চ্যাম্পিয়নস লিগের সৌন্দর্যই হলো, এখানে হিসাব মেলে না সব সময়। কখনো একটি ম্যাচ এমন কিছু সত্য সামনে নিয়ে আসে, যা অনেক দিন ধরেই আড়ালে ছিল।
বুধবার ( ৪ নভেম্বর) রাতে ইস্তাম্বুলের কাদিকয় স্টেডিয়ামে ফেনেরবাচের কাছে লিভারপুলের ৩-২ গোলের হার তেমনই এক উপলক্ষ। ম্যাচটি যেন বুঝিয়ে দিল, লিভারপুলের রক্ষণে রোনালদ আরাউহো কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
মাঝমাঠে ছন্দহীনতা, আক্রমণে সৃজনশীলতার অভাব আর রক্ষণে সমন্বয়হীনতা—সব মিলিয়ে লিভারপুলকে মনে হয়েছে ভারসাম্যহীন একটি দল। মাঝমাঠের অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো দলে। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, ত্রেভর ন্যোনি ও দমিনিক সোবোসলাইয়ের খেলা থেকে আক্রমণ গড়ে তোলার ধারাবাহিকতা ছিল না। প্রতিপক্ষের অর্ধে সৃজনশীলতার অভাব ছিল স্পষ্ট, আবার বল হারানোর পর চাপ তৈরিতেও অনীহা দেখা গেছে।
এই পরিস্থিতিতে আরাউহোকে একাদশের বাইরে রাখার সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে দেখা দিল। উরুগুয়ের এই ডিফেন্ডারকে বেঞ্চে রেখে কোচ আন্দোনি ইরাওলা মূল রক্ষণভাগের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সংযোগটিই যেন সরিয়ে দিলেন। আর সেই সুযোগে আলোচনায় চলে এলেন তরুণ জেরেমি জাকেত। ১-১ গোলের সময় তার মনোযোগে ঘাটতি ছিল, আর ৩-১ গোলের মুহূর্তে অভিজ্ঞ ভেদাত মুরিকির সঙ্গে আকাশে বলের লড়াইয়ে হেরে যান তিনি। মুরিকির হেড থেকেই আসে ম্যাচের নির্ধারক গোল।
অথচ জাকেতকে ঘিরে লিভারপুলের প্রত্যাশা কম নয়। ২২ বছর বয়সী এই ফরাসি সেন্টারব্যাকের উচ্চতা ১ দশমিক ৯০ মিটার। গতি, শক্তি, আক্রমণাত্মক মনোভাব এবং পায়ে বল রাখার দক্ষতা—সব মিলিয়ে তাকে ভবিষ্যতের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ কারণেই গত গ্রীষ্মে রেন থেকে ৬ কোটি ইউরো খরচ করে তাকে দলে এনেছে লিভারপুল। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ভার্জিল ফন ডাইকের উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হচ্ছে তাকে।
ইরাওলাও তরুণ এই ডিফেন্ডারের সামর্থ্য নিয়ে সন্দিহান নন। প্রিমিয়ার লিগের প্রথম নয় ম্যাচেই ফন ডাইকের পাশে রক্ষণভাগের কেন্দ্রে জায়গা করে নিয়েছেন জাকেত। কিন্তু এই জায়গাটি শুধু প্রতিভা দিয়ে সামলানো যায় না; প্রয়োজন অভিজ্ঞতা, বিচক্ষণতা ও চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
এ মৌসুমে আরাউহো সেই অভিজ্ঞতারই পরিচয় দিয়েছেন। বার্সেলোনায় দুই মৌসুম চোটের কারণে মাঠের বাইরে থাকার পর পুরোপুরি ছন্দে ফিরতে সময় লাগলেও লিভারপুলের সমর্থকদের আস্থা অর্জন করেছেন তিনি। রাইটব্যাক থেকে রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি সতীর্থদেরও সংগঠিত করছেন। তার আবেগ, লড়াই করার মানসিকতা ও নিষ্ঠা দলের অন্য ডিফেন্ডারদেরও উজ্জীবিত করেছে।
বিশেষ করে জাকেতের জন্য আরাউহোর উপস্থিতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ফন ডাইক ও আরাউহোর মতো অভিজ্ঞ দুই ডিফেন্ডারের পাশে খেলতে গিয়ে তরুণ ফরাসি খেলোয়াড়টি নিজের ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছিলেন। অভিজ্ঞদের উপস্থিতি তাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকতে সাহায্য করেছে। কিন্তু ফেনেরবাচের বিপক্ষে আরাউহো ছিলেন বেঞ্চে। ফলে জাকেতের ওপর দায়িত্ব বেড়েছে, আর সেই দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে তার সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ পেয়েছে।

মাঝমাঠে ম্যাক অ্যালিস্টারের দ্বিধা
লিভারপুলের সমস্যার শুরু অবশ্য মাঝমাঠে। ম্যাক অ্যালিস্টার স্বাভাবিকভাবে আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার হলেও তাকে খেলতে হচ্ছে রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডারের ভূমিকায়। তুরস্কে তাঁকে দেখা গেছে বেশ নিষ্প্রভ। কখন সামনে এগোবেন আর কখন পেছনে থাকবেন, সেই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়েই যেন সময় নষ্ট করেছেন তিনি।
