'নেই কাজ তো খই ভাজ' এই প্রবাদের মতোই প্রশাসনের শীর্ষ পদের ১১ কর্মকর্তার অবস্থা। কর্মজীবনে সর্বোচ্চ গ্রেডে উন্নীত হয়ে শুধু ‘অলংকৃত’ পদ হিসেবে সচিব পদে আসীন তাঁরা। কিন্তু বাস্তবে সরকার ও জনগণের কোনো সেবা দেওয়া কিংবা দায়িত্ব পালন করতে হয় না তাঁদের। ঘুরেফিরে, বসে বসে মাসের পর মাস পাচ্ছেন বেতন-ভাতা। কৃচ্ছ্রসাধন নীতিতে চলা সরকারের কোটি কোটি টাকা গচ্ছা গেলেও নেই কোনো হুঁশ। দেশের ৫৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রশাসনিক কাঠামোয় সচিব ও সমমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন ৯৪ জন। এর মধ্যে ১১ জন সচিবের বর্তমানে কোনো দাপ্তরিক দায়িত্ব নেই। তাঁদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত রাখা হয়েছে। একই সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং অভ্যন্তরীণ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ পূর্ণকালীন সচিব ছাড়াই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
এ ছাড়া পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগে সচিবের পদটি খালি রয়েছে। অথচ সচিব একটি মন্ত্রণালয় বা বিভাগের প্রশাসনিক প্রধান। নীতি বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক সমন্বয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও অধীন দপ্তর-সংস্থার কার্যক্রম তদারকিতে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ফলে সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের দীর্ঘসময় কোনো দাপ্তরিক দায়িত্ব ছাড়া রাখা প্রশাসনে দক্ষ জনবল ব্যবহারের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী দৈনিক এদিনকে বলেন, মূলত কর্মকর্তাদের পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। অনেক সময় চাকরির মেয়াদ শেষ পর্যায়ে গেলে কারো অনুরোধ বিবেচনায় জনপ্রশাসনে সংযুক্ত করা হয়। সংযুক্তি নানা কারণেই হতে পারে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দক্ষতা, যোগ্যতা, মেধাকে গুরুত্ব দিয়ে জনপ্রশাসন সাজাচ্ছে। অতীতের স্থবিরতা কাটিয়ে জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এজন্য কাউকে বসিয়ে রেখে বেতন দিতে চায় না সরকার।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া এদিনকে বলেন, ‘সরকার কেন ওই কর্মকর্তাদের কাজে লাগাচ্ছে না, তা জানি না। তবে গত ১৫-২০ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, সরকার হয়তো তাদের আর বিশ্বাসযোগ্য মনে করছে না। শুধু সরকারের দোষ দিলেও বিষয়টি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাবে না। আমরা সিভিল সার্ভিসকে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়েছি, যেখানে সরকার কর্মকর্তাদের অবিশ্বাস করার হাজারটা কারণ খুঁজে পেতে পারে। সরকার যদি কোনো কর্মকর্তাকে অবিশ্বাস করে এবং ওই কর্মকর্তারও সরকারের ওপর আস্থা না থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তাকে গুরুত্বপূর্ণ কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়ে।’
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত থাকা ১১ সচিব হলেন- মো. সাইফুল্লাহ পান্না, মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদী, ফারজানা মমতাজ, খান মো. নূরুল আমীন এনডিসি, জাহেদা পারভীন, মো. মফিদুর রহমান, কানিজ মওলা, মোহাম্মদ খালেদ রহীম, কাজী আনোয়ার হোসেন, মো. রায়হান কাওছার ও মো. সাখাওয়াত হোসেন।
তবে এই ১১ জনের বাইরেও ইয়াসমীন পারভীন নামের একজন কর্মকর্তাকে সচিব হিসেবে পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। বর্তমানে তিনি কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন না; পরবর্তী পদায়ন না হওয়া পর্যন্ত তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ন্যস্ত থাকবেন।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের মতে, জনপ্রশাসনে কর্মকর্তাদের পদায়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। ফলে দায়িত্বহীন থাকা ১১ সচিবের ক্ষেত্রেও পরবর্তী সময়ে পদায়ন হতে পারে। তবে দীর্ঘসময় ধরে দাপ্তরিক দায়িত্ব না থাকলে প্রশাসনের জন্য তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অব্যবহৃত থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত সচিবের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর পরিচালনার প্রয়োজনীয়তাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই প্রশাসনে দক্ষ জনবল ব্যবহারের স্বার্থে দ্রুত উপযুক্ত পদায়ন এবং দায়িত্ব বণ্টনের মাধ্যমে এ পরিস্থিতির সমাধান করা প্রয়োজন।
প্রশাসন-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরো বলছে, কোনো কর্মকর্তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার পেছনে বিভিন্ন প্রশাসনিক কারণ থাকতে পারে। পরবর্তী পদায়নের প্রস্তুতি, সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস কিংবা চাকরির মেয়াদ শেষ পর্যায়ে থাকার মতো বিষয়ও এর কারণ হতে পারে। তবে সংযুক্তির পর দীর্ঘসময় কোনো দাপ্তরিক দায়িত্ব না থাকলে ওই কর্মকর্তার অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ থাকে না। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে থাকা একজন কর্মকর্তার বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বহাল থাকে।
জানা গেছে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত ১১ সচিবের সবাই প্রশাসনের মাঠপর্যায় ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে কাজের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। মো. সাইফুল্লাহ পান্না ভূমি আপিল বোর্ড ও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে; মো. রেজাউল মাকছুদ জাহেদী মাঠ প্রশাসন, জনপ্রশাসন, পানিসম্পদ ও সরকারি কর্মকমিশনে; ফারজানা মমতাজ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে; খান মো. নূরুল আমীন স্বাস্থ্যসেবা ও রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে; জাহেদা পারভীন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সমন্বয় ও সংস্কার অনুবিভাগে; মো. মফিদুর রহমান জনপ্রশাসন, অর্থ ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে; কানিজ মওলা আইএমইডি, জাতীয় সংসদ সচিবালয় ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে; মোহাম্মদ খালেদ রহীম মাঠ প্রশাসন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও দুদকে; কাজী আনোয়ার হোসেন স্থানীয় সরকার ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে; মো. রায়হান কাওছার ভূমি এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন খাতে এবং মো. সাখাওয়াত হোসেন মাঠ প্রশাসন এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
এদিকে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ড. ফাহমিদা খানম। আর অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন আহসান হাবীব।
উল্লেখ্য, ৯ম বেতন স্কেলে সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তার মূল বেতন (নির্ধারিত) ৭৮ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। এর সাথে ৬০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাড়া, ১৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা এবং সন্তানদের পড়াশোনার জন্য শিক্ষাসহায়তা পান। এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে দায়িত্বে থাকা সচিবদের গাড়ির জ্বালানিসহ নানা সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। ফলে আলোচিত ১১ জন সচিবকে বসিয়ে বসিয়ে মাসের পর মাস বেতন-ভাতা দিয়ে সরকারের গচ্চা যাচ্ছে কোটি কোটি টাকা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









