সরকারি হিসাবে গুদামে সার আছে। মজুদও পর্যাপ্ত। দেশে সারের কোনো সংকট নেই; বরং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত মজুদ রয়েছে। ডিলারদের চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত বরাদ্দ দেওয়া হলেও তারা প্রয়োজনীয় সার উত্তোলন না করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। কোথাও কোথাও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারাও গুদাম দেখিয়ে বলছেন, মাসিক চাহিদার কয়েক গুণ সার মজুদ রয়েছে। কিন্তু মাঠের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমনের ভরা মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার পেতে কৃষককে দোকানে দোকানে ঘুরতে হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত দামে না পেয়ে অনেককে বাড়তি টাকায় কিনতে হচ্ছে। কোথাও সার মিলছে না, কোথাও মিললেও নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে।
দেশজুড়ে তীব্র সার সংকটের পেছনে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী আওয়ামীপন্থী সার ডিলারদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর পলাতক থাকা এসব ডিলাররা বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় বহাল তবিয়তে থেকে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের কাছ থেকে চড়া দাম আদায় করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা অবশ্য আওয়ামী লীগ আমলের ডিলারদের একটি অংশের বিরুদ্ধে বর্তমান পরিস্থিতিকে অস্থির করার অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি, একটি ডিলার সিন্ডিকেট ও কিছু সরকারি কর্মকর্তা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সারা দেশে অস্থিরতা উসকে দিচ্ছে।
দেশে সারের কোনো সংকট নেই দাবি করে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদও বলেছেন, চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সার মজুদ রয়েছে। তার দাবি, একটি সিন্ডিকেট সারা দেশে অরাজকতা তৈরি করছে এবং পরিকল্পিতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, কৃষকদের কাছে সঠিক সময়ে, সঠিক পরিমাণে ও নির্ধারিত মূল্যে সার পৌঁছে দিতে নীতিমালা অনুযায়ী সরবরাহ ব্যবস্থা পরিচালনা করা হচ্ছে। কোনো এলাকায় চাহিদার তুলনায় মজুদ কম থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য গুদাম বা অঞ্চল থেকে সার সরবরাহ করে ঘাটতি সমন্বয় করা হবে।
দেশে বর্তমানে সারের কোনো ঘাটতি নেই, বরং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত মজুদ রয়েছে বলে বুধবার জাতীয় সংসদে স্পষ্ট দাবি করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি জানান, বিগত স্বৈরাচার সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া ডিলাররা, যাদের অনেকে এখন পলাতক, তারা নতুন সরকারকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করতে মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংকট কাটাতে ও বিতরণ ব্যবস্থার গতি ফেরাতে সরকার নতুন করে সারা দেশে প্রায় ৫ হাজার নতুন ডিলার এবং তাদের অধীনে আরও ১৬ হাজার খুচরা ডিলার নিয়োগের ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান তিনি। মীর শাহে আলম সংসদকে অবহিত করে বলেন, বিগত সরকারের সময়কার প্রায় ৩ হাজার ৭৫৯ জন সারের ডিলার বর্তমানে এলাকা ছেড়ে পলাতক থাকায় বিতরণ পয়েন্টগুলো সাময়িকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়েছিল। তবে সার সরবরাহ শৃঙ্খলে যাতে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, সে লক্ষ্যে সরকার জরুরি ভিত্তিতে ইউনিয়ন পর্যায়ে আরো একজন করে সর্বমোট ৪ হাজার ৯১৮ জন নতুন ডিলার নিয়োগ দিচ্ছে, যা সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করা হচ্ছে। নিয়োগপ্রাপ্ত নতুন ডিলারদের মাধ্যমে আবার এলাকাভেদে প্রয়োজনীয় সংখ্যক খুচরা ডিলার নিযুক্ত করা হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান বলেন, ‘কার্যত সারের কোনো সংকট নেই। সম্প্রতি যেসব ঘটনা ঘটেছে তার পেছনে রয়েছে সার ইস্যুতে সরকারকে বিব্রত করার গভীর ষড়যন্ত্র। যে কেউ অনুসন্ধান করলে প্রকৃত সত্য জানতে পারবেন। মূলত হীন উদ্দেশ্যে একশ্রেণির লোকজন কৃত্রিমভাবে নানা ঘটনা তৈরি করছে। কিছু অসৎ ডিলারসহ মহল বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা করছে।‘
