বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ১ বৈশাখ ১৪৩৩

The Daily Adin Logo
The Daily Adin Logo

বরাদ্দের আগেই ‘কমপ্লিট’  ভাগের নকশা

প্রকাশিত: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৭ পিএম

আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম

বরাদ্দের আগেই ‘কমপ্লিট’  ভাগের নকশা

সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পের ব্যয়  ৮ হাজার ৮৫০ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার টাকা। এক দফা মেয়াদ শেষে নতুন করে বরাদ্দ পেতে রিভাইসের জন্য পাঠানো হয় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে। অপেক্ষা শুধু অনুমোদনের। অথচ এই প্রকল্পের নতুন বরাদ্দ পাসের আগেই দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান করে কাজ ও টাকা ভাগাভাগির নীলনকশা চূড়ান্ত করে ফেলেছে একটি ‘মুখচেনা’ চক্র। আগামীকাল রবিবার দরপত্র খোলার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে এই ‘আপসের লুটপাট’। এমনই অভিযোগ উঠেছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচ) ‘সমগ্র দেশে নিরাপদ পানি সরবরহ প্রকল্প’কে ঘিরে। 

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) ‘সমগ্র দেশে নিরাপদ পানি সরবরহ প্রকল্প’ ঘিরে গড়ে উঠেছে আর্সেনিক আয়রন রিমোভ্যাল প্লান্ট (ভ্যাসেল) বা ফিল্টার সিন্ডিকেট। ফলে প্রকল্পটিতে চলছে নজিরবিহীন লুটপাট। এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে কাজ করছেন প্রকল্পের এস্টিমেটর (প্রাক্কলনিক) আনোয়ার হোসেন সিকদার ও কক্সবাজার জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাসরুল্লাহ, প্রকল্প পরিচালক ও প্রভাবশালী একজন ঠিকাদার।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পরিকল্পিতভাবে বড় প্যাকেজ তৈরি, কাজের রেট বিক্রি, পছন্দের এলাকায় বিশেষ বরাদ্দ, কমিশন ভাগাভাগি, কোন এলাকায় কেমন প্যাকেজ হবে, কোন ঠিকাদার কাজ পাবে, কত পার্সেন্ট অ্যাভাব হবে, কোন ঠিকাদারকে কত টাকা বিল দেয়া হবে- এ সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করছে এই সিন্ডিকেট। আর এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে এরই মধ্যে মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রকল্পটি। সেবাবঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। আর আঙুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে সিন্ডিকেটের হোতারা। দেশ-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তারা। এদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একাধিক মামলা চলমান থাকলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা এখনো চোখে পড়েনি।  

জানা যায়, দেশের সব অঞ্চলে বিশেষ করে গ্রামীণ ও পৌর এলাকায় নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পানি নিশ্চিত করতে ২০২০ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত একনেক সভায় ‘সমগ্র দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের’ অনুমোদন দেয় সরকার। যা সরকার ঘোষিত ১০০% সুপেয় পানি সরবরাহ এবং ‘এসডিজি’ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে সরকারের একটি বড় উদ্যোগ। সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৮ হাজার ৮৫০ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার অর্থাৎ প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত। 

প্রথম সংশোধনী অনুযায়ী প্রকল্পটির ২৬টি কম্পোনেন্টের মধ্যে প্রধান কার্যক্রমগুলো হলো- সবার জন্য সুপেয় পানি, নলকূপ স্থাপন, পানি শোধন ব্যবস্থা, ওয়াটার সেফটি প্ল্যান বাস্তবায়ন ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি। প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হলে নতুন করে রিভাইসের জন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। যা অনুমোদনের অপেক্ষায়। তবে নতুন করে ডিপিপি (রিভাইজ) অনুমোদনের আগেই ১২ মার্চ কক্সবাজার জেলায় চার হাজার আর্সেনিক আয়রন রিমোভ্যাল প্লান্ট (ভ্যাসেল) বা ফিল্টারের দরপত্র আহ্বান করেছেন কক্সবাজার জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাসরুল্লাহ। আগামীকাল রবিবার ওপেনিং বা খোলা হবে।

আরো জানা যায়, কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৬ নং গভীর নলকূপের আয়রন ও আর্সেনিক দূরীকরণের জন্য ৫০০টি করে (ভ্যাসেল) মোট আটটি প্যাকেজের টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। আর এমনভাবে কাগজপত্র চাওয়া হয়েছে যা নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদার ছাড়া অন্য কোনো ঠিকাদারের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। প্রশ্ন উঠেছে- ডিপিপি রিভাইস হওয়ার আগেই টেন্ডার আহ্বান করা যায় কি না। আর এই কাজের অ্যানুয়াল প্রকিউরমেন্ট প্লান (এপিপি) বা বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনার অনুমোদন দিয়েছেন প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল আউয়াল। 

রিভাইস অনুমোদনের আগে টেন্ডার আহ্বান করা যায় কি না- এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল আউয়াল এদিনকে বলেন, ‘ভাই আজ শুক্রবার বন্ধের দিন, একটি অনুষ্ঠানে আছি। আপনি অফিস টাইমে কল করিয়েন।’ তবে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, প্রথম সংশোধনীতে যেটি উল্লেখ আছে তার বাইরে অতিরিক্ত করার বা দ্বিতীয় সংশোধনী না হওয়ার আগে টেন্ডার আহবান করার কোনো সুযোগ নেই।

