বরিশাল নগরীর একটি পুরোনো সড়ক। প্রতিদিনের মতোই সেখানে মানুষের চলাচল, দোকানপাট, রিকশার ঘণ্টা আর ব্যস্ত নগরজীবনের কোলাহল। পথচারীদের অনেকেই হয়তো জানেন না, এই সড়কের দুটি বাড়ি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে এক অসাধারণ অধ্যায়ের সাক্ষী। একই সড়কের দুটি পৃথক ঠিকানা থেকে দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন দুই ব্যক্তি। শুধু তাই নয়, তাঁদের দুজনের শিক্ষাজীবনের সূচনাও একই প্রতিষ্ঠানে, প্রায় দুই শতকের ঐতিহ্যবাহী সরকারি বরিশাল জিলা স্কুলে।
প্রয়াত রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের স্পিকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) দুই ভিন্ন সময়ের এই দুই রাষ্ট্রনায়কের জীবনের সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে গেছে একই সড়ক, একই বিদ্যালয় এবং একই শহরের ইতিহাস। এমন বিরল মিল বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়।
স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, এটি কেবল কাকতালীয় কোনো ঘটনা নয়; বরং বরিশালের শিক্ষা-ঐতিহ্য, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নেতৃত্ব তৈরির দীর্ঘ ধারার একটি জীবন্ত উদাহরণ।
বরিশাল নগরীর গোরাচাঁদ দাস লেন বহুদিন ধরেই পরিচিত একটি ঐতিহাসিক আবাসিক এলাকা। এই সড়কের 'বিশ্বাস বাড়ি' দীর্ঘদিনের ঠিকানা ছিল প্রয়াত রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাসের। যদিও তাঁর জন্ম বরিশাল সদর উপজেলার শায়েস্তাবাদের বিশ্বাস পরিবারে, রাজনৈতিক ও পারিবারিক জীবনের বড় অংশ কেটেছে এই বাড়িকে কেন্দ্র করে।
একই সড়কের অল্প দূরত্বে রয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) এর পারিবারিক বাসভবন। তাঁর আদি নিবাস ভোলা হলেও শৈশব, কৈশোর, শিক্ষা ও পারিবারিক জীবনের স্মৃতির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বরিশালের এই গোরাচাঁদ দাস লেন।
দুটি বাড়ির মধ্যকার দূরত্ব খুব বেশি নয়। কিন্তু এই অল্প দূরত্বই একসময় সংযুক্ত করেছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে।
গোরাচাঁদ দাস লেন থেকে অল্প দূরেই দাঁড়িয়ে আছে সরকারি বরিশাল জিলা স্কুল। ১৮২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু বরিশালের নয়, দেশের অন্যতম প্রাচীন বিদ্যালয়।
প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাসে এই বিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে এসেছেন অসংখ্য রাষ্ট্রনায়ক, মুক্তিযোদ্ধা, বিচারপতি, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিজন ও প্রশাসক। সেই দীর্ঘ তালিকায় সবচেয়ে উজ্জ্বল দুটি নাম—আব্দুর রহমান বিশ্বাস এবং হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
আব্দুর রহমান বিশ্বাস ১৯৪৩ সালে এই বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের ১৬তম রাষ্ট্রপতি হন।
তাঁর দায়িত্ব পালনকালেই প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় বরিশাল বিভাগ। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে এটি আজও একটি ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে বিবেচিত।
অন্যদিকে, হাফিজ উদ্দিন আহমদও একই বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর বিএম কলেজে অধ্যয়ন শেষে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জেড ফোর্সে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। সেই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অর্জন করেন 'বীর বিক্রম' খেতাব।
স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন, ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে ভূমিকা এবং পরবর্তীকালে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে তিনি মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