তিনি বলেন, ‘আমরা কৃষকদের চাহিদা নিরূপণ করে দেশের প্রতিটি জেলায় সার সরবরাহ করেছি। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পর্যাপ্ত সার মজুদ আছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জেলা পর্যায় ছাড়াও মন্ত্রণালয় থেকে সারসংক্রান্ত প্রতিটি বিষয় কঠোরভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি আমন ও রবি মৌসুমে সারের তীব্র চাহিদা রয়েছে। কিন্তু ডিলাররা সরকারি মূল্যে সার সরবরাহ না করে তা কালোবাজারে বিক্রি করছেন। অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক পরিচয়ে লাইসেন্স পাওয়া ডিলাররা এখনো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গুদামজাত সার মজুদ করে রাখছেন। এতে বিপাকে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের একাধিক উপজেলায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ডিলারদের নিবন্ধিত দোকানগুলোতে তালা ঝুললেও স্থানীয় খুচরা ও কালোবাজারি চক্রের মাধ্যমে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে ইউরিয়া, টিএসপি এবং এমওপি সার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জানান, তদারকি জোরদার করা হলেও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের কারসাজির কারণে মাঠপর্যায়ে সার ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সার সংকটের এই সুযোগে মুনাফালোভী চক্রটি কৃষকদের পকেট কাটছে, যা সরাসরি দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে।
কৃষকদের দাবি, অবিলম্বে এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে আওয়ামী আমলের বিতর্কিত ডিলারদের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে এবং মনিটরিং আরও কঠোর করে প্রকৃত কৃষকদের মাঝে ন্যায্যমূল্যে সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি বিভাগের দাবি- অবৈধ মজুদদার ও অতিরিক্ত মূল্য আদায়কারী ডিলারদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হচ্ছে। তবে সাধারণ কৃষকদের প্রশ্ন— লোক দেখানো অভিযানের বাইরে এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটকে স্থায়ীভাবে প্রতিহত করা না গেলে আগামী মৌসুমে খাদ্য উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ ও কথিত সার সিন্ডিকেট ভাঙার দাবিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটছে। সার পেতে দেরি হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে এক পরিবেশকের গুদামে ভাঙচুর করেছেন ক্ষুব্ধ কৃষকরা। জেলার ভূরঙ্গামারীতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ হয়েছে। নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা বাজারে সারের গুদামে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। তবে বাধার মুখে গুদাম থেকে কেউ সার নিয়ে যেতে পারেনি। লালমনিরহাটেও মহাসড়ক অবরোধ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারের হাতে চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত সার মজুদ আছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক হিসাবে দেখা যায়, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইউরিয়া সারের চাহিদা ১৪ লাখ ২৯ হাজার টন। এছাড়া টিএসপি ৪ লাখ ৬৭ হাজার টন, ডিএপি ১০ লাখ ২৩ লাখ টন এবং এমওপি সারের চাহিদা ৬ লাখ টন। সারের মোট চাহিদার পরিমাণ ৩৫ লাখ ২০ হাজার টন। এই চাহিদার বিপরীতে মজুদ রয়েছে– ইউরিয়া সার ১৭ লাখ ৪৬ হাজার টন, টিএসপি ৯ লাখ ৪৫ হাজার টন, ডিএপি ১৩ লাখ ৮৪ হাজার টন এবং এমওপি ১১ লাখ টন। মোট মজুদের পরিমাণ প্রায় ৫১ লাখ ৮৩ হাজার টন। অর্থাৎ আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারের সংগ্রহে উদ্বৃত্ত রয়েছে প্রায় ১৬ লাখ ৬৩ হাজার টন।
