ঢাকার ইসিবি চত্বর এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ‘ব্রাউনফিশ’ ও আশপাশে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদিকে এ বিষয়ে মামলা কেন নেওয়া হয়নি, সেই প্রশ্ন তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সালমান মুক্তাদির। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘মামলা না করা’ ও ‘টুকটাক ভাঙচুর’ মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন। জবাবে সালমান মুক্তাদিরের ব্যবহৃত টিনশেড স্থাপনায় ভাঙচুরের ঘটনা ৩৫ কাঠা জমির বিরোধকে কেন্দ্র করে ঘটেছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তবে হামলার সুস্পষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি বলে ভাষ্য ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি)। গত শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে নিউ গিনি প্রপার্টিজের আবাসন প্রকল্পে ওই হামলার ঘটনা ঘটে। সালমানের স্টুডিওর পাশাপাশি নিউ গিনির অফিসসহ আশপাশের স্থাপনা হামলাকারীদের নিশানায় ছিল।
সালমান বলেন, ‘গত রাতে একদল লোক দলবদ্ধভাবে এসে সেখানে ভাঙচুর চালায়। খবর পেয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি, পরিদর্শক তদন্ত, পরিদর্শক অপারেশনসহ পুলিশ সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে রাতেই অভিযান চালিয়ে আরো একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার তিনজন হলেন—মামুন, আসলাম ও মুন্না। মামুনের বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁও, তিনি ভাষানটেক বস্তিতে থাকেন। আসলামের বাড়ি টাঙ্গাইলে, তিনি অটোরিকশা চালান। আর মুন্নাও ভাষানটেক বস্তিতে থাকেন। গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদ করে আরো তথ্য পাওয়ার পর বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে বলা সম্ভব হবে।‘
নিউ গিটি প্রোপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া ঘটনার পর বলেছিলেন, ‘তারা (হামলাকারীরা) দীর্ঘদিন যাবৎ বিভিন্ন রকম চাঁদাবাজি, হুমকি-ধমকি, জমি দখলসহ নানা ধরনের কর্মকাণ্ড আমাদের সাথে করে আসতেছে। আজকে সাড়ে ১০টা নাগাদ প্রায় ২৫০-৩০০ সবাই অস্ত্র নিয়ে ৪০ থেকে ৫০টা ফায়ার করছে। ফায়ার করে গেট ভেঙে ফেলছে। হার্ডডিস্কসহ সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে গেছে। টাকা ছিল, ফোন ছিল।’
সালমান মুক্তাদির বলেছিলেন, ‘একটা শুটে কত খরচ হয় আপনারা জানেন। সেখানে ৩০-৪০টা ক্লায়েন্টের যখন সবকিছু নিয়ে যায়, কত ক্ষতি হতে পারে—এটা যদি চোখ বন্ধ করেও কিছু একটা ধারণা করা হয়...‘আমি ভাবছিলাম আমার প্রতি শত্রুতা, বাট দেখলাম যে পুরা প্রজেক্টেই ওরা হামলা করছে। সো প্রজেক্ট রিলেটেড কিছুই হইছে—এতটুক আমি শিওর।’
‘আপনার মধ্যে কি একটু লজ্জা কাজ করে না? ’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সংবাদ সম্মেলনের পর একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদির, সেখানে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘মামলা না করা’ ও ‘টুকটাক ভাঙচুর’ মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আপনার মধ্যে কি একটু লজ্জা কাজ করে না? আপনার প্রধানমন্ত্রীর আসন থেকে এরকম একটা কিছু হইল, আপনি কি বুঝতেসেন যে কতটুকু ডাউন হয়ে গেল যে বিএনপি সরকারের চোখের সামনে তার আসনে এ ঘটনা ঘটছে… বুঝতেছেন জিনিসটা কত ইয়ে? পাঁচ মিনিট হাঁটার পর সামনে ক্যান্টনমেন্ট। আপনি কি বুঝতে পারতেছেন যে আপনাকে কেন আঙুল তোলা হইছে? বুঝেন নাই মনে হয়।’ ইসিবি চত্বরের দক্ষিণ মানিকদীর নিউ গিনি প্রপার্টিজে শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সালমানের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিও ছাড়াও ওই আবাসন প্রকল্পের অফিস ও আশপাশের স্থাপনায় হামলা হয়।‘
এদিকে সালমান মুক্তাদির বলেন, ‘এটা ভাঙচুর না, এটা হচ্ছে পুরোপুরি রবারি, চাঁদাবাজি, ডেস্ট্রাকশন, বাংলাদেশের কমন… তো বেকারত্ব যখন আপনি দূর করতে পারবেন না, যখন আপনার ল অ্যান্ড অর্ডারস থাকবে না, এটাই এন্ড রেজাল্ট। লাকিলি আমার পক্ষে এটা কোপ-আপ করা সম্ভব।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘যে ভদ্রলোক ফেসবুকে লাইভে এসে অভিযোগটি করছেন, তিনি কি কোনো মামলা দায়ের করেছেন? করেননি। এই লাইভ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।’ সালমান ঢালাওভাবে বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনেছেন বলেও মন্ত্রী মন্তব্য করেন।
পরে ভিডিও বার্তায় সালমান মুক্তাদির বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায় তিনি বিস্মিত হয়েছেন। তার ভাষায়, একজন নাগরিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের; তাই ঘটনার কারণ বা জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে আলোচনা না করে আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করাই সরকারের দায়িত্ব। আমরা এখানে ইনভেস্টিগেশনের জন্য আপনার কাছে আসিনি, আমরা আসছি অ্যাকশনের জন্য।’
সালমান বলেন, হামলার পর রাতেই তিনি ক্যান্টনমেন্ট থানায় যান এবং পরদিন ভোর পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। তার দাবি, ওই সময়ও মামলা নেওয়া হয়নি। উনার আসনে বাংলাদেশের ওয়ান অফ দা মোস্ট প্রমিনেন্ট একটা কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, যার এত ফলোয়ার্স... এক রাতে এত বড় ভাবে প্রচার হইল... আপনি কি নিজে কোনোভাবে কনফিডেন্ট ফিল করেন?’