দুই ব্যক্তির জীবনপথে রয়েছে বিস্ময়কর মিল। দুজনই একই শহরে বেড়ে উঠেছেন। একই বিদ্যালয়ে পড়েছেন। দুজনই ব্রজমোহন কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। দুজনই জাতীয় সংসদের স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্বেও অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
এই ধারাবাহিকতা ইতিহাসবিদদের কাছে শুধু কাকতালীয় নয়; বরং একটি শহরের শিক্ষা ও সামাজিক পরিবেশ কীভাবে জাতীয় নেতৃত্ব গড়ে তুলতে পারে, তার অনন্য উদাহরণ।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও ছড়াকার দীপঙ্কর চক্রবর্তী বলেন, সরকারি বরিশাল জিলা স্কুল বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক, শহীদ আলতাফ মাহমুদ, দার্শনিক সরদার ফজলুল করিম, বিচারপতি আবদুর রহমান চৌধুরী, কমরেড সিরাজ সিকদার, অভিনেতা গোলাম মোস্তফা, ইতিহাসবিদ তপন রায়চৌধুরী এবং কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহসহ অসংখ্য গুণী ব্যক্তি।
তিনি স্মরণ করেন, ২০০৫ সালে বিদ্যালয়ের ১৭৫ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে এসে রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস নিজের ছাত্রজীবনের স্মৃতি ভাগ করে নিয়েছিলেন।
প্রবীণ সাংবাদিক অরূপ তালুকদার বলেন, একই সড়ক এবং একই বিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রের দুই সর্বোচ্চ সাংবিধানিক ব্যক্তিত্বের উঠে আসা বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল ঘটনা।
বরিশালের জ্যেষ্ঠ নাগরিক আনোয়ার জাহিদ বলেন, গোরাচাঁদ দাস লেনের পুরোনো বাড়িগুলো যেন নীরবে ইতিহাস বহন করে চলেছে। এই সড়ক প্রমাণ করে, একটি শহরও কখনো কখনো রাষ্ট্রের ইতিহাস লিখতে পারে।
নগর চিন্তাবিদ কাজী মিজানুর রহমান বলেন, আব্দুর রহমান বিশ্বাসের রাষ্ট্রপতি থাকাকালে বরিশাল বিভাগ প্রতিষ্ঠার গৌরব অর্জিত হয়েছিল। এখন একই এলাকার আরেকজন ব্যক্তি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করায় দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশাও বেড়েছে।
সনাকের সাবেক সভাপতি শাহ সাজেদা বলেন, ভোলা-বরিশাল সেতু, পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাস, বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের উন্নয়ন, রেল সংযোগ সম্প্রসারণ, শিল্পাঞ্চল, নদীবন্দর আধুনিকায়ন এবং স্বাস্থ্য ও উচ্চশিক্ষার উন্নয়নের মতো দীর্ঘদিনের দাবিগুলো এখন আরও জোরালোভাবে সামনে আসার সুযোগ রয়েছে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, তাঁর জন্মও এই দুই রাষ্ট্রপ্রধানের বাড়ির পাশের ব্রাউন কম্পাউন্ড এলাকায়। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের বহুদিনের উন্নয়ন-প্রত্যাশা বাস্তবায়নে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি তাঁর সাংবিধানিক অবস্থান থেকে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবেন।
গোরাচাঁদ দাস লেনের পুরোনো বাড়িগুলো আজও দাঁড়িয়ে আছে। সরকারি বরিশাল জিলা স্কুলের শ্রেণিকক্ষেও প্রতিদিন নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা স্বপ্ন দেখতে শেখে। হয়তো তাদের অনেকেই জানে না, এই পথ ধরেই একদিন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্বে পৌঁছেছিলেন দুই মানুষ।
একটি সড়ক, একটি বিদ্যালয় কিন্তু তার বিস্তার একটি শহরের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেছে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে। বরিশালের জন্য এটি শুধু গর্বের বিষয় নয়; এটি প্রমাণ করে, ইতিহাস কখনো কখনো রাজধানীতে নয়, জন্ম নেয় একটি শান্ত শহরের কোনো নিরীহ গলিতে, কোনো পুরোনো বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