সারের মজুদ পর্যাপ্ত, তার পরও কেন সারের এত সংকট? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, সার নিয়ে সরকারের নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে সাড়ে ১৫ বছরের অবৈধ সুবিধাভোগী আওয়ামী দোসররা। পরিকল্পিতভাবে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত তারা। ডিলারশিপ বাতিল হওয়ার ভয় আওয়ামী লীগের দোসরদের। এ ছাড়া কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে সার পাচারের চেষ্টাও করছে। এছাড়া নতুন নীতিমালার আলোকে বিসিআইসি ডিলারদের একচেটিয়া ব্যবসা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা ও কৃষকদের কাছ থেকে কিছু খুচরা বিক্রেতার সারের অতিরিক্ত মূল্য নেওয়া।
মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানান, দেশের উত্তরাঞ্চলে সারের কৃত্রিম সংকটের নেপথ্যে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ইন্ধন জোগাতে পারে। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিসিআইসি এবং বিএডিসির ডিলাররা নতুন সমন্বিত নীতিমালায় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার ফলে সরকারের সার নীতিমালা কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, দেশের উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলায় ২০২৫-২৬ সালে ইউরিয়া সার বরাদ্দ ছিল ৭ লাখ ২৭ হাজার ৪০০ টন, টিএসপি ২ লাখ ৫২ হাজার ৭০৯ টন, ডিএপি ৫ লাখ ৮২ হাজার ৩৬৫ টন, এমওপি ছিল ৪ লাখ ৭ হাজার ২৬২ টন সার।
অপরদিকে, চলতি অর্থবছরে ওই ১৬ জেলায় ইউরিয়া সারের বরাদ্দ ৭ লাখ ৪১ হাজার ৪০০ টন, টিএসপি ২ লাখ ৫৪ হাজার ৭০৯ টন, ডিএপি ৬ লাখ ৫ হাজার ৩৭১ টন এবং এমওপি সার ৪ লাখ ১১ হাজার ২৬২ টন। প্রাপ্ত হিসাবে দেখা যায়, গত অর্থ বছরের তুলনায় চলতি অর্থ বছরের ২ হাজার টন টিএসপি সারের বরাদ্দ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ডিএপির বাড়ানো হয় ২৩ হাজার ৬ টন, এমওপি সারের বরাদ্দ বাড়ানো হয় ৪ হাজার টন।
সার নিয়ে বেশি হট্টগোল হয়েছে উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামে। জেলার চর যাত্রাপুরের কৃষক আজগার আলী বলেন, দ্বিতীয় দফায় ধানক্ষেতে সার দিতে হবে। কিন্তু সরকারি দামে সার পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে খোলাবাজার থেকে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। এতে বেড়ে যাচ্ছে উৎপাদন খরচ। আবার ডিলারের কাছ থেকেও প্রয়োজনের সময় সার পাওয়া যায় না। ভূরুঙ্গামারীর পাটেশ্বরী ব্রিজ পাড় এলাকার কৃষক তোফাজ্জল হক বলেন, সারের জন্য দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এর পরও অনেক সময় সার পাওয়া যায় না। সার নিতে গেলে এক দিন চলে যায়। এ সময় একজন শ্রমিকের পারিশ্রমিক ৭০০ টাকা। ফলে সার কিনতে গিয়ে একদিকে সময়, অন্যদিকে শ্রমের মজুরি দুদিক থেকেই ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।
লালমনিরহাটের দুর্গাপুর ইউনিয়নের কৃষক মামুন বাদশা বলেন, ‘আমি পাঁচ দোন জমিতে ধান চাষ করেছি। স্বাভাবিকভাবেই পাঁচ দোন জমির জন্য আমার বেশি পরিমাণে সার প্রয়োজন। কিন্তু দোকানে সার কিনতে গেলে চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছি না। দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর যখন আমার সিরিয়াল আসে, তখন অনেক সময় দোকানে আর সার মজুদ থাকে না।’ কৃষকরা যেন চাহিদামতো এবং প্রয়োজনের সময় সার কিনতে পারেন, সরকারের কাছে তিনি সে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান।
মেহেরপুরের কৃষক ফিরোজ আলী এ বছর সাত বিঘা জমিতে পেঁয়াজ ও পাঁচ বিঘা জমিতে কপি চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জমি প্রস্তুতের সময় প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি সমস্যায় পড়েছেন বলে জানান। তার অভিযোগ, ডিলারদের কাছে গেলে চাহিদামতো সার পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে খোলাবাজার থেকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সার কিনতে হচ্ছে। এতে ফসল উৎপাদনের আগেই বেড়ে যাচ্ছে খরচ। একই জেলার কৃষক মেগা খান বলেন, ডিলারের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সার না পাওয়ায় খোলাবাজার থেকে সার কিনতে হয়েছে। সেখানে প্রতি বস্তা সারের জন্য অতিরিক্ত তিন থেকে চার শ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হয়েছে।