এদিকে ২০২৩ সালের ২০ ডিসেম্বর সমগ্র দেশে পানি সরবরাহ প্রকল্পের (প্রথম সংশোধনী) অনুমোদিত এক প্রশাসনিক আদেশ থেকে জানা যায়, প্রকল্পের ২৬টি কম্পোনেন্টের মধ্যে সারা দেশে ২৯ হাজার ৫৭০টি আর্সেনিক আয়রন রিমোভ্যাল প্লান্ট (ভ্যাসেল) বা ফিল্টার অনুমোদন দেয়া হয়েছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২ কোটি ৫২৭ লাখ টাকা। 

সূত্রে জানা যায়, প্রকল্প থেকে এরই মধ্যে এক লাখেরও বেশি ফিল্টার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। আর এসব ফিল্টার দেয়া হয়েছে বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ হাতেগোনা কয়েকটি জেলায়। যেখানে পছন্দের নির্বাহী প্রকৌশলী ও ঠিকাদাররা রয়েছে। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারের এই ৩ জেলায় একা নাসরুল্লাহকেই দেয়া হয়েছে ৩০ হাজারের অধিক ফিল্টার। এ নিয়ে অন্যান্য জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। ডিপিএইচের একাধিক জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা বলেন, প্রকল্প থেকে হাতেগোনা কয়েকটি জেলায় বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়। যেসব এলাকায় আর্সেনিক আছে সেসব এলাকায় বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঠিকাদার এদিনকে বলেন, ‘অন্য টেন্ডারের ক্ষেত্রে নির্বাহী প্রকৌশলী নাসরুল্লাহ স্যার কাজের রেট অনুযায়ী পার্সেন্টিজ নেন। কিন্তু ফিল্টারের ক্ষেত্রে তিনি ভিন্ন। ফিল্টারের কাজে তিনি ফিল্টারপ্রতি ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা কমিশন নেন। অর্থাৎ ৫০০ করে আটটি প্যাকেজে মোট ফিল্টার হয় চার হাজার। ফিল্টার প্রতি কমপক্ষে বিশ হাজার করে টাকা নিলেও মোট ৮ কোটি টাকা একাই কমিশন নেবেন তিনি। এ ছাড়া প্রধান প্রকৌশলী, এস্টিমেটর ও প্রকল্প পরিচালকের পার্সেন্টিজ তো আছেই। আর টেন্ডারের কাগজপত্র এমনভাবে চাওয়া হয়েছে যা দু-একজন ঠিকাদার ছাড়া অন্য কারো কাছে নেই। সুতরাং ওপেনিং হলে দেখবেন প্রতিটি কাজই এভাবে পেয়েছে তাদের নিয়ন্ত্রিত ঠিকাদাররা। যেন ভাগ-বাটোয়ারাটা মনের মতো করা যায়।’

ডিপিএইচই সূত্র জানায়, এ প্রকল্প  থেকে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, গোপালগঞ্জ, টাঙ্গাইল, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার ও নোয়াখালীসহ পছন্দের জেলাগুলোতে অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লুটপাট হয়েছে কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। এই দুই জেলার দায়িত্বে ছিলেন কক্সবাজার জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাসরুল্লাহ। অভিযোগ রয়েছে, কুমিল্লা থেকে কক্সবাজার জেলায় বদলির আগে কুমিল্লা জেলায় ৪০টি স্কিমে ১২০ কোটি টাকার টেন্ডার করা হয়েছে। প্রতিটি টেন্ডারেই ১০ পার্সেন্ট অ্যাভাবে কাজ পেয়েছেন ঠিকাদাররা। যা পরে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নাসরুল্লাহ ও আনোয়ার শিকদারসহ অন্যদের মাঝে ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে। 

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) মোহাম্মদ হানিফ এদিনকে বলেন, ‘এই কাজ আগে ধরা ছিল সেটার টেন্ডার ৫ এপ্রিল (আগামীকাল) হবে। আর বাকি কাজে নতুন করে ডিপিপি (রিভাইজ) অনুমোদনের পর হবে।’ এ বিষয়ে প্রকল্পের উপ-পরিচালক (ডিপিডি) মো. মোস্তাফিজুর রহমানকে কল করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ নাসরুল্লাহকে বেশ কয়েকবার কল করা হলেও তিনি বারবার কল কেটে দেন।

এসব বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব শহিদুল হাসান এদিনকে বলেন, আমি মাত্র নামাজ পড়ে এসেছি, খেতে বসব। আপনার যা বলার অফিস টাইমে বলবেন।’ কিন্তু টেন্ডার তো অফিস খোলার দিনই ওপেনিং হয়ে যাবে- এমন প্রশ্নের কোনো সদুত্তর মেলেনি। এরপর প্রতিবেদন-সংক্রান্ত বিষয়ে তাকে জানানোর জন্য তার হোয়াটসঅ্যাপে তথ্য সরবরাহ করা হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

Advertisement
এদিনের সব

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. সাইদুল ইসলাম সাজু
নির্বাহী সম্পাদক: খন্দকার মোজাম্মেল হক

শরীয়তপুর প্রিন্টিং প্রেস ২৮/বি, টয়েনলি সার্কুলার রোড, মতিঝিল-১০০০, ঢাকা থেকে মুদ্রিত

যোগাযোগ করুন

টাওয়ার-এ (২য় তলা), হাউস-১৩, রোড-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩।

০২-২২৬৬০৩৩৫২

০১৮৯৭-৬৬৪৬৫৬

ইমেইল : dailyadinbd@gmail.com

আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া

facebookyoutubetiktok

© স্বত্ব ২০২৬, দৈনিক এদিন

Design & Developed byBongosoft Ltd.