আয়োজক ৩ দেশ, ৪৮ দল, এক মাসেরও বেশি সময়—উত্তর আমেরিকার বিশাল মানচিত্রজুড়ে চলা ফুটবলের এই মহারণ এখন প্রায় শেষের পথে। ১৯ জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে থাকবে কেবল দুটো দল: স্পেন আর আর্জেন্টিনা।
একদিকে ৩৯ বছরের লিওনেল মেসি, অন্যদিকে উত্তরসূরির সিংহাসনের দাবিদার লামিনে ইয়ামাল। এই পথ পাড়ি দেওয়ার গল্প শুধু গোল আর পাস দিয়ে গড়া নয়—এতে মিশে রয়েছে রেফারির বিতর্কিত বাঁশি, ভিএআর’র মিলিমিটার-হিসাব, ফুটবলের ইতিহাসে নেই এমন এক নতুন আইন, আর গ্যালারিতে ঢুকে পড়া রাজনীতির ছায়া।
চলুন ফিরে দেখা যাক ফাইনালের আগ পর্যন্ত ‘২০২৬ বিশ্বকাপ’-
উৎসবের উদ্বোধন: ৪৮ দলের মহাযজ্ঞ
১১ জুন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো মিলিয়ে শুরু হওয়া এই আসর শুরুতেই প্রমাণ করেছে, ৪৮ দলের প্রসারিত ফরম্যাট মানে কেবল সংখ্যা বাড়া নয়, বাড়ে গল্পও। প্রথমবার বিশ্বকাপে এসে কেপ ভার্দে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়ে গেছে; মিশরের সঙ্গে ৩-২ গোলের রোমাঞ্চকর ম্যাচও মনে করিয়ে দিয়েছে—আধুনিক বিশ্বকাপে ‘ছোট দল’ বলে কিছু নেই। স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের গ্রুপে শীর্ষে উঠেছে, আর গ্রুপ পর্বেই দেখা মিলেছে এই আসরের দ্রুততম গোলের—তুরস্কের জালে প্যারাগুয়ের মাতিয়াস গালার্সার মাত্র ৬৪ সেকেন্ডের স্ট্রাইক ।
তারকাদের বিস্ময়কর নৈপুণ্য
বিশ্বকাপ মানেই তারকাদের মঞ্চ। উদ্বোধনী ম্যাচেই আলজেরিয়ার জালে হ্যাটট্রিক করেন মেসি; সেমিফাইনাল পর্যন্তই তার ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট। ৩৯ বছর বয়সে যেন সময়কেই হার মানানো গল্প লিখেই চলেছেন তিনি। অন্যদিকে স্পেনের ইয়ামাল, রদ্রি; ফ্রান্সের এমবাপ্পে; নরওয়ের হালান্ড; ইংল্যান্ডের কেইন-বেলিংহ্যামের দূর্দান্ত নৈপুণ্যে জমে উঠে বিশ্বকাপ।
যন্ত্র: রেফারি-ভিএআর বিতর্ক
তবে এবারের আসরে বেশি কথা হয়েছে রেফারি ও ভিএআর নিয়ে। একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত। বিশেষ করে ইংল্যান্ড-নরওয়ে ও আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ড ম্যাচের পর—সমালোচনার মুখে সেমিফাইনাল থেকে ভিএআর দলকে সরাসরি স্টেডিয়ামে নামায় ফিফা । সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ভিএআর’র হস্তক্ষেপে পারেদেসের হলুদ কার্ড বাতিল, ভান করার অপরাধে এম্বোলোর দ্বিতীয় হলুদ ও লাল কার্ড দেখা। ফ্রান্স-স্পেন সেমিফাইনালের ৪৩ মিনিটের ঘটনাটি ছিল ফুটবল বিশ্বকাপের সর্বকালের অদ্ভুততম দৃশ্যগুলোর একটি—দেম্বেলেকে ফাউল বলে ফ্রি-কিক দিয়েছিলেন রেফারি ইভান বার্তোন, কিন্তু সহকারীর পরামর্শে মুহূর্তেই নিজের সিদ্ধান্ত উল্টে দিলেন; ভিএআর নয়, কেবল সহকারী রেফারির ইশারায়।
মুখ ঢাকলেই লাল কার্ড
এই বিশ্বকাপই ইতিহাস গড়েছে এমন এক আইনে, যার নামকরণই হয়ে গেছে ‘প্রেস্তিয়ান্নি আইন’। নতুন বিধান—প্রতিপক্ষের সঙ্গে বিতর্কের সময় মুখ ঢাকলেই লাল কার্ড। ফিফা প্রেসিডেন্ট ইনফান্তিনোর যুক্তি ছিল নির্মোহ: ‘লুকানোর কিছু না থাকলে মুখ ঢাকার কী আছে?’ ২০ জুন প্যারাগুয়ের আলমিরন হলেন ইতিহাসের প্রথম শিকার, পরে কলম্বিয়ার ইনকাপিয়েও একই সাজা পান।
গ্যালারিতে রাজনীতির ছায়া
খেলাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার প্রতিজ্ঞা করলেও এই আসরে তা আর মেলেনি। যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণনিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা ইরানের সমর্থকরা মাঠেই আসতে পারেননি; দেশটির ফেডারেশন সভাপতিও ভিসা পাননি। ১৯৯৮ সালে লিয়ঁতে যে দুই দল ফুল বিনিময় করেছিল, ২০২৬-এ সেই ছবির সঙ্গে বর্তমানটির ব্যবধানই বলে দেয়, রাজনীতি ফুটবলকে কোথায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে! আরেক ফ্রন্টে বিতর্ক, ফাইনালের প্রথমবারের মতো হাফটাইম শো নিয়ে—ক্রিস মার্টিনের তত্ত্বাবধানে ম্যাডোনা, শাকিরা, বিটিএসদের ২০ মিনিটের সুপার বোল-ধাঁচের আয়োজন।
পরিশেষে
নিউ ইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে ৩৯ বছরের মেসির শেষ নৃত্য, নাকি ১৯ বছরের ইয়ামালের প্রথম ভোর—যাই ঘটুক, এই এক মাস প্রমাণ করে গেল: বিশ্বকাপ শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি মানুষের সম্মিলিত আবেগের অধ্যায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









