ত্রয়োদশ জাতীয় সর্বশেষ ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের সংসদ অধিবেশন ছিল ৩০ এপ্রিল, এটি ছিল ২৫ কার্যদিবসের একটি অধিবেশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপনী কার্যদিবসে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে বিরোধী দলের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দেশ ও জনগণ আছে বলেই আমরা আছি। জনগণ যা চায় শিক্ষার পর চাকরি এবং নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক দিয়ে সাধারণ মানুষের সমস্যার সমাধান হবে না”
জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সশস্ত্র বাহিনী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ধন্যবাদ জানান। তিনি আরো বলেন যে, আগামী বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। সংসদকে কার্যকর করতে সকল সংসদ সদস্যের সম্মিলিত প্রচেষ্টার আহ্বান জানান। এই কথাগুলো বলা ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন একটি বিষয়ের অবতারনা করেছেন, যা আগামীর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দর্শন।
সংসদে উল্লেখিত বিষয়গুলো নিয়ে সবার আগ্রহ থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর যে কথা আমার কাছে এই সংসদে সবচে বেশি আগ্রহ জম্নিয়েছে, সেটা হলো তিনি ‘পপুলিস্ট রেটরিক’ কে না বলেছেন। যা তার এক অসাধারণ রাজনৈতিক দর্শন বলেই মনে হয়েছে আমার কাছে।
সংসদীয় গণতন্ত্রে বিতর্ক ও বক্তৃতার একটি নিজস্ব ব্যাকরণ থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা দেখি, রাজনীতির ময়দানে বা সংসদের ফ্লোরে এমন সব কথা বলা হয় যা সাধারণ মানুষের আবেগ ও তাৎক্ষণিক আকুলতাকে পুঁজি করে সাজানো। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান একটি ধ্রুপদী রাজনৈতিক সত্য উচ্চারণ করেছেন, যা আমাদের চিরাচরিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য এক বড় ধরনের ধাক্কা। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “আমি চাইলে এই সংসদে এমন অনেক জনপ্রিয় মুখরোচক কথা বলতে পারবো, যা শুনে প্রচুর তালি হবে, কিন্তু দেখা গেল, সেসব কথা যতটা পপুলার ততটা সঠিক নয়। আমি আসলে সেসব পপুলার কথা বলতে চাই না; আমি চাই সঠিক কথা বলতে। সে কথার জনপ্রিয়তা না থাক, অন্তত সঠিক কথাটা নিয়ে সেসব বাস্তবায়ন করে দেশের মানুষের উন্নয়ন হোক।”
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যটি কেবল একটি রাজনৈতিক বিবৃতি নয়, এটি রাষ্ট্র পরিচালনার একটি গভীর দর্শন। এটি তথাকথিত ‘পপুলিজম’ বা জনপ্রিয়তাবাদের বিপরীতে ‘রিয়েল-পলিটিক’ এবং টেকসই উন্নয়নের একটি সাহসী অঙ্গীকার। আমার মনে হচ্ছে আজ প্রধানমন্ত্রীর বলা এই জনপ্রিয় কথা এবং সঠিক কথার মধ্যকার ব্যবধান নিয়ে এবং কেন একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি উন্নতির জন্য ‘সঠিক কথা’ বা ‘তিক্ত সত্য’ বলা জরুরি।
জনপ্রিয় কথা বনাম সঠিক কথার একটি মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করা যাক।
জনপ্রিয় কথা বা ‘পপুলার টক’ সাধারণত মানুষের সাময়িক আবেগ, ক্ষোভ বা সস্তা স্বপ্নকে স্পর্শ করে। এটি অনেকটা পেইনকিলারের মতো। যা তাৎক্ষণিক আরাম দেয় কিন্তু রোগের নিরাময় করে না। রাজনৈতিক পরিভাষায় একে বলা হয় ‘পপুলিস্ট রেটরিক’। অন্যদিকে, সঠিক কথা বা ‘রাইট টক’ অনেক সময় রূঢ় হয়, সাধারণ মানুষের কানে তা কর্কশ শোনাতে পারে। কিন্তু একটি রাষ্ট্র যখন কোনো সংকটের মধ্য দিয়ে যায় বা বড় কোনো পরিবর্তনের লক্ষ্য স্থির করে, তখন জনপ্রিয় মিথ্যার চেয়ে অপ্রিয় সত্য অনেক বেশি কার্যকর।
