সেই কবে জল পড়ে পাতা নড়েছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির আঙিনায়। আজও কোনো বর্ষণমুখর দিনে বা সন্ধ্যায় কারোর অলক্ষ্যে হয়তো জল পড়ে পাতাও নড়ে। হয়তোবা প্রতিটি ভ্রমণপিয়াসি মানুষের মনের মাঝে দোলা দিয়ে যায় গুরুদেবের স্মৃতিময় দিনগুলো। এই বাড়িতেই ১৮৬১ সালের ৭ মে, বাংলা ১২৬৮ সনের ২৫ বৈশাখ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম হয়েছিল। এখানে তাঁর শৈশব কেটেছে। এখানেই তিনি সংসার পেতেছিলেন। আর এখানেই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পদচিহ্ন রেখে গেছেন। বন্ধুরা এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন আমি বলছি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির কথা।
ঢাকা থেকে বন্ধুরা বলে দিয়েছিল, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি বললেই যেকোনো ট্যাক্সিওয়ালা চোখবুজে নিয়ে যাবে রবীন্দ্রনাথের বাড়ি। কলকাতায় এসে বুঝলাম এখানকার ট্যাক্সিওয়ালাদের এখন চোখ ফুটেছে। চোখবুজে ঠাকুরবাড়ি যাওয়ার দিন শেষ। প্রথম যে ট্যাক্সি ধরলাম তার চালক বলল, ‘দাদা, ঠাকুরবাড়ি তো বুঝলাম, ঠিকানাটা বলুন।’ দুই-তিনজন ক্যাবচালকের কাছে একই রকম জবাব পেয়ে শেষ পর্যন্ত উপায় না দেখে গুগলম্যাপ চালু করেই যেতে হলো ঠাকুরবাড়ি। কলকাতার ট্যাক্সিচালকরা জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি খুব একটা চিনেন না কিংবা বেশিরভাগই না চেনার ভান করেন। তবে হনুমান মন্দির বললে না চিনার ভানটাও করতে পারে না। শেষ পর্যন্ত একজনকে পেলাম যিনি আমাদের নিয়ে গেলেন গুরুদেবের বাড়ির পথে। আমার ভ্রমণসঙ্গী সব সময়ের বন্ধু আমার মা।

প্রথমবারের মতো যাচ্ছি গুরুদেবের জন্মস্থানে। তাই মনের ভেতর কে যেন তারা দিচ্ছে কতক্ষণে পৌঁছাব। জাকারিয়া স্ট্রিটের নাখুদা মসজিদ, চিতপুর রোড দিয়ে এগিয়ে চলছি শেষ পর্যন্ত দেখা মেলল বিশাল বড় পাকা তোরণে লেখা ‘জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি। এর পরই বেশখানিকটা ঘিঞ্জি গলি ভেতরে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পথ। সেখান থেকে খানিকটা ভেতরেই মিউজিয়াম। ঠাকুরবাড়িতে যাওয়ার রাস্তা যেমনই হোক, বাড়িটা দেখার মতো। অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে দ্বারকানাথ ঠাকুর বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন বড় বাজারের শেঠদের জমিতে। ধীরে ধীরে এই পাড়াটি হয়ে ওঠে বাংলা সাহিত্যের বহু বিখ্যাত ঘটনার সাক্ষী। এ পাড়াতেই থাকতেন ‘হুতোম প্যাঁচার নকশার’ কালীপ্রসন্ন সিংহ, ভারতবর্ষে জুলিয়াস সিজার নাটক প্রথম অভিনীত হয়েছিল যার বাসায় সেই পিয়ারি মোহন বোস, মাইকেল মধুসূদনের ‘কৃষ্ণকুমারী’ প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল যার উদ্যোগে সেই জ্ঞানেন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ আরও বেশ কয়েকজন বিখ্যাত মানুষ।
সবুজ ছোট-বড় বৃক্ষাদির শাখা-প্রশাখা আর পত্রপল্লবে ঘেরা চারদিক। তারই ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে লাল রঙের বিশাল আকৃতির একাধিক দালান। মাঝে বিশাল সবুজ চত্বর দেখেই মনে হয় বসে পরি ঘাসের কোমল ছোঁয়া পেতে কিন্তু মিউজিয়ামে তাড়াতাড়ি ঢোকার লোভও সমলাতে পারছি না। ২০ রুপি দিয়ে টিকিট কাটলাম খুব শখ করে ক্যামেরা বের করলাম কিন্তু ভাগ্য খারাপ ক্যামেরা নিয়ে মিউজিয়ামে ঢোকা যায় না। প্রবেশ পথে রয়েছে সর্বাধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দাদা প্রিন্স দ্বারাকানাথ ঠাকুর তার দাদা নীলমণি ঠাকুর এই বাড়িটি প্রতিষ্ঠিত করেন।
