লুইস দে লা ফুয়েন্তের হাতে অবশেষে উঠল সেই ট্রফি, যা তার পুরস্কারের সংগ্রহে এত দিন অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রথমেই তিনি নিজের কথা বললেন না। পুরস্কারটি ভাগ করে দিলেন তার খেলোয়াড়দের সঙ্গে। লন্ডনের প্যালাডিয়ামে ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানে বর্ষসেরা পুরুষ কোচের পুরস্কার জিতেছেন স্পেনের এই বিশ্বকাপজয়ী কোচ। তার কাছে এটি ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং একটি দলের সম্মিলিত সাফল্যের স্বীকৃতি।
এবারের পুরস্কারের মনোনয়ন তালিকায় স্পেনের আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মতো। দে লা ফুয়েন্তের সঙ্গে মনোনীত হয়েছিলেন লুইস এনরিকে, মিকেল আরতেতা ও উনাই এমেরি। তালিকার পঞ্চম নামটি ছিল বেলজিয়ামের কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানির। ব্যালন ডি’অরের ইতিহাসে পুরুষ কোচের বিভাগে এত বেশি স্প্যানিশ মনোনয়ন আগে দেখা যায়নি। শেষ পর্যন্ত পুরস্কারটি উঠেছে লা রিওহার এই কোচের হাতে—যিনি মাত্র চার বছর আগেও ফুটবলবিশ্বের আলোচনায় তেমন পরিচিত ছিলেন না।
পুরস্কার গ্রহণের সময় তার বক্তব্যে কৌশল, প্রতিদ্বন্দ্বী কিংবা নিজের কৃতিত্বের চেয়ে বেশি জায়গা পেয়েছে খেলোয়াড়দের প্রতি কৃতজ্ঞতা। দে লা ফুয়েন্তে বলেন, তার দলের আসল শক্তি হলো খেলোয়াড়দের উদার মানসিকতা। তারা ব্যক্তিগত স্বার্থের আগে দলের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেন। তাদের মূল্যবোধ যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি ফুটবলীয় প্রতিভাও অসাধারণ। এই দুইয়ের সমন্বয়েই দলটি প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি এগিয়ে যেতে পেরেছে।
এরপর তিনি এমন একটি কথা বলেন, যা তার বক্তব্যের সারমর্ম হয়ে উঠেছে: ‘পেশাগত ও ব্যক্তিগত—দুই দিক থেকেই এই ছেলেদের কোচ হতে পারা আমার জন্য সৌভাগ্যের।’
পুরস্কারটি যে শুধু তার একার নয়, সেটি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন দে লা ফুয়েন্তে। তার ভাষায়, ‘এই সম্মান পাওয়া সত্যিই গৌরবের। কিন্তু এটি কোনো ব্যক্তিগত পুরস্কার নয়; এটি একটি গোষ্ঠীর, একটি অসাধারণ দলের।’ খেলোয়াড়দের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশের পাশাপাশি তিনি ধন্যবাদ জানিয়েছেন স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন (আরএফইএফ), সংস্থাটির সভাপতি, ক্রীড়া পরিচালক এবং পুরো সহায়ক কর্মীবাহিনীকে। তাদের আস্থা ও সহযোগিতাই তাকে এই প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে।

সাফল্যের পেছনে একটি দল
দে লা ফুয়েন্তের এই স্বীকৃতির পেছনে রয়েছে স্পেনের সাম্প্রতিক সাফল্যের ধারাবাহিকতা। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি দলটিকে এনে দিয়েছেন একের পর এক বড় অর্জন। ২০২৩ সালে নেশনস লিগ, ২০২৪ সালে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ—এরপর যুক্তরাষ্ট্রে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্পেন জিতেছে নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপের পুরো আসরেই স্পেন ছিল অপরাজিত। প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামলে পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি গোল হজম করেছিল তারা। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারানোর মধ্য দিয়ে জাতীয় দলের অপরাজিত থাকার ধারাও পৌঁছায় ৩৮ ম্যাচে—পুরুষ জাতীয় দলগুলোর মধ্যে যা দীর্ঘতম। দে লা ফুয়েন্তের অধীনে সিনিয়র জাতীয় দলের হয়ে ৫০ ম্যাচে স্পেনের জয় ৩৮টি। সাফল্যের হার ৭৮ শতাংশ। এই হার ভিসেন্তে দেল বস্কের অধীনেও একই ছিল। সংখ্যাগুলো তাঁর কাজের ধারাবাহিকতা ও কার্যকারিতার একটি স্পষ্ট ছবি তুলে ধরে। ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও বর্তমানে শীর্ষে স্পেন। তবে দে লা ফুয়েন্তের বক্তব্য শুনলে মনে হয়, এসব সাফল্য তাকে আত্মতুষ্ট করেনি। বরং তিনি জানেন, একটি জাতীয় দলের প্রকল্প কখনোই একটি শিরোপা বা একটি পুরস্কারে শেষ হয় না।
সামনে আরও বড় পরীক্ষা
২০২৮ সাল পর্যন্ত তার চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ফলে হাতে রয়েছে সময়, রয়েছে পরিকল্পনাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ। সামনে বড় লক্ষ্য ২০২৮ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, যার আয়োজক যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ড।
লন্ডনের মঞ্চে দে লা ফুয়েন্তে যে কথাটি সবচেয়ে স্পষ্ট করে দিয়েছেন, সেটি তার ফুটবল-দর্শনেরও পরিচয়। সাফল্য কোনো এক ব্যক্তির কাঁধে তৈরি হয় না। কোচের পরিকল্পনা, খেলোয়াড়ের প্রতিভা, পারস্পরিক আস্থা এবং সম্মিলিত দায়িত্ববোধ—সবকিছু মিলিয়েই একটি দল বড় হয়ে ওঠে। বর্ষসেরা কোচের পুরস্কার হাতে নিয়েও তাই তিনি নিজের দিকে আলো টেনে নেননি। আলোটা ফিরিয়ে দিয়েছেন খেলোয়াড়দের দিকে। তার কাছে সেটিই সাফল্যের আসল অর্থ: ব্যক্তিগত স্বীকৃতির মধ্যেও দলের সম্মিলিত কৃতিত্বকে ভুলে না যাওয়া।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