উদাহরণস্বরূপ, একটি দেশের অর্থনীতি যখন মুদ্রাস্ফীতির চাপে থাকে, তখন জনপ্রিয় কথা হতে পারে ‘সবকিছুর দাম অর্ধেক করে দেব’। এটি শুনলে মানুষ হাততালি দেবে, কিন্তু এর বাস্তব কোনো ভিত্তি নেই। অন্যদিকে সঠিক কথাটি হলো ‘অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য আমাদের সাময়িকভাবে কৃচ্ছ্রসাধন করতে হবে এবং উৎপাদন বাড়াতে হবে’। এই দ্বিতীয় কথাটি শুনতে পপুলার নয়, তালি পড়ার সম্ভাবনাও কম, কিন্তু এটিই হলো রাষ্ট্রের আসল মুক্তির পথ। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে ঠিক এই সত্যটিই তুলে ধরেছেন যে, তিনি হেডলাইনের রাজনীতি নয়, বরং ফলাফলের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। যুগের পর যুগ বিশ্ব রাজনীতির আয়নায় সঠিক কথার জয়জয়কার হয়ে আসছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, যেসব রাষ্ট্রনায়ক জনপ্রিয়তার মোহে না পড়ে সঠিক সিদ্ধান্তের পথে হেঁটেছেন, তারাই শেষ পর্যন্ত নিজেদের জাতিকে উন্নত বিশ্বের কাতারে নিয়ে যেতে পেরেছেন।
উইনস্টন চার্চিল ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ঘটনা।
১৯৪০ সালে যখন ব্রিটেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ সংকটে, তখন চার্চিল সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, “রক্ত, শ্রম, অশ্রু আর ঘাম ছাড়া আমার আর কিছুই দেওয়ার নেই।”
এটি কোনো জনপ্রিয় বা মুখরোচক কথা ছিল না। এটি ছিল এক রূঢ় বাস্তবতা। তিনি যদি তখন বলতেন ‘আমরা খুব সহজেই যুদ্ধে জিতে যাব, চিন্তা করবেন না’, তবে হয়তো ব্রিটিশ জনতা সাময়িক খুশি হতো, কিন্তু ইতিহাসের গতিপথ ভিন্ন হতে পারতো। তিনি সঠিক কথা বলেছিলেন বলেই ব্রিটেন সে যাত্রায় ঘুরে দাঁড়িয়েছিল।
লি কুয়ান ইউ ও সিঙ্গাপুরের উত্থানের সময়ের দিকে একটু উঁকি দেয়া যাক।
সিঙ্গাপুরের রূপকার লি কুয়ান ইউ যখন দেশটির হাল ধরেন, তখন তিনি জনপ্রিয়তার তোয়াক্কা করেননি। তিনি অনেক কঠোর আইন এবং কর কাঠামো আরোপ করেছিলেন যা সেই সময়ের মানুষের কাছে মোটেও জনপ্রিয় ছিল না। অনেক সময় তাকে একনায়কতন্ত্রের অপবাদও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি বলতেন, “আমি সঠিক কাজটি করছি কি না তা ইতিহাসে প্রমাণিত হবে।” আজ সিঙ্গাপুর বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্র। তিনি যদি জনপ্রিয় কথা বলে মানুষকে খুশি রাখার রাজনীতি করতেন, তবে সিঙ্গাপুর হয়তো আজও একটি জেলেদের-গ্রাম হয়েই থাকতো। মার্গারেট থ্যাচার ও ব্রিটিশ অর্থনীতির দিকে একটু চোখ বুলানো যাক।
১৯৮০-এর দশকে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার যখন ধুঁকতে থাকা ব্রিটিশ অর্থনীতিকে সংস্কার করতে শুরু করেন, তখন তার অনেক সিদ্ধান্তই ছিল চরম অজনপ্রিয় এবং সমালোচিত। সেসময় শ্রমিক ধর্মঘট এবং প্রবল বিরোধিতার মুখেও তিনি বলেছিলেন, “ঞযব ষধফু’ং হড়ঃ ভড়ৎ ঃঁৎহরহম.” অর্থাৎÑ ছেলেগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য নয়। তিনি জনপ্রিয়তার পেছনে ছোটেননি, বরং সঠিক অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে অবিচল ছিলেন। ফলাফল হিসেবে দেখতে পাই আজ ব্রিটিশ অর্থনীতির ভিত অনেক বেশি মজবুত হয়েছে।
সংসদ হলো আইন প্রণয়ন এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সর্বোচ্চ স্থান। এখানে যদি কেবল মুখরোচক কথার ফুলঝুরি ছড়ানো হয়, তবে তা একটি থিয়েটার বা যাত্রামঞ্চে পরিণত হয়। যা আমাদের নিকট অতিতে হয়েছে।
উন্নত বিশ্বের সংসদের দিকে তাকালে আমরা দেখি সেখানে তথ্য, উপাত্ত এবং যুক্তিনির্ভর বিতর্কের কদর বেশি।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ‘হাউস অফ কমন্স’ বা জার্মানির ‘বুন্দেশটাগ’-এ বিতর্ক হয় নীতির ওপর ভিত্তি করে। সেখানে কোনো নেতা যদি এমন কোনো ঘোষণা দেন যা অবাস্তব, তবে বিরোধী দল এবং সাধারণ মানুষ তাকে ‘পপুলিস্ট’ বলে প্রত্যাখ্যান করে। আমার মতে প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের বক্তব্যে সেই আধুনিক সংসদীয় সংস্কৃতিরই প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি সংসদকে তালি দেওয়ার জায়গা নয়, বরং জনগণের সত্যিকারের সমস্যা সমাধানের মঞ্চ হিসেবে দেখতে চান।