হামলার সুস্পষ্ট কারণ জানে না পুলিশ
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, নিউ গিনি প্রপার্টিজের জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব থেকে এ হামলা হয়ে থাকতে পারে। তবে কাদের মধ্যে সেই বিরোধ তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ। গতকাল রবিবার নিউ গিনি প্রপার্টিজের প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মো. মাহিদুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘গত রাতে একদল লোক দলবদ্ধভাবে এসে সেখানে ভাঙচুর চালায়। খবর পেয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি, পরিদর্শক তদন্ত, পরিদর্শক অপারেশনসহ পুলিশ সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। ‘ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে রাতেই অভিযান চালিয়ে আরো একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।’
হামলার কারণ জানতে চাইলে ডিএমপি কর্মকর্তা মাহিদুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদ করে আরও তথ্য পাওয়ার পর বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে বলা সম্ভব হবে। প্রাথমিকভাবে আমাদের কাছে মনে হয়েছে, এটা হচ্ছে একটা হাউজিং বিজনেস। এখানে এতগুলো লোক একসঙ্গে দলবদ্ধভাবে এবং রাতের বেলা এসেছে। সে কারণে হয়তো জমিকে কেন্দ্র করে, জমির দখল-বেদখলকে কেন্দ্র করে বিবাদ থাকতে পারে।‘
৩৫ কাঠা জমির বিরোধ থেকেই ভাঙচুর: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ৩৫ কাঠা জমি নিয়ে নিউ গিনি প্রোপার্টিজ লিমিটেডের সঙ্গে একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার বিরোধ রয়েছে। প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, ওই সামরিক কর্মকর্তার পক্ষের একদল লোক রাতে বিতর্কিত জমিটি দখলে নিতে যায়। এ সময় সালমান মুক্তাদিরের ব্যবহৃত স্থাপনাসহ সেখানে থাকা কয়েকটি স্থাপনায় ভাঙচুর চালানো হয়। তিনি জানান, ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং তিনজনকে আটক করে। ঘটনাস্থল থেকে গুলির খোসা ও দেশীয় অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে এই কনটেন্ট ক্রিয়েটর বলেন, ‘আমি জানি না আপনি নিজেকে কতটুকু যোগ্য মনে করেন কিংবা কতটুকু মনে করছেন যে আপনি এটাকে মানে ট্যাকেল দিতে পারবেন। আই আন্ডারস্ট্যান্ড ইনভেস্টিগেশন হবে, তদন্ত হবে, আপনারা ডেফিনিটলি দেখতেছেন, ১০০% এটাকে সিরিয়াসলি নেওয়া হবে, এগুলা আমি অনেক আগে থেকে করে আসছি।
‘আওয়ামী লীগের আমল থেকে রেপ নিয়ে কথা বলছি, মার্ডার নিয়ে কথা বলছি, চাঁদাবাজি নিয়ে কথা বলছি। ইন্টেরিম গভর্মেন্টের আন্ডারে তাদের এগেইনস্টে কথা বলছি। আপনাদের গভর্মেন্ট যখন পাওয়ারে আছে, আপনাদের এগেইনস্টেই কথা বলব, বিকজ ইউ আর ইন পাওয়ার, ইউ প্রমিসড আস দা সেইফটি। এই লজিকটা আই থিংক আপনারা বুঝতে পারতেসেন না।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