ফলে রক্ষণভাগ থেকে বল বের করে আনা এবং দল পেছনে নামলে ডিফেন্ডারদের সুরক্ষা দেওয়ার কঠিন দায়িত্ব এসে পড়ে তরুণ ন্যোনির ওপর। বয়স ও অভিজ্ঞতার তুলনায় তার দায়িত্ব ছিল অনেক বেশি। যদিও লিভারপুলের প্রথম গোলটি আসে তার পা থেকেই। প্রতিপক্ষের রক্ষণ থেকে ফিরে আসা বল বক্সের বাইরে পেয়ে জালে পাঠান তিনি। কিন্তু এই মুহূর্তে লিভারপুলের প্রয়োজন শুধু গোল করা নয়; প্রয়োজন মাঠের বিভিন্ন অংশে শৃঙ্খলা ও ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা।
ফেনেরবাচের অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। লিগে ষষ্ঠ স্থানে নেমে যাওয়ার পর ক্লাবটি ছিল চাপের মুখে। মঙ্গলবার নতুন কোচ হিসেবে এমরে বেলোজোগলুর দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা আসে। নতুন কোচের আগমনে উজ্জীবিত খেলোয়াড়েরা নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণে মরিয়া ছিলেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে নজর কেড়েছেন এনগোলো কান্তে। মাঝমাঠে তাঁর উপস্থিতি ছিল সময়োপযোগী ও কার্যকর। আক্রমণ সাজাতে তাকে সাহায্য করেছেন মাতেও গুয়েন্দুজি। সামনে রোমেলু লুকাকু ছিলেন আক্রমণের মূল ভরসা, আর ম্যাসন গ্রিনউড একের পর এক সুযোগ তৈরি করেছেন।
লিভারপুলের রক্ষণে ফাটল ধরা পড়ে ফ্রি-কিক থেকে। দেয়াল তৈরির সময় নিজের জায়গা ঠিকমতো ধরে রাখতে পারেননি জাকেত। সেই ফাঁক দিয়ে গ্রিনউডের শট জালে গিয়ে পৌঁছায়। ১-১ গোল হতেই গোলরক্ষক আলিসন ক্ষোভ প্রকাশ করেন সতীর্থদের ওপর।
পরিস্থিতি সামাল দিতে আক্রমণভাগে পরিবর্তন আনেন ইরাওলা। মাঠে নামান মিলোস কেরকেজ, ফ্লোরিয়ান ভির্টৎস, আলেকজান্ডার ইসাক ও কোডি গাকপোকে। গাকপোর ক্রস থেকে হেড করে ২-১ গোল করেন ইসাক। কিন্তু লিভারপুলের আক্রমণ যেন তখনও এক ধরনের একঘেয়েমিতে আটকে। দল যখন ছন্দ হারায়, তখন তাদের সবচেয়ে পরিচিত অস্ত্র হয়ে ওঠে উইং থেকে ক্রস।
গোল করার পরও লিভারপুল নিজেদের গুছিয়ে নিতে পারেনি। বরং রক্ষণে জায়গা ছেড়ে দেওয়ার পুরোনো সমস্যায় ফিরে যায় তারা। সেই সুযোগ কাজে লাগায় ফেনেরবাচে। আর্চি ব্রাউনের গোলে সমতা ফেরে ২-২। এরপর মাঠে নামেন অভিজ্ঞ মুরিকি। জাকেতের সঙ্গে আকাশে বলের লড়াইয়ে জিতে তার হেডেই আসে ৩-২ গোল।

এই হারের ফলাফলের চেয়েও লিভারপুলের জন্য উদ্বেগের বিষয় তাদের খেলার ধরন। এর আগে ঘরের মাঠে আর্সেনালের কাছেও হেরেছিল দলটি। দুই ম্যাচের পারফরম্যান্সেই স্পষ্ট, দলটি ক্রমশ ছন্দ ও ভারসাম্য হারাচ্ছে। বিশেষ করে স্বাভাবিক রক্ষণাত্মক মিডফিল্ডার না থাকায় মাঝমাঠ ও রক্ষণের মধ্যে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সামলাতে পারছে না তারা।
এ কারণেই আরাউহোকে এতটা আপন করে নিয়েছেন অ্যানফিল্ডের সমর্থকেরা। তার মধ্যে তারা দেখছেন এমন একজন ডিফেন্ডারকে, যিনি শুধু নিজের জায়গা সামলান না, সতীর্থদেরও দায়িত্বশীল হতে সাহায্য করেন। বিনয়, নিষ্ঠা, আবেগ ও লড়াই করার মানসিকতা—এই মুহূর্তে লিভারপুলের রক্ষণে এসব গুণেরই প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।
চ্যাম্পিয়নস লিগের অন্য ম্যাচগুলোতেও ছিল গোলের বন্যা। লাইপজিগের মাঠে ম্যানচেস্টার সিটি জিতেছে ৩-২ গোলে। পোর্তো ৪-১ গোলে হারিয়েছে নাপোলিকে। ক্লাব ব্রুগের কাছে ২-১ গোলে হেরেছে পিএসভি। স্লাভিয়া প্রাগের মাঠে আর্সেনাল জিতেছে ২-১ গোলে। ভাইকিং ৪-১ গোলে হারিয়েছে সাবাহকে।
তবে দিনের সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে কোমো। স্তাদ বোর্লে-দেলেলে লঁসকে তারা হারিয়েছে ৯-১ গোলে। চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে এই ব্যবধানের জয় বিরল। ২০১৪ সালে বায়ার্ন মিউনিখের মাঠে দিনামো জাগরেবকে ৯-২ গোলে হারানোর পর এমন বড় ব্যবধানের জয় আর দেখা যায়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









