গত কয়েক বছরে দলবদলকে ঘিরে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের আঙিনায় এমন উৎসবের আমেজ খুব একটা দেখা যায়নি। এবার যেন সেই পুরোনো উন্মাদনাই ফিরেছে সাদা-কালো শিবিরে। ঘরোয়া ফুটবলের বেশ কয়েকটি ক্লাব যখন ফিফার নিষেধাজ্ঞা ও নানা জটিলতায় দলবদলে অংশ নিতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন শুরু থেকেই পরিকল্পিতভাবে দল গুছিয়েছে মোহামেডান। আর শেষ দিনে জাতীয় দলের অভিজ্ঞ গোলকিপার আনিসুর রহমান জিকোকে দলে ভেড়ানোর মধ্য দিয়ে দলবদলে বড় চমকই দিয়েছে ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি। বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টায় পাঁচটি ঘোড়ার গাড়ি করে ফুটবলাররা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে (বাফুফে) উপস্থিত হয়ে নতুন মৌসুমের দলবদল সারেন।
ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান মেঘনা গ্রুপের মোস্তফা কামাল, ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যান ব্যবসায়ী মাসুদুজ্জামান, হকি কমিটির চেয়ারম্যান পুরনো ঢাকার বিখ্যাত ব্যাবসায়ী পরিবারের সন্তান সাজেদ এএ আদেল। বৃহস্পতিবার ফুটবলের দলবদলের অনুষ্ঠানে সাদা কালো টেন্ট হয়ে উঠেছিল রঙিন।
জিকোকে নিবন্ধনের মধ্য দিয়ে ২০২৬-২৭ মৌসুমের দলবদল কার্যক্রম শেষ করেছে মোহামেডান। বসুন্ধরা কিংস থেকে এরই মধ্যে নয়জন ফুটবলারকে দলে নিয়েছিল তারা। এরা হলেন- গোলকিপার আনিসুর রহমান জিকো, ডিফেন্ডার সাদ উদ্দিন, টনি আগাবাজি ও রিমন হোসেন। মিডফিল্ডার সোহেল রানা, মুজিবুর রহমান জনি ও শাহরিয়ার ইমন এবং ফরোয়ার্ড ইমানুয়েল সানডে ও ফয়সাল আহমেদ ফাহিম। তবে কাল দুপুর একটায় শেষ সংযোজন হিসেবে কিংসের গোলরক্ষক জিকোর আগমন সাদা-কালোদের শিরোপার স্বপ্নকে আরও জোরালো করেছে।
মোহামেডান ক্লাব প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় জমকালো অনুষ্ঠান। ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান ও মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল, ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যান ব্যবসায়ী মাসুদুজ্জামান, হকি কমিটির চেয়ারম্যান পুরনো ঢাকার বিখ্যাত ব্যাবসায়ী পরিবারের সন্তান সাজেদ এএ আদেল। বৃহস্পতিবার ফুটবলের দলবদলের অনুষ্ঠানে সাদা কালো টেন্ট হয়ে উঠেছিল রঙিন। সেখানে ক্লাব সভাপতি মো. বরকতউল্লাহ বুলু, পরিচালক মো. লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, ফুটবল কমিটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ম্যানেজার আমিরুল ইসলাম বাবুসহ নতুন চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়রা উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকার মাঠে ২৩ বছর পর গত বছর মে মাসে প্রিমিয়ার ফুটবল লিগে চ্যাম্পিয়ন হয় মোহামেডান। গেল মৌসুমের লিগে পঞ্চম হয়েছিল। তবে এবার ট্রেবল জিততে মরিয়া সাদা কালোরা। মোহামেডানে যোগ দিয়ে জিকো জানান, এই ক্লাবে খেলার ইচ্ছা তার অনেক আগে থেকেই ছিল। অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে থাকতেই মোহামেডানের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়েছিল। তবে বসুন্ধরা কিংসের সঙ্গে চুক্তির কারণে তখন সেই সুযোগ হয়নি। এবার দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হয়েছে। জিকো বলেন, ‘মোহামেডানের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবে যোগ দিয়ে আমার ভালো লাগছে। নতুন ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা একসঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নিজেদের সেরাটা দিতে পারলে শিরোপা জেতা সম্ভব।’ একই সঙ্গে মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে মোহামেডানের ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রত্যয় জানান জাতীয় দলের এই গোলকিপার।
এবারের দলবদলে প্রায় প্রতিটি বিভাগেই শক্তি বাড়িয়েছে মোহামেডান। গোলরক্ষক হিসেবে জিকোর সঙ্গে রয়েছেন সুজন হোসেন, আহসান হাবিব বিপু ও ইসমাইল হোসেন মাহিন। রক্ষণভাগে রহমত মিয়া, সাদ উদ্দিন, শাকিল আহাদ তপু, জাহিদ হাসান শান্ত, টনি আগাবাজি, রিমন হোসেন ও হাফিজুর রহমান বাবুসহ একাধিক খেলোয়াড় রয়েছেন। মাঝমাঠে সোহেল রানা, মিনহাজ আবেদীন বাল্লু, মেহেদী হাসান রয়েল, জুয়েল মিয়া, মজিবুর রহমান জনি, শফিউল হোসেন, আমির হাকিম বাপ্পিসহ বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় আছেন। আক্রমণভাগে বড় ভরসা সুলেমান দিয়াবাতে, সৌরভ দেওয়ান, ইমানুয়েল সানডে, ফয়সাল আহমেদ ফাহিম ও জয় আহমেদ।
শুধু দল গঠনেই নয়, মোহামেডানকে দীর্ঘমেয়াদে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন সভাপতি বরকতউল্লাহ বুলু। তার মতে, ক্লাবের নিজস্ব সম্পদকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে অন্যের অনুদানের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। সাভারে মোহামেডানের প্রায় ৭৫ বিঘা জমিতে ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলোর আদলে স্পোর্টস কমপ্লেক্স গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
ক্লাবের অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি পুরোনো ফুটবল সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যও রয়েছে মোহামেডানের। ঢাকা স্টেডিয়ামকে ফুটবলের জন্য উন্মুক্ত করার দাবিতে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন ক্লাব সভাপতি। তার প্রত্যাশা, ঐতিহ্যবাহী ভেন্যুতে আবারও মোহামেডান-আবাহনীর মতো বড় ম্যাচের উত্তেজনা ফিরবে।
বরকতউল্লাহ বুলু বলেন, ‘মোহামেডানকে শুধু দেশের ফুটবলে নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও শক্তিশালী ক্লাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই আমরা। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন উন্মাদনা তৈরিতে মোহামেডান ভূমিকা রাখবে।’
দলবদলের মাঠেও সেই প্রত্যাবর্তনের বার্তা স্পষ্ট। একদিকে শক্তিশালী স্কোয়াড, অন্যদিকে জিকোর মতো অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য গোলকিপারের সংযোজন—সব মিলিয়ে এবারের মোহামেডানকে ঘিরে প্রত্যাশা বেড়েছে সমর্থকদের।
তবে দল গড়া আর মাঠে সাফল্য, দুই বিষয় এক নয়। শিরোপার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে নতুন মৌসুমে দলটির পারফরম্যান্সে তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। শেষ দিনে জিকোকে দিয়ে চমক দেখিয়ে মোহামেডান নিজেদের প্রস্তুতির জানান দিয়েছে। এখন মাঠের লড়াইয়েই প্রমাণ করতে হবে, সাদা-কালোদের এই নতুন যাত্রা সত্যিই ফিরিয়ে আনতে পারে কি না তাদের হারানো গৌরব।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