জনপ্রিয়তার পেছনে ছোটার একটি বড় বিপদ হলো তা রাষ্ট্রকে দেউলিয়া করে দিতে পারে। দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশ, যেমন ভেনিজুয়েলা বা আর্জেন্টিনা এক সময় চরম জনপ্রিয়তাবাদের শিকার হয়েছিল। সেসব দেশের শাসকরা জনগণকে খুশি করার জন্য ঢালাওভাবে ভর্তুকি এবং অবাস্তব সব প্রতিশ্রুতির কথা শুনিয়েছিলেন। আজ সেসব দেশ মুদ্রাস্ফীতি আর দারিদ্র্যের অতলে তলিয়ে গেছে। বাংলাদেশেও যদি আমরা কেবল জনপ্রিয়তার খাতিরে মেগা প্রকল্পের নামে অবাস্তব ঋণ গ্রহণ করি বা সব খাতে ভর্তুকি দিয়ে অর্থনীতিকে পঙ্গু করে রাখি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ভয়াবহ সংকট রেখে যাব। তাই আজ সময় এসেছে ‘সঠিক উন্নয়নের রোডম্যাপ’ অনুসরণ করার। প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন, তিনি সঠিক কথাটা বলতে চান, তখন তিনি আসলে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের কথা বলেন। আমি বলব এক্ষেত্রে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমেরও দায়বদ্ধতা আছে।
আমাদের গণমাধ্যমগুলোও অনেক সময় ‘ক্লিকবেট’ বা মুখরোচক হেডলাইনের পেছনে ছোটে। কোনো একজন নেতা সংসদে আক্রমণাত্মক বা সস্তা কোনো কথা বললে তা ভাইরাল হয়। কিন্তু যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচক বা কৃষি সংস্কারের জটিল কিন্তু সঠিক আলোচনা হয়, তখন তাতে তেমন মনোযোগ দেওয়া হয় না। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের এই অংশটি গণমাধ্যমের জন্যও একটি বার্তা। আপনারা কি কেবল তালি পাওয়া কথার হেডলাইন করবেন, নাকি সঠিক ও গঠনমূলক আলোচনার সারমর্ম মানুষের কাছে পৌঁছে দেবেন?
আমাদের দেশের মানুষ অনেক সময় আবেগী। আমরা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। কিন্তু স্বপ্নের চেয়ে বাস্তব অনেক বেশি কঠিন। একটি উন্নয়নশীল দেশকে উন্নত দেশে রূপান্তর করতে হলে অনেক বড় বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এই পরিবর্তনগুলো সব সময় জনপ্রিয় হয় না। উদাহরণস্বরূপ ট্যাক্স নেট বাড়ানো, আইনি সংস্কার, দুর্নীতি দমনে কঠোর হওয়া বা শিক্ষার মান উন্নত করতে হলে সিস্টেমের মধ্যে যে কাঁটাছেঁড়া করতে হয়, তা অনেকের জন্য অস্বস্তিকর।
কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যখন সঠিক কথাটি বলার সাহস দেখান, তখন সাধারণ মানুষের উচিত সেই সাহসের প্রতি সমর্থন জানানো। কারণ, তালি দেওয়া হাততালির শব্দ কয়েক সেকেন্ড পরেই মিলিয়ে যায়, কিন্তু একটি সঠিক সিদ্ধান্তের সুফল ভোগ করে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
জনপ্রিয়তা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সত্য চিরন্তন। রাজনীতিতে তালি পাওয়ার চেয়ে মানুষের দোয়া পাওয়া অনেক বেশি জরুরি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে দাঁড়িয়ে যে কথাটি বলেছেন, তা যদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আষ্টেপৃষ্ঠে গেঁথে দেওয়া যায়, তবে আমাদের রাজনীতির মান বহুগুণ বেড়ে যাবে। আগামীর বাংলাদেশ হবে তথ্যের বাংলাদেশ, যুক্তির বাংলাদেশ এবং টেকসই উন্নয়নের বাংলাদেশ। এখানে চটকদার হেডলাইন নয়, বরং গুরুত্ব পাবে বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা। জনপ্রিয় কথার মায়াজাল ছিন্ন করে আমরা যদি ‘সঠিক পথে’ চলতে পারি, তবেই আমাদের সম্মিলিত শক্তি জাগ্রত।
সঠিক কথাটি সব সময় জনপ্রিয় হয় না, কিন্তু সঠিক কথাটিই দেশকে সঠিক গন্তব্যে নিয়ে যায়। সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এই দর্শনটিই হোক আমাদের ধ্রুবতারা, আমাদের আগামীর পাথেয়।
লেখক : কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









