কাছ থেকে জমিটি ক্রয় করেছেন।
ঢাকা জেলা প্রশাসকের অর্পিত সম্পত্তি শাখা থেকে জানানো হয়, ১৯৬৫ সালের পর থেকে বাড়িটি তাদের দখলে ছিল। পরবর্তীতে তিব্বত হল হিসাবে তা ব্যবহৃত হয়। লিজও দেওয়া হয় কয়েকজনকে। কিন্তু উচ্চ আদালতে রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯১ সাল থেকে লিজমানি নেওয়া বন্ধ করা হয়। এর পর থেকেই শুরু হয় হাজী সেলিমের দখলের পরিকল্পনা।
পাটুয়াটুলীর অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সুশীলচন্দ্র কর্মকার বলেন, ‘জগন্নাথের উপাচার্য ড. মিজানুর রহমানের বক্তব্য ছিল আত্মঘাতী। তিনি বলেছিলেন, তিব্বত হল অর্পিত সম্পত্তি, সেখানে তাদের কোনো মালিকানা নেই। এতে হাজী সেলিম হলটি দখলে উৎসাহী হয়েছিলেন। ইচ্ছা করলে তিনি (উপাচার্য) হলের পরিত্যক্ত সম্পত্তি জগন্নাথের নামে লিজ নিয়ে তাদের দখলীস্বত্ব বজায় রাখতে পারতেন।’ অনেকেরই ধারণা, তৎকালীন ভিসি ড. মিজান মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বিষয়টি বেমালুম চেপে গেছেন।
২০১৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে হাজী সেলিম দাবি করেন, সম্পত্তিটি তার স্ত্রী গুলশান আরার নামে ২০০২ সালে সাফ-কবলা দলিল করা হয়। ২০০৯ সালে হাজী সেলিমের স্ত্রী সম্পত্তিটি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের দপ্তরে যে আবেদন করেন, সেখানে বলা হয় জমিটি ২০০৫ সালের ১৭ মার্চ সাফ-কবলা দলিলের মাধ্যমে খলিলুর রহমান বিশ্বাসের কাছ থেকে কিনেছেন।
জানা যায়, ১৯৮৪ সালে চুয়াডাঙ্গার বিবাদী খলিলুর রহমান সম্পত্তিটি তার বলে ঢাকা জজকোর্টে একটি দেওয়ানি মামলা করেন। মামলায় বলা হয় তার বাবা মিলাপ বক্স ১৯৪৫ সালে ১০ হাজার টাকায় বাড়িটি কিনেছেন। দাঙ্গার সময় তার বাবা মারা যান। তখন দলিলটি হারিয়ে যায়।
১৯৯১ সালে সেই দলিলের একটি সইমুহরি তিনি পান। ১৯৯৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি আদালত তার পক্ষে রায় দেন। পরে সরকার পক্ষ এ রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে। সে রায়ও খলিলুর রহমানের পক্ষে যায়। ২০০৩ সালে তিনি বাড়িটি অর্পিত সম্পত্তি থেকে অবমুক্তির আবেদন করেন।
এর মধ্যে খলিলুর রহমান জমিটি ১৯৯৮ সালের মে মাসে সাফ-কবলা দলিলমূলে (নম্বর-১৩৪৫) পূর্ব জুরাইনের শামসুল হক খানের কাছে বিক্রি করেন। কিন্তু তিনি দখল পাননি। ২০০৫ সালে এক কোটি ২৮ লাখ টাকায় হাজী সেলিম তার স্ত্রীর নামে সেটি কিনে নেন। ২০০৭ সালে হাজী সেলিমের পক্ষে বাড়ির দখল বুঝে পাওয়ার জন্য একটি মামলা করা হয়। রওশন আরা সিটি মার্কেটের পক্ষ থেকে বলা হয়, সঠিক প্রক্রিয়ায় সঠিক দাম দিয়ে তারা জমিটি কিনে সেখানে মার্কেট নির্মাণ করেছেন। জালিয়াতির কোনো আশ্রয় নেওয়া হয়নি।
এখন তিব্বত হলের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তবে ৮ ও ৯ নম্বর জি এল গার্থ লেনের ঠিকানায় গেলে সেখানে গুলশান আরা সিটির বিশাল সাইনবোর্ড চোখে পড়ে। সেই বিপণি বিতানে সারি সারি কাপড়ের দোকান। স্থানীয় ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন খাঁন বলেন, তিব্বত হল এখন ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে। হাজী সেলিমের সাম্রাজ্যের কাছে সবাই পরাজিত। তার কালো টাকার দাপটের কাছে আইন-কানুন নীরবে কেঁদে মরছে। হাজী সেলিম নিজে কারাগারে থাকলেও তার অবৈধ ‘গুলশান আরা সিটি’ দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করেই।
২০২৪-এর ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৫ সালে ঢাকা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে তিব্বত হল পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটিও পরে আর এগোয়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জাল দলিলের বিষয়ে সরকার নতুনভাবে উদ্যোগ নিয়ে আইনি ব্যবস্থা নিলে এখনো তিব্বত হল হাজী সেলিমের রাহুগ্রাস থেকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









