সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে বরিশালের হাজারো পরিবারের মনে একটাই শঙ্কা, আজ আবার কখন বিদ্যুৎ যাবে?
রাতের খাবারের প্রস্তুতি, শিশুদের পড়াশোনা, অসুস্থ মানুষের বিশ্রাম কিংবা ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম সবকিছুই যেন এখন নির্ভর করছে বিদ্যুতের অনিশ্চিত আসা-যাওয়ার ওপর। একবার বিদ্যুৎ আসে, কিছুক্ষণ পরই আবার চলে যায়। কোথাও আধা ঘণ্টা, কোথাও এক-দুই ঘণ্টা, আবার কোনো কোনো এলাকায় গভীর রাত পর্যন্ত চলতে থাকে এমন লোডশেডিং।
বরিশাল নগরীর তুলনায় জেলার বিভিন্ন উপজেলা, বিশেষ করে মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনে যেমন একাধিকবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, তেমনি রাতভরও কয়েক দফা লোডশেডিং চলছে। ফলে গরমে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, এই সংকটের মূল কারণ জাতীয় গ্রিড থেকে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ পাওয়া। চাহিদা ও সরবরাহের বিশাল ব্যবধানের কারণেই বাধ্য হয়ে লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিতরণ করতে হচ্ছে।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামান পলাশ জানান, বর্তমানে বরিশাল নগর ও জেলার মোট বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৮৫ মেগাওয়াট। কিন্তু জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১২২ মেগাওয়াট।
অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৬৩ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি নিয়েই চলছে বরিশালের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা।
তিনি বলেন, চাহিদার তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ পাওয়ায় সব এলাকায় একসঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। সীমিত বিদ্যুৎ সমন্বয় করতেই লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর আওতাধীন মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলায় লোডশেডিং সবচেয়ে বেশি হচ্ছে।
সমিতির জেনারেল ম্যানেজার এ বি এম মিজানুর রহমান বলেন, তাদের আওতায় বরিশাল সদর, মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জ এই চার উপজেলার মোট বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৫৬ মেগাওয়াট। অথচ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৪৬ মেগাওয়াটেরও কম।
তিনি জানান, বিশেষ করে মুলাদী, হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জে সরবরাহকৃত বিদ্যুৎ স্থানীয় চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত নয়। ফলে এসব এলাকায় তুলনামূলক বেশি সময় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
হিজলা উপজেলার বাসিন্দা আইয়ুব আলী বলেন, এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে, এরপর আবার চলে যায়। পুরো রাতজুড়ে এই অবস্থা। কখন বিদ্যুৎ থাকবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায়ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ক্ষোভ বাড়ছে।
সিএন্ডবি রোড, সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ এলাকা, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রূপাতলী, আলেকান্দা, কালীবাড়ি, নথুল্লাবাদ, বিএম কলেজ, সদর রোড, চকবাজার, গির্জা মহল্লা, কাউনিয়া, বিসিক, আমানতগঞ্জ, নতুন বাজারসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় সন্ধ্যার পর থেকেই দফায় দফায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে।
ওজোপাডিকো-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুল কুমার স্বর্ণকার বলেন, আমাদের এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা ৬০ থেকে ৬২ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০ মেগাওয়াট। চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎ দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ দেওয়া সম্ভব নয়।
অন্যদিকে ওজোপাডিকো-২ এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী সাহেল রানা জানান, তাদের আওতায় পিক আওয়ারে ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হলেও পাওয়া যাচ্ছে ৫০ মেগাওয়াট।
তার ভাষায়, বর্তমানে প্রয়োজনের প্রায় ৬২ শতাংশ বিদ্যুৎ পাচ্ছি। বাকি ঘাটতি লোডশেডিংয়ের মাধ্যমেই সমন্বয় করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের ওপর।
প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় ঘুমাতে পারছেন না অনেকে। বাসায় ছোট শিশু কিংবা অসুস্থ রোগী থাকলে দুর্ভোগ আরও বাড়ছে। একই সঙ্গে সন্ধ্যার পর ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে।
নগরীর জিয়া সড়ক এলাকার বাসিন্দা মাসুদ রানা বলেন, বিদ্যুতের বিল দিতে একদিন দেরি হলে নোটিশ আসে। অথচ আমরা নিয়মিত বিল দিয়েও ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাই না। রাতে গরমে ঘুমাতে পারি না, সন্তানের পড়াশোনাও ব্যাহত হচ্ছে।
সাগরদী এলাকার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বলেন, আইপিএস বসিয়েও লাভ হচ্ছে না। বিদ্যুৎ এত ঘন ঘন যায় যে ব্যাটারিই পুরো চার্জ হতে পারে না। ছোট শিশুকে নিয়ে এই পরিস্থিতি সত্যিই কষ্টকর। বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও।
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্রিজে সংরক্ষিত খাদ্যপণ্য নষ্ট হচ্ছে। আইসক্রিম, ঠান্ডা পানীয়, দুগ্ধজাত পণ্য ও অন্যান্য সংরক্ষণনির্ভর ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর জেনারেল ম্যানেজার বিপুল কৃষ্ণ মণ্ডল জানান, বাবুগঞ্জ, বানারীপাড়া, উজিরপুর, গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলায় পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো।
তার ভাষায়, এই এলাকাগুলোতে চাহিদা প্রায় ৫৬ মেগাওয়াট, আর সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৪৯ মেগাওয়াট। তাই অন্যান্য উপজেলার তুলনায় এখানে লোডশেডিং কিছুটা কম।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় গ্রিড থেকে বরিশালের জন্য বিদ্যুতের বরাদ্দ বৃদ্ধি না হলে এই সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা নেই।
তবে সাধারণ মানুষের দাবি, অন্তত সন্ধ্যা ও রাতের সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক। কারণ বিদ্যুতের অভাব এখন শুধু অস্বস্তির বিষয় নয়; এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
প্রতিদিনের এই দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে বরিশালবাসীর প্রশ্ন একটাই, নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করার পরও যদি রাতভর অন্ধকারে থাকতে হয়, তবে এই সংকটের শেষ কবে?


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









