আর্জেন্টিনার ফুটবল কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনা মৃত্যুর আগের দিনগুলোতে শয্যাশায়ী ছিলেন। তার শরীরে অতিরিক্ত পানি জমে শরীর ফুলে গিয়েছিল এবং তিনি যেন জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন।
বৃহস্পতিবা ( ৬ আগস্ট) ম্যারাডোনার মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে চলমান মামলায় তার ম্যাসাজ থেরাপিস্ট নিকোলাস তাফারেল আদালতে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
২০২০ সালে ৬০ বছর বয়সে মারা যান ম্যারাডোনা। তার মৃত্যুর ঘটনায় সম্ভাব্য চিকিৎসাগত অবহেলার অভিযোগে আর্জেন্টিনায় সাতজন স্বাস্থ্যকর্মীর বিচার চলছে।
আদালতে তাফারেল বলেন, মৃত্যুর শেষ দিনগুলোতে ম্যারাডোনা প্রায় সব সময় বিছানায় পড়ে থাকতেন। তিনি বিছানা থেকে উঠতে চাইতেন না, খেতে চাইতেন না এবং নিজের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার দিকেও নজর দিতেন না।
আদালতে তাফারেল বলেন, “তিনি বিছানা থেকে উঠতেন না, খেতে চাইতেন না, গোসল করতে চাইতেন না, নিজের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতারও যত্ন নিতেন না।”
তিনি আরো জানান, ম্যারাডোনার শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে তিনি তার চিকিৎসকদের বিষয়টি জানিয়েছিলেন। চিকিৎসকদের আরও নিয়মিত, এমনকি প্রতিদিন রোগীকে দেখতে আসার অনুরোধও করেছিলেন তিনি।
আদালতে একটি অডিও বার্তাও শোনানো হয়, যেখানে তাফারেল চিকিৎসকদের আরও সক্রিয়ভাবে ম্যারাডোনার পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাফারেল বলেন, তিনি ম্যারাডোনার শারীরিক সমস্যাগুলো চিকিৎসকদের জানিয়েছিলেন। কিন্তু তার চোখে সমস্যাগুলো সমাধানে দ্রুত বা কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
“আমি তার যে সমস্যাগুলো দেখেছি, সেগুলো জানিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো বাস্তব পদক্ষেপ বা দ্রুত সমাধান দেখতে পাইনি,” তিনি বলেন।
ম্যারাডোনার শারীরিক অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে তাফারেল বলেন, “তিনি ফুলে গিয়েছিলেন, তার পা দুটোও ফুলে ছিল,”
তাফারেলের দাবি, চিকিৎসকদের কাছে এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলে তারা তাকে শান্ত থাকতে বলেছিলেন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, এসব উপসর্গ সময়ের সঙ্গে চলে যাবে।
“আপনি যখন উদ্বিগ্ন থাকেন, তখন চিকিৎসকদের ওপর আস্থা রাখেন। নিজেকে বোঝান, এটা ঠিক হয়ে যাবে, সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তা হয়নি,” বলেন তাফারেল।
মৃত্যুর আগের শেষ কথা
ম্যারাডোনার মৃত্যুর এক দিন আগে, ২৪ নভেম্বর, তাকে কিছু পান করতে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন তাফারেল। তিনি তাকে ম্যাতে নামে একটি জনপ্রিয় হার্বাল পানীয় পান করতে বাইরে আসার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু ম্যারাডোনা তাতে রাজি হননি।
তাফারেলের ভাষ্য অনুযায়ী, ম্যারাডোনা তাকে বলেছিলেন, “আমি কিছু চাই না, তাফিতা, এটাই।”
তাফারেল তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “এটাই বলতে কী বোঝাচ্ছেন?”
জবাবে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, “কিছু না, এটাই।”
স্প্যানিশ ভাষায় “ইয়া এস্তা” কথাটির অর্থ পরিস্থিতি অনুযায়ী “সব ঠিক আছে” অথবা “সব শেষ”—দুইভাবেই বোঝানো যায়। তাফারেলের বক্তব্যে এই কথোপকথন ম্যারাডোনার শেষ সময়ের মানসিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে উঠে এসেছে।
২৫ নভেম্বর ২০২০, বিছানায় একা থাকা অবস্থায় মারা যান ম্যারাডোনা। তার মৃত্যুর কারণ ছিল হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ফুসফুসে অতিরিক্ত তরল জমে যাওয়া, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় তীব্র পালমোনারি এডিমা বলা হয়। মৃত্যুর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে তাঁর অস্ত্রোপচার হয়েছিল।
মামলার সর্বশেষ
উল্লেখ, আর্জেন্টিনার ফুটবল কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যুর ঘটনায় মঙ্গলবার নতুন করে বিচার শুরু হচ্ছে। আগের বিচারটি ২০২৫ সালে এক বিচারকের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে বাতিল হয়ে যায়। বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার ম্যারাডোনা ২০২০ সালের নভেম্বরে ৬০ বছর বয়সে মারা যান।
নতুন বিচারে প্রায় ১২০ জন সাক্ষীর বক্তব্য শোনা হবে। ম্যারাডোনার চিকিৎসক দলের সাত সদস্যের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে তারা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের সর্বোচ্চ ২৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