বর্তমানে পুরো এলাকাটি ‘জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি’ নামে বিখ্যাত। তবে এখন ‘জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি’ রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাপ্রাঙ্গণ। প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে ঢোকার ঠিক বাঁদিকের দালানটি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। প্রবেশপথের ডানদিকের একটু ভেতরে একচালা গ্যারেজে রাখা আছে কবির ব্যবহৃত গাড়ি। খোলার দিনে এই জায়গা প্রতিদিন অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতিতে মুখর হয় ওঠে। তার সঙ্গে এখানে আসে বহু রবীন্দ্র ভক্তের দল। সবাই শান্ত। কোনো শোরগোল নেই। এর মধ্যে কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলাম কোথায় থেকে এসেছেন। কেউ বিহার থেকে, কেউবা পাটনা, যেমন আমি গিয়েছি বাংলাদেশ থেকে। প্রতিদিনই বহু জায়গা থেকে বহু মানুষের দল এখানে আসে। এমনকি বন্ধের দিনও মানুষের উপচে পড়া ভিড় থাকে। তার সঙ্গে এই শহরের অনেকেই প্রতিদিন আসেন। রবীন্দ্র ভাবনা নিয়ে বসে থাকেন জোড়াসাঁকোর বাড়ির এদিক-সেদিক তার অবসরের সময়টুকুতে। এখানে কেউবা ব্যস্ত কী যেন লেখার মধ্যে, কেউবা অকারণে বসে আছেন সবুজ চত্বরে, কেউবা ঘুরে ঘুরে দেখছেন। আবার অনেকে একসঙ্গে গোল করে বসে আলোচনায় মশগুল। তবে সবার চোখে-মুখে কী এক অপার শান্তি। তবে মনে রাখতে হবে, ছুটির দিনে সব খোলা থাকে না। নিচতলায় টিকিট কেটে, সিঁড়ি ঘরের নিচের লকারে ক্যামেরা, মোবাইল, ব্যাগ এসব রেখে জুতো খুলে আমরা বাড়ির ওপরতলায় গেলাম।

‘আমি কান পেতে রই, ও আমার আপন হৃদয় গহন দ্বারে...।’ কোথায় যেন মৃদু শব্দে সংগীত বেজে চলেছে অসাধারণ পরিবেশ। সেই মূর্ছনায় আমি কান পেতে এগিয়ে যাই। ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকি, একসময় সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যাই, দেখতে পাই রবিঠাকুরের ব্যবহৃত জিনিসপত্রগুলো ওউপরতলায় বিভিন্ন ঘরে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। শুরুতেই কবিগুরুর খাবারঘর। এরপর শয়নকক্ষ। ভেবেছিলাম খুব একটা বড় হবে না। কিন্তু ধীরে ধীরে এই ঠাকুর কুটিরেই আবিষ্কার করা গেল বিশ্বসাহিত্যে কবিগুরুর মতোই বিশাল এই বাড়ি।
প্রতিটি ঘরেই রয়েছে রবিঠাকুরের স্মৃতিচিহ্ন। কোনো কোনো ঘরে তাঁর ব্যবহৃত পোশাক, আরাম-কেদারা, বইপত্র, বিলেত থেকে আনা নানা জিনিসপত্র। রয়েছে তাঁর পরিবারের সদস্যদের ছবি। একটি ঘরে রয়েছে রবিঠাকুরকে নিজ হাতে লেখা মৃণালিনী দেবীর চিঠি, তার ওপর মৃণালিনী দেবীর একটি বড় ছবি টানানো। এই ঘরেই মৃণালিনী দেবীর শেষশয্যা পাতা হয়েছিল। গোটা ঠাকুরবাড়িতে প্রতি মুহূর্তে বাজছে তার সংগীতের অসাধারণ সব সুর। খাবার কক্ষটিও দেখে মনে হলো কবি এখানেও খেতে খেতে গাইতেন। কারণ খাবার টেবিলের ধরনটাও সংগীত কক্ষের মতো করে সাজানো। পরের ঘরটিতে কবি শুয়ে কাটাতেন জীবনের শেষ সময়টা। সেখান থেকে বের হয়েই দেখা গেল কলকাতার বিখ্যাত বাংলা দৈনিক আনন্দবাজারে প্রকাশিত কবির জীবনের শেষ দিনটির কথা।
