ঈদুল ফিতর দোরগোড়ায়, অথচ এখনো বেতন-বোনাস পাননি দেশের লাখো শ্রমিক। শিল্প পুলিশের তথ্যমতে, তদারকির অধীনে থাকা ১০ হাজার ১০০ কারখানার মধ্যে ২৫ শতাংশই অর্থাৎ ২ হাজার ৫৪৪ কারখানা ফেব্রুয়ারির বেতন বকেয়া রেখেছে। পাশাপাশি অর্ধেকের বেশি কারখানায় পৌঁছায়নি ঈদের বোনাস। উৎসবের আগে পাওনা আদায়ে অনিশ্চয়তা বাড়ায় শিল্পাঞ্চলগুলোতে ক্রমশ শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা দানা বাঁধছে।
সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ৯ মার্চের মধ্যে বেতন ও ১২ মার্চের মধ্যে বোনাস দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। চলতি মাসে রপ্তানিমুখী শিল্প খাতের বকেয়া ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার নগদ সহায়তা দেওয়ার পরও অনেক পোশাক কারখানায় বকেয়া রয়ে গেছে। ফলে প্রতিবছরের মতো এবারও নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার আগে রাজপথে নামতে হয়েছে পোশাক শ্রমিকদের। শ্রম প্রতিমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারি আর ত্রিপক্ষীয় চুক্তির বাস্তবায়ন না হওয়ায় ঈদ আনন্দ এখন বিষাদে রূপ নিয়েছে।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাবেক মহাসচিব সালাউদ্দিন স্বপনের দাবি, অনেক মালিক শ্রমিকদের বাড়তি পাওনা এড়াতে ইচ্ছে করেই বেতন-বোনাস দিতে দেরি করছেন। আগে পরিশোধ করলে শ্রমিকরা চলতি মাসের বেতনও দাবি করতে পারেন, এমন আশঙ্কা থেকেই এই কৌশল। অথচ কিছু প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে ফেব্রুয়ারি ও মার্চের আংশিক পাওনা মিটিয়ে দিয়ে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। গাজীপুরের এইচডিএফ অ্যাপারেলসের মালিককে খুঁজে পাওযা যাচ্ছে না তাই শতাধিক শ্রমিকের বেতন-ভাতা এখন অনিশ্চিত। অন্যদিকে, নারায়ণগঞ্জের একটি কারখানায় সংকট তৈরি হলেও বিকেএমইএ নেতাদের ব্যক্তিগত ৩০ লাখ টাকা ঋণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম নিশ্চিত করেছেন, বুধ ও বৃহস্পতিবার (আজ ও কাল) শিল্পাঞ্চলে ব্যাংক খোলা থাকবে। এই সময়ের মধ্যেই সব বকেয়া ও বোনাস পরিশোধ করে শ্রমিকদের ছুটি দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
বিজিএমইএর তথ্যমতে, ঢাকা ও চট্টগ্রামের ২ হাজার ১২৭টি সচল পোশাক কারখানার মধ্যে ৩৭টিতে এখনো ফেব্রুয়ারির বেতন বাকি। অন্যদিকে, ৭৬টি কারখানা এখনো ঈদ বোনাস পরিশোধ করেনি, যা শ্রমিকদের ঈদ আনন্দকে অনিশ্চয়তায় ফেলছে। এছাড়া ৫টি কারখানায় জানুয়ারি মাসের বকেয়া রয়ে গেছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, ৪৭৮টি প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে মার্চের অগ্রিম বেতন দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। মালিকপক্ষ দ্রুত পাওনা মেটানোর আশ্বাস দিলেও এই মুষ্টিমেয় কারখানার গাফিলতি শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, শেষ মুহূর্তে দু-একটি কারখানায় বেতন-বোনাস নিয়ে সমস্যা হলেও তারা তা সমাধানের চেষ্টা করছেন। তাদের তদারকিতেই শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ প্রক্রিয়া চলছে। বিজিএমইএর তথ্যমতে, গতকাল মঙ্গলবার থেকে ধাপে ধাপে ছুটি শুরু হয়েছে ৬২৫টি বা ৩৫ শতাংশ কারখানায়। আজ বুধবার ছুটি হবে ৮০৩টি বা ৪৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে। এছাড়া বাকি ৮৯টি কারখানা আগামীকাল বৃহস্পতিবার ছুটি দেওয়ার কথা রয়েছে। মালিকপক্ষের এই পরিকল্পনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে ছুটি ও পাওনা পরিশোধের প্রক্রিয়াটি এখন বাস্তবায়নের অপেক্ষায়।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের রপ্তানি খাতে। বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে, যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট সংকটে দেশের বিভিন্ন খাতের অন্তত ৫৮০টি শিল্প ও রপ্তানি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। বিশ্ববাজারের এই অস্থিতিশীলতা দীর্ঘায়িত হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে।
শিল্প সংশ্লিষ্ট মালিকরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে ঈদের ছুটির পর অধিকাংশ কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কাঁচামাল সংকট এবং শিপিং খরচ অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক মালিকই এখন কারখানা চালু রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। ফলে শিল্পাঞ্চলগুলোতে এখন বিরাজ করছে এক চাপা আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা।
এদিকে, হাজার হাজার শ্রমিক ঈদের আনন্দ নিয়ে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরলেও তাদের মনে ফিরতি যাত্রা নিয়ে শঙ্কা কাজ করছে। প্রিয়জনদের সাথে ছুটি কাটিয়ে ঢাকায় ফেরার পর তারা নিজেদের কর্মস্থল খোলা পাবেন কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। বিভিন্ন শিল্প শ্রমিক সংগঠন নেতারা বলছেন, যুদ্ধের কারণে অনেক শ্রমিকদের পরিবারে রুটিরুজি হারানোর ভয় ঈদ আনন্দকেও ম্লান করে দিয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









