লামিন ইয়ামাল মাঝে মাঝে নিজেকে সুপারম্যান কিংবা স্পাইডার-ম্যান মনে করেন। এখন স্পেনের সমর্থকদেরও মনে হচ্ছে, হয়তো কথাটা পুরোপুরি মজা নয়। এই কিশোরের খেলায় এমন কিছু আছে, যা সাধারণ ব্যাখ্যার বাইরে। যেন শরীরের ভেতর থেকে কোনো অদৃশ্য শক্তি বেরিয়ে এসে মাঠটাকে নিজের করে নিচ্ছে।
ওভিয়েদোর কার্লোস তার্তিয়েরে শনিবার রাতে সেই দৃশ্যেরই আরেকটি অধ্যায় লেখা হলো। চেকিয়ার বিপক্ষে ৩-১ গোলের জয় পেল স্পেন। টানা তৃতীয় ম্যাচে ছয় মিনিটের মধ্যেই গোল করলেন ইয়ামাল। আর এই জয়ে নেশন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে মাত্র এক পয়েন্ট দূরে চলে গেল বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে তাই বলেই ফেললেন, ‘লামিনে ইয়ামাল কিংবদন্তি হওয়ার পথেই আছে।’
কিন্তু গল্পটা শুধু ইয়ামালের গোলের নয়। কারণ ম্যাচটি একসময় এতটাই স্পেনের নিয়ন্ত্রণে ছিল যে দ্বিতীয়ার্ধে নাটক হবে, তা ভাবাই কঠিন। বিরতির আগে রদ্রি আরও একটি গোল করে ব্যবধান ২-০ করেছিলেন। ইয়ামালও তখন মাঠের বাইরে। মনে হচ্ছিল, তার রাত শেষ। কিন্তু ফুটবল কখনো কখনো নিজের গল্প নিজেই বদলে ফেলে।
দ্বিতীয়ার্ধে চেকিয়া বদলে গেল। আরও সাহসী, আরও আক্রমণাত্মক। ৬৯ মিনিটে জিরি স্লামা গোল করে ব্যবধান কমালেন। এরপর ৭৯ মিনিটে রায়ান নাদেরির গোল বাতিল হলো বিতর্কিত ফাউলের সিদ্ধান্তে। চেকিয়ার কাছে তখন সমতা ফেরানোর সুযোগ ছিল। পরে লাদিস্লাভ ক্রেইচি লাল কার্ড দেখলে তাদের প্রত্যাবর্তনের শেষ আশাটুকুও প্রায় শেষ হয়ে যায়। আর ৮৯ মিনিটে মিকেল মেরিনো গোল করে স্পেনকে স্বস্তি দেন।
তবে রাতের শুরুটা ছিল ইয়ামালকে ঘিরেই। খেলা শুরুর মাত্র ১৫ সেকেন্ডের মাথায় তিনি চেকিয়ার গোলরক্ষক আন্তোনিন কিনস্কির দিকে ছুটে গেলেন। ৫৭ সেকেন্ডে ওভিয়েদোর গ্যালারি প্রায় বিস্ফোরিত হয়ে যাচ্ছিল। দানি ওলমোর পাস ধরে গোলরক্ষককে কাটিয়ে শট নিয়েছিলেন ইয়ামাল। কিন্তু বলটি পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়। অপেক্ষা করতে হলো আরও কয়েক মিনিট। ষষ্ঠ মিনিটে ওলমোর সঙ্গে দ্রুত ওয়ান-টু খেলে ডান দিক দিয়ে বক্সের কোণায় পৌঁছালেন ইয়ামাল। তারপর বাঁকানো এক শট—বল দূরের পোস্টের দিকে উড়ে গিয়ে জালে। এমন গোল, যা একসময় বিস্ময় তৈরি করত; এখন যেন ইয়ামালের কাছে সেটাই স্বাভাবিক। মাত্র ৩২০ সেকেন্ড মাঠে কাটিয়ে জাতীয় দলের হয়ে টানা তিন ম্যাচে গোল করলেন তিনি।
স্পেন তখন তাড়াহুড়া করছে না। বরং ধীরে ধীরে ম্যাচটাকে নিজেদের ছন্দে নিয়ে যাচ্ছিল। প্রথমার্ধে তাদের দখলে ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ বল; গোলের দিকে শট নিয়েছিল ১৩টি, চেকিয়ার মাত্র একটি। ৩৫ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করলেন রদ্রি। সাধারণত তিনি এমন খেলোয়াড়, যিনি সামনে গিয়ে আলো কাড়ার চেয়ে মাঝমাঠ থেকে পুরো খেলাটাকে নিয়ন্ত্রণ করতেই বেশি স্বচ্ছন্দ। কিন্তু এবার তিনি নিজেই বল নিয়ে এগিয়ে গেলেন। পেদ্রির সঙ্গে পাস বিনিময়ের পর তাঁর শট জালে। স্পেন ২-০ এগিয়ে গেল।
