মানুষ যখন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা হারায়, তখন তার শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে চিকিৎসা। আর সেই চিকিৎসার শেষ ভরসার নাম যদি হয় জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর), তবে সেখানে রোগী কেবল একটি অস্ত্রোপচার নয়- নিজের জীবন, ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের সমস্ত আশা চিকিৎসকের হাতে সমর্পণ করেন। কিন্তু সেই আস্থার দেয়ালেই যদি দুর্নীতির ফাটল ধরে, যদি অসহায় রোগীর শরীরকে কমিশননির্ভর বাণিজ্যের ক্ষেত্র বানানো হয়, তবে তা শুধু একটি হাসপাতালের সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
দৈনিক এদিন-এর অনুসন্ধানে নিটোরকে ঘিরে যে অভিযোগগুলো উঠে এসেছে- ইমপ্ল্যান্টের মূল্য নিয়ে অস্বচ্ছতা, কমিশন বাণিজ্য, রোগীর কাছ থেকে তথ্য গোপন রাখা এবং ব্যবহৃত ইমপ্ল্যান্ট পুনরায় ব্যবহারের মতো গুরুতর অনিয়ম- তা সত্য হলে এটি নিছক দুর্নীতির ঘটনা নয়; এটি মানুষের জীবন নিয়ে নির্মম বাণিজ্যের এক ভয়াবহ চিত্র। এটি শুধু একটি হাসপাতালের সংকট নয়; এটি গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ হলো, অপারেশনে ব্যবহৃত ইমপ্ল্যান্টের ব্র্যান্ড, সাইজ, ধাতুর ধরন কিংবা বারকোড রোগীকে জানানো হয় না। অস্ত্রোপচারের পর রোগী জানতেই পারেন না, তাঁর শরীরে কী বসানো হয়েছে। অথচ বিশ্বের উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রতিটি ইমপ্ল্যান্টের পরিচয়, ব্যাচ নম্বর ও বারকোড রোগীর নথিতে সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশে সেই ন্যূনতম স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করা যায়নি। এর সুযোগে রোগীর অজান্তেই নিম্নমানের ডিভাইস ব্যবহার বা অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। এর চেয়েও ভয়ঙ্কর অভিযোগ ব্যবহৃত ইমপ্ল্যান্ট পুনরায় বিক্রি ও প্রতিস্থাপন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে একবার ব্যবহৃত অধিকাংশ অর্থোপেডিক ইমপ্ল্যান্ট পুনরায় অন্য রোগীর শরীরে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটি শুধু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায় না; রোগীর জীবনকেও মারাত্মক বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। যদি এমন অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে, তবে এটি দুর্নীতির সীমা ছাড়িয়ে ফৌজদারি অপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে বিবেচনার দাবি রাখে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, এই অনিয়মের পেছনে শুধু কিছু অসাধু ব্যক্তি নন, বরং একটি সংঘবদ্ধ স্বার্থগোষ্ঠীর অস্তিত্বের অভিযোগ উঠেছে। চিকিৎসক, ওটিসংশ্লিষ্ট কর্মী, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এবং দালালচক্রের সমন্বয়ে যদি একটি কমিশননির্ভর ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তবে সেটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির লক্ষণ। এমন পরিস্থিতিতে কেবল প্রশাসনিক সতর্কতা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত।
এই ঘটনায় আরেকটি বড় বাস্তবতা সামনে এসেছে- দেশে অর্থোপেডিক ইমপ্ল্যান্টের মূল্য নির্ধারণে এখনো কার্যকর সরকারি নীতিমালা নেই। মূল্যনিয়ন্ত্রণের অভাবে রোগীরা কত টাকা দিচ্ছেন, তার কতটা প্রকৃত মূল্য আর কতটা কমিশন- তা জানার কোনো সুযোগ নেই। এই শূন্যতার সুযোগেই সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, আর ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর এ বিষয়ে দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
শুধু তদন্ত কমিটি গঠন করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষ, সময়সীমাবদ্ধ এবং প্রকাশ্য। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা সিন্ডিকেট- যেই হোক, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি ইমপ্ল্যান্টের জন্য বাধ্যতামূলক ডিজিটাল ট্র্যাকিং, ইউনিক বারকোড সংযুক্তি, পূর্ণাঙ্গ রসিদ প্রদান, অপারেশন থিয়েটারে সিসিটিভি নজরদারি, নিয়মিত স্বাধীন অডিট এবং ইমপ্ল্যান্টের সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ এখন আর বিলাসিতা নয়; জনস্বার্থে অপরিহার্য সংস্কার।
স্বাস্থ্যসেবা কোনো কমিশনের বাজার হতে পারে না। সরকারি হাসপাতাল মানুষের শেষ ভরসার জায়গা। সেই ভরসার জায়গায় যদি দুর্নীতির অস্ত্রোপচার চলে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একজন রোগী নয়- ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের বিশ্বাস।
সরকার ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। এখন দেশবাসী আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চায়। কারণ, মানুষের শরীরে বসানো প্রতিটি ইমপ্ল্যান্ট শুধু একটি চিকিৎসা-সরঞ্জাম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন মানুষের জীবন, ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের আশা। সেই জীবন নিয়ে কোনো ধরনের বাণিজ্য বা প্রতারণার স্থান একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কখনোই হতে পারে না। ‘পঙ্গুর’ গিঁটে গিঁটে জোচ্চুরি বন্ধ করতে সংস্কার জরুরি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









