বাংলাদেশের মানুষের কাছে বন্যা নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়। নদীমাতৃক এই দেশে বর্ষা মৌসুমে বন্যা একদিকে যেমন প্রাকৃতিক বাস্তবতা, অন্যদিকে তেমনি মানুষের জীবন ও জীবিকার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যার ধরন ও ভয়াবহতা বদলে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, উজানের ঢল এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রমের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন আরও আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠছে।
২০২৬ সালের জুলাই মাসে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ধস আবারও সেই কঠিন বাস্তবতা সামনে এনেছে। ১১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্যা ও পাহাড়ধসে প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় ৪৪ জনে পৌঁছেছে। একই সময়ে ১০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে, ফসল নষ্ট হয়েছে এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বিপর্যয়
এবারের বন্যার অন্যতম প্রধান কারণ অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট মৌসুমি নিম্নচাপের প্রভাবে জুলাইয়ের শুরু থেকে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে টানা কয়েক দিন প্রবল বৃষ্টিপাত হয়। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য এলাকায় অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ি নদী, ছড়া ও জলাধারগুলো দ্রুত পানিতে পূর্ণ হয়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল। ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয় ও মিজোরাম অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে বিপুল পরিমাণ পানি বাংলাদেশের নদীগুলোতে প্রবেশ করে। সাঙ্গু, মুহুরী, হালদা, মাতামুহুরী, মনু ও খোয়াই নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়ছে। বাংলাদেশেও এর প্রভাব স্পষ্ট। অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধস এখন আগের তুলনায় বেশি ঘন ঘন ঘটছে।
মানবসৃষ্ট কারণেও বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতি
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মানুষের কিছু কর্মকাণ্ডও বন্যার ভয়াবহতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা, বন উজাড়, নদী-খালের দখল ও নাব্যতা সংকটের কারণে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাহাড়ি অঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিত বসতি ও পাহাড় কাটার ফলে ভূমির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। অতিবৃষ্টির সময় এসব এলাকায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। একইভাবে অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। প্রকৃতির ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানো না গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগ আরও ভয়াবহ হতে পারে।
চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়
এবারের বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া, বাঁশখালী, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, ফটিকছড়ি, রাঙ্গুনিয়া ও হাটহাজারীর বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। কক্সবাজার জেলার চকরিয়া, পেকুয়া, রামু ও উখিয়ায় বন্যার পাশাপাশি পাহাড়ধস ব্যাপক ক্ষতি করেছে। মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে বহু পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বান্দরবান জেলায় সাঙ্গু নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সদর, লামা ও আলীকদমের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পাহাড়ি সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতেও পাহাড়ি ঢল ও নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে বহু মানুষ ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও বাড়ছে উদ্বেগ
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাশাপাশি সিলেট বিভাগের কয়েকটি জেলাতেও বন্যার প্রভাব পড়েছে। মৌলভীবাজারে মনু ও ধলাই নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। হবিগঞ্জে খোয়াই নদীর পানি বেড়ে নিচু অঞ্চল পানির নিচে চলে গেছে।
সিলেট ও সুনামগঞ্জের নদীগুলোতেও পানি বাড়ছে।উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে আরও কিছু এলাকায় বন্যার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
মানুষের দুর্ভোগ ও মানবিক সংকট
বন্যার সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে সাধারণ মানুষের জীবনে। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়েছে। কৃষকের ফসল নষ্ট হয়েছে, গবাদিপশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বহু মানুষের আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। দুর্গত এলাকায় খাবার, নিরাপদ পানি ও ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। তাই ত্রাণের পাশাপাশি চিকিৎসা, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসনের চ্যালেঞ্জ
বন্যা মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, প্রশাসন ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কাজ করছে। নৌযান ও স্পিডবোটের মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার, নিরাপদ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। শুধু জরুরি সহায়তা দিয়ে সংকটের সমাধান হবে না। বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ, কৃষি পুনরুদ্ধার, যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল করা এবং মানুষের জীবিকা ফিরিয়ে আনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নতুন পরিকল্পনা প্রয়োজন
প্রতিবছর বন্যার পর ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা করার পরিবর্তে আগাম প্রস্তুতির ওপর জোর দিতে হবে। নদী ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা, বাঁধ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত করা, পাহাড় ও বন রক্ষা করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অপরিকল্পিত বসতি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটিগুলোকে আরও সক্রিয় করতে হবে। পাশাপাশি আবহাওয়া পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কবার্তা দ্রুত সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের বন্যা আবারও আমাদের সতর্ক করেছে। এটি শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং আমাদের পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও দুর্যোগ প্রস্তুতিরও পরীক্ষা। প্রকৃতির পরিবর্তন থামানো সম্ভব নয়, কিন্তু পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমানো সম্ভব। পাহাড়, নদী ও পরিবেশ রক্ষা, নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ এবং শক্তিশালী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে।
বন্যার পানি একসময় নেমে যাবে, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবন স্বাভাবিক করতে প্রয়োজন হবে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ও দায়িত্বশীল উদ্যোগ। তাই এখনই সময়- প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের পরিকল্পনা গ্রহণ করে একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলার।
লেখক : কলামিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