১৯৪১ সালের ৭ আগস্ট প্রকাশিত আনন্দবাজার দেখে একটু অবাকই হতে হলো। সেখানে লেখা আজ প্রকাশিত পত্রিকার সংখ্যা ৬৫ হাজার। পত্রিকার পাতা জুড়েই কবির শেষ যাত্রার সংবাদ আর কবিতা। তখনকার পত্রিকার প্রকাশ সংখ্যা দেখে বোঝা যায় কতটা জোরালো ছিল শিক্ষার মান। ঠিক সেখানেই একটি কক্ষে কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। কালো ফ্লোর মাঝে জল চৌকিতে জ্বলছিল তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের সময় থাকা ধূপবাটি। সেখান থেকে বের হয়ে কিছু দূর যেতেই দুই দরজার ছোট্ট একটি ঘর। সেখানে আলো খুব একটা নেই। দরজার বাইরে লেখা, ‘এখানেই জন্ম নিয়েছিল কবিঠাকুরের সব বংশধর। মানে কবিগুরু আঁতুড়ঘর। এই আলোহীন ঘর থেকেই বিশ্বকে আলোকিত করেছেন গল্প, কবিতা, উপন্যাস, সংগীতে। পাঁচটায় বন্ধ হয়ে যায় ঠাকুরবাড়ির দরজা।

রবীন্দ্রনাথের বাড়ির সবকিছুই মনে হয় কোনো না কোনোভাবে আমাদের চেনাজানা। এর কারণ খুঁজে পেলাম বেরিয়ে আসার সময় মূল প্রবেশদ্বারের পাশে লেখা পরিচয় কবিতার শেষ কটি লাইন দেখে : সেতারেতে বাঁধিলাম তার, গাহিলাম আরবার, মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক, আর কিছু নয়, এই হোক শেষ পরিচয়।
যেভাবে জোড়াসাঁকো যাবেন
ইন্ডিয়ান হাইকমিশন ঢাকা ওয়েবসাইডে ভিসার ই-টোকেন ফরম পাওয়া যায়। যেখানে কোন পথে আপনি যাবেন তার একটি অপশন রয়েছে। জোড়াসাঁকো যেতে হলে রেলপথ উত্তম। তবে ভারতীয় ভিসায় এখন যেকোনো দুটি পথের অনুমোদন নিতে পারেন। রেলপথ সঙ্গে বাই এয়ার। নতুবা বাই রোড সঙ্গে বাই এয়ার। এখানে আপনি রেলে গেলেন বাই এয়ারে ফিরতে পারেন। অথবা বাই এয়ার গেলেন বাই রোডে ফিরতে পারেন। যারা লেখালেখি করেন তাদের জন্য বাই ট্রেন অধিক উত্তম। এসি, নন এসি কিংবা তিনজনের একটি কেবিন খুব বেশি ভাড়া নয়। ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য আপনাকে ভিসা সংযুক্ত পাসপোর্ট নিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশন যেতে হবে। সেখানে একটি আলাদা বুথ রয়েছে। নির্দিষ্ট একটি ফরম পূরণ করে পাসপোর্টসহ কাউন্টারে জমা দিতে হবে। আপনার তারিখ মোতাবেক আসন থাকলে সহজেই টিকিট পেয়ে যাবেন। অবশ্য তার জন্য অন্তত সপ্তাহখানেক আগে যাওয়া ভালো।
ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে সকাল ৮টা ১০ মিনিটে কলকাতা চিতপুর স্টেশনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু হয়। প্রায় ১২ ঘণ্টার এই যাত্রাকালে সব রকমের গরম খাবার রেল ক্যান্টিনেই পাওয়া যায়। চিতপুর স্টেশন থেকে জাকারিয়া স্ট্রিট খুব বেশি দূরে নয়। সঙ্গে তেমন কোনো ভারী মালামাল যদি না থাকে, তবে বাস কিংবা মেট্রোরেলে যাওয়া যায়। তবে কলকাতায় প্রথম ভ্রমণ হলে ট্যাক্সি নিয়ে নেওয়া ভালো। ট্যাক্সিতে মিটারে যেতে পারেন কিংবা কন্ট্রাকে যেতে পারেন। তবে ১৫০ রুপি থেকে ২০০ রুপি নিয়ে নেবে, যেভাবেই যান। যেখানে বাসে বা মেট্রোরেলে মাত্র আট-দশ রুপিতে সম্ভব। এখানে বলে রাখা ভালো বাসে বা মেট্রোরেলে গেলে বেশ কিছু পথ হেঁটে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