তবে ডিলারদের দাবি, নীতিমালার পরে কিছু সমস্যা থাকলেও বাস্তবে সারের সরবরাহ ও বরাদ্দ কম। কুড়িগ্রাম ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও সার ডিলার শামসুল ইসলাম মন্ডল সম্প্রতি বলেন, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া ময়মনসিংহ জেলা ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এম এম বাবুল বলেন, সারের সরবরাহ ও বরাদ্দ কম। সবমিলে উৎপাদন মৌসুমে এ নীতিমালা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত ও অপ্রতুল বরাদ্দ সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কৃষি বিভাগ বলছে, বরাদ্দ বাড়লেও সার নিয়ে গুজবে বিভ্রান্ত হচ্ছেন কৃষকরা। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী অঞ্চলের কৃষকরা আসন্ন রবি মৌসুম সামনে রেখে আগাম সার সংগ্রহে ঝুঁকছেন। এতে অতিরিক্ত চাহিদায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, সার নিয়ে জেলা পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নানা অপ্রচারও রয়েছে। ‘সার নেই’এমনটি প্রচার করে তারা কৃষকদের উত্তেজিত করে তুলেছে। এছাড়া আসন্ন রবি মৌসুমকে কেন্দ্র করে কৃষকরা অধিক পরিমাণ সার মজুদ করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে।
কৃষি বিভাগ আরো বলছে, সারের সংকট নেই। চলতি আমন মৌসুমে সারের প্রয়োজনীয়তা শেষ পর্যায়ে। মাসভিত্তিক বরাদ্দ ও সরবরাহ স্বাভাবিক। কিন্তু সামনে সারের সংকট দেখা দিতে পারে– এমন একটি গুজব থেকে কৃষকদের মধ্যে এক ধরনের আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলবেষ্টিত এলাকার কৃষকদের মধ্যে এ আস্থার সংকট প্রবল। তারা ভাবছেন, সামনে ভুট্টা ও আলু চাষের সময় সারের সংকট দেখা দিতে পারে। ফলে এখন থেকে সার সংগ্রহ করে মজুদের চেষ্টা করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির পেছনে এক শ্রেণির ডিলার, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীও জড়িত। সার নিয়ে সরকারের নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের সুবিধাভোগীরা। পরিকল্পিতভাবে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত তারা। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে সার পাচারের চেষ্টাও করছে। এছাড়া নতুন নীতিমালার আলোকে বিসিআইসি ডিলারদের একচেটিয়া ব্যবসা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা ও কৃষকদের কাছ থেকে কিছু খুচরা বিক্রেতারা সারের অতিরিক্ত মূল্য নিচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জুলাই এবং আগস্টে ডিলাররা ইচ্ছা করে সরকারি গুদাম থেকে বরাদ্দের অর্ধেক সার উত্তোলন করেন। ১৫ জেলার কৃষি কর্মকর্তারা এ ঘটনাটি কৃষি মন্ত্রণালয়কে অবহিত না করে গোপন রাখেন। পরপর দুই মাস সার অর্ধেক উত্তোলন করায় বাজারে সারের সংকট সৃষ্টি হয়। পরে কৃষি মন্ত্রণালয় অনুসন্ধান করে দেখেছে, পরিকল্পিতভাবে সরকারি গুদাম থেকে বরাদ্দকৃত সার উত্তোলন না করে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা চালানো হয়েছে। এ কারণে এরই মধ্যে ১৫ জেলার কৃষি কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে। এছাড়া চারজন জেলা কৃষি কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার এবং আরো চারজনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সল ইমাম এবং যুগ্ম সচিব ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিলাররা আগে থেকে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বেশি দামে সার বিক্রি করতেন। বর্তমানে খুচরা বিক্রি বন্ধ। ফলে খুচরা বিক্রেতারা ভাড়াটে শ্রমিক সাধারণ কৃষকদের সঙ্গে লাইনে দাঁড় করিয়ে সার সংগ্রহ করছেন। তারা একবার সার নিয়ে ফের লাইনে দাঁড়ান। সার সংগ্রহ করে অবৈধ মজুদ করছেন। তাদের কারণে অনেক সময় কৃষকরা সার থেকে বঞ্চিত হন। এই অনুপ্রবেশকারীরা ভিড়ে প্রবেশ করে হঠাৎ উসকে দিয়ে বিক্ষোভ সৃষ্টি করে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের আমলে প্রতি ইউনিয়নে একজন করে ডিলার ছিলেন। ডিলারের কাছ থেকে নিয়ে খুচরা বিক্রেতারা সার বিক্রি করতেন। এ প্রক্রিয়ায় একই ডিলার একাধিক ইউনিয়নে নিজের মা, বাবা, ছেলে, মেয়ে, শ্যালক-শ্যালিকা কিংবা অন্য কোনো আত্মীয়র নামে ডিলারপিশ নিয়ে একচেটিয়া ব্যবসা করেছেন। বর্তমান সরকার নতুন করে ডিলার নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন করে এবং সার বরাদ্দের এখতিয়ার কৃষি মন্ত্রণালয়ের হাতে নিয়ে আসে। এতে ডিলারদের একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয় এবং সার সংকট সৃষ্টিতে তৎপর হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নতুন নীতিমালায় একটি ইউনিয়নে ৩ জন ডিলার নিয়োগের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এ ছাড়া রাষ্ট্রের জরুরি প্রয়োজনে বিদ্যমান ব্যবস্থার বাইরে আরো একজন করে ডিলার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। গতকাল ১০ সেপ্টেম্বর ছিল সেই আবেদনের শেষ দিন। এর বাইরেও প্রত্যেক ডিলারের অধীনে দুজন করে সাব-ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা নিয়োগ হবে।
আগে থেকে যারা খুচরা বিক্রেতা ছিলেন, তাদের মধ্যে থেকে দুজন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর ৬ জন খুচরা বিক্রেতা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে একজনের স্থলে তিনজন ডিলার ব্যবসায় বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছে। এ কারণে আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া ঠিকাদাররা ক্ষুব্ধ হয়েছে। এ ছাড়া ৬ জন খুচরা বিক্রেতা ব্যবসার সুযোগ পাওয়ায় অনেকের লাভে ভাগ বসেছে। ফলে তারাও ক্ষুব্ধ হয়ে সার সংকট তৈরির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে কৃষকদের কাছে সময়মতো ও নিরবচ্ছিন্নভাবে সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার পৌঁছে দিতে নন-ইউরিয়া সারের সরবরাহ ও নিরাপদ মজুদ নিশ্চিত করছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই ডিএপি ও টিএসপি সারবাহী বিএডিসির ৭টি জাহাজ দেশের বন্দরে ভিড়বে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় চুক্তির আওতায় বিভিন্ন দেশ থেকে নন-ইউরিয়া সার আমদানি, সংরক্ষণ ও সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করছে বিএডিসি। রাষ্ট্রীয় চুক্তির আওতায় মানসম্মত ডিএপি, টিএসপিসহ বিভিন্ন ধরনের নন-ইউরিয়া সার আমদানি করে পর্যাপ্ত মজুদ গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে বৈশ্বিক বাজারে সম্ভাব্য সংকট বা সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা দেখা দিলেও দেশের কৃষকদের প্রয়োজনীয় সার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে সার পরিস্থিতি তদারকিতে কৃষি মন্ত্রণালয় ও প্রাধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আলাদা দুটি কমিটি করা হয়েছিল গত মাসে। ওইসব কমিটি সারাদেশের সার পরিস্থিতি তদারকি করছে। এ কমিটির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক এদিনকে বলেন, সার নিয়ে আওয়ামী লীগ আমলের ডিলারদের একটি সিন্ডিকেট সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সারাদেশে আরো বেশি অস্থিরতা উসকে দিচ্ছে। এছাড়া কোনো সমস্যা নেই। কৃষি মন্ত্রণালয়েরও একটি পক্ষ বিগত সময় সার আমদানির সিদ্ধান্ত নানাভাবে প্রভাবিত করে কালক্ষেপণ করিয়েছে, যারা ছিল পতিত সরকারের আমলা-কর্মকর্তা। যে কারণে সারের সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, গত আগস্টে দেওয়া দরপত্রে চূড়ান্ত অনুমোদন না পাওয়া বেসরকারি খাতের আমদানিকারকরা ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি আমদানির এলসি খোলা শুরু করতে পারেনি। বেসরকারি আমদানি প্রক্রিয়া শুরু করতে অনেক দেরি হয়েছে। এর আগে প্রতি বছর এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে এই আমদানির দরপত্র আহ্বান এবং জুনের মধ্যে কার্যাদেশ দেওয়ার রীতি ছিল। এবার ইচ্ছা করে সেটা দেরি করানো হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