ইয়ামাল এরপরও সুযোগ তৈরি করলেন। আলেক্স বায়েনাকে দিয়ে দিলেন একটি দারুণ বল। পরে বায়েনার পাসেই আবার শট নিলেন নিজে। গোল হলো না। বিরতির সময় বায়েনা ও ইয়ামাল—দুজনকেই তুলে নিলেন দে লা ফুয়েন্তে।
মনে হচ্ছিল, ইয়ামালের আর দরকার নেই। কিন্তু চেকিয়ারও যেন তখনই ম্যাচে ফিরে আসার প্রয়োজনটা বুঝতে পারল।তাদের আক্রমণ শুরু হচ্ছিল নিচ থেকে। ডান দিক দিয়ে উঠে বল মাঝখানে এল। অ্যাডাম হ্লোজেক দেখলেন জিরি স্লামা ছুটে আসছেন। তাঁর পাস ধরে স্লামা নিচু শটে বল পাঠিয়ে দিলেন দাভিদ রায়ার নাগালের বাইরে। ২-১।
এরপর স্পেনের জন্য শুরু হলো উদ্বেগের সময়। রায়া গোললাইন ছেড়ে উঠে এসে একটি ভুল পাস করলেন। বল গিয়ে পড়ল ওন্দ্রেই লিঙ্গরের কাছে। গোলরক্ষককে ছাড়া পাওয়া গোলের সুযোগও নষ্ট করলেন লিঙ্গর—শট বাইরে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর আরও বড় বিপদ।
মিখাল সাদিলেকের দীর্ঘ ক্রসে লাদিস্লাভ ক্রেইচির হেড। রায়া বলটি ঠিকমতো ধরে রাখতে পারলেন না। বল গোললাইনের কাছে পড়ে রইল। রায়ান নাদেরি সেটি জালে ঠেলে দিলেন। চেকিয়ার খেলোয়াড়েরা উদ্যাপন শুরু করলেন। কিন্তু রেফারি ভাসিলিস ফোতিয়াস আগেই বাঁশি বাজিয়েছিলেন। ফাউলের সিদ্ধান্তে গোল বাতিল।
চেকিয়ার জন্য হতাশা, স্পেনের জন্য স্বস্তি। এরপর ক্রেইচির লাল কার্ড ম্যাচের শেষ সমীকরণটাও বদলে দিল। দশজনের চেকিয়া আর বেশিক্ষণ টিকতে পারল না। ভিক্টর মুনিয়োসকে সামনে এগিয়ে দিল স্পেন। কিনস্কি তাঁর শট ঠেকালেন। কিন্তু বলটা সেখানেই শেষ হয়নি। মেরিনো, যিনি সব সময় এমন মুহূর্তের আশপাশে থাকেন, সুযোগটি নষ্ট করলেন না। ৮৯ মিনিটে ৩-১। তারপর আর নাটক নেই।
১১ বছর পর ওভিয়েদোয় ফিরে এসে স্পেন আবারও জিতল। রাতের শুরুতে রদ্রি পেয়েছিলেন বিশ্বকাপ ট্রফি—রিয়াল ওভিয়েদোর একাডেমি থেকে উঠে আসা সান্তি কাসোরলা ও হুয়ান মাতার হাত থেকে। সেই প্রজন্মের খেলোয়াড়দের সামনে ট্রফি পাওয়া ছিল এক প্রতীকী মুহূর্ত। আর রাতের শেষে স্পেনের নতুন প্রজন্মের মুখ হয়ে দাঁড়ালেন ইয়ামাল।
হয়তো এটাই স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাদের কাছে অতীত আছে, কিন্তু তারা শুধু অতীতের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। বিশ্বকাপ ও ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন হিসেবে মাঠে ফিরেছে তারা, আর সেই দলের সবচেয়ে আলোচিত নাম এখন মাত্র এক কিশোর।
ইয়ামাল তাই সুপারম্যান কি না, তার উত্তর হয়তো সময়ই দেবে। কিন্তু এই মুহূর্তে স্পেনের প্রতিটি ম্যাচে একটা প্রশ্ন থাকছে—আজ সে আবার কী করবে? এখন পর্যন্ত উত্তরটা একই: এমন কিছু, যা স্বাভাবিক হওয়ার কথা নয়। অথচ ইয়ামাল সেটাকেই প্রায় স্বাভাবিক করে ফেলেছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









