দীর্ঘ প্রায় আঠারো বছর আন্দোলন-সংগ্রাম, হামলা-মামলা ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। কিন্তু সরকার গঠনের আট মাস হতে চললেও দল হিসেবে বিএনপির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক তৎপরতা কতটা দৃশ্যমান, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি, মন্ত্রী-এমপিদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের বাইরে দলীয় পরিচয়ে নিয়মিত জনসম্পৃক্ত রাজনৈতিক কর্মসূচি খুব একটা চোখে পড়ছে না। ফলে ক্ষমতায় থেকেও সাংগঠনিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে দলটির ভেতরে। সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন বিরোধী দল হিসেবে রাজপথে থাকা দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপি এখন অনেকটা একাকার হয়ে গেছে সরকারের মধ্যে।
সূত্র জানায়, মূলত দল ও সরকার আলাদা রাখার নীতিগত ঘোষণা থাকলেও দীর্ঘদিনেও বিষয়টির বাস্তবায়ন না হওয়ায় পুরনো হলেও আট মাসের কাছাকাছি সময়ে এসে সেই ইস্যুটি আবারো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৯ মে দলের এক বিশেষ বৈঠকে দল ও সরকারকে পৃথক সত্তা হিসেবে রাখার বার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু ওই সময় পর্যন্ত দল হিসেবে বিএনপির কর্মসূচিতে তার প্রতিফলন যথেষ্ট দৃশ্যমান হয়নি। তখন জ্বালানি, হাম ও শিশু নির্যাতনের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়েও অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। কিন্তু গত ছয় মাসেও বিষয়টির ন্যূনতম কোনো বাস্তবায়ন হয়নি বলে জানা গেছে। তাই আসন্ন স্থানীয় সরকার নিবাচনে এর আরো বেশি প্রভাব পড়বে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একটি বড় অংশ মন্ত্রিসভা, সংসদ ও সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যুক্ত। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও অনেক নেতা সংসদ সদস্য, জনপ্রতিনিধি কিংবা সরকারি দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত। এতে রাষ্ট্র পরিচালনার কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান হলেও দলীয় সংগঠনকে আলাদা পরিচয়ে সক্রিয় রাখার ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টদের অনেকে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সরকারের কর্মসূচিতে বিএনপির নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি দেখা গেলেও সরকারের বাইরে দলীয় উদ্যোগে জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি, সাংগঠনিক সমাবেশ, নিয়মিত কর্মিসভা কিংবা রাজনৈতিক ইস্যুভিত্তিক প্রচার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দল যেন সরকারের কর্মসূচির মধ্যেই নিজের রাজনৈতিক তৎপরতা সীমাবদ্ধ করে ফেলছে-এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে তৃণমূলের একাংশের মধ্যে।
দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত সাংগঠনিক কর্মসূচি-যেমন সভা, বৈঠক, কর্মী সমাবেশ ও জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম-আগের তুলনায় কমে গেছে।
দলের নেতাকর্মীদের মতে, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের পর হঠাৎই সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ায় দলের অনেক নেতা-কর্মীর কর্মক্ষেত্রও বদলে গেছে। ফলে দলীয় কার্যালয়ের পরিবর্তে এখন সচিবালয় ও নির্বাচনি এলাকাকেন্দ্রিক কার্যক্রমই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
জানা গেছে, বিএনপি দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকার সময় দলীয় কার্যালয়, সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলন, মিছিল ও বিভিন্ন ইস্যুতে রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিত। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর স্বাভাবিকভাবেই কর্মসূচির ধরন বদলেছে। এখন সরকার পরিচালনা, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা নেতৃত্বের প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু এর পাশাপাশি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও নিয়মিত থাকার কথা। তাই বাস্তবে সেই ধারাবাহিকতা কতটা বজায় আছে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সরকারের উন্নয়নমূলক উদ্যোগ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কিংবা প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের বিভিন্ন কর্মসূচিতে দলীয় নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি দেখা গেলেও দলীয় ব্যানারে নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচির দৃশ্যমানতা তুলনামূলক কম। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের অবস্থান জনগণের কাছে তুলে ধরা, স্থানীয় পর্যায়ে মতবিনিময়, কর্মী সমাবেশ ও সাংগঠনিক সভার মতো কার্যক্রমও আরো জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন দলটির সিনিয়র নেতারা।
জানা গেছে, সারা দেশে কমিটি পুনর্গঠন থেকে শুরু করে সাংগঠনিক নানা কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ছে বিএনপির। বেশির ভাগ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। ৮২টি সাংগঠনিক জেলা কমিটির মধ্যে ৭৪টিই মেয়াদোত্তীর্ণ। বেশির ভাগ উপজেলা ও থানায় কমিটি নেই। দু-একটায় থাকলেও সেগুলো প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপিদের কবজায়। তৃণমূলে কমিটি ঢেলে সাজানোর সিদ্ধান্ত নিলেও বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ নেই। নেতাদের এহেন ভূমিকায় লঙ্ঘিত হচ্ছে দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশনাও।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর বিএনপির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা ও স্থানীয় পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে দলটির কার্যক্রমে কিছুটা জটিলতা ও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। দলের ভিতর শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে কিছু নেতার বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ নিয়েছেন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। যার ফলে দলের ওইসব স্থানে তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা অস্বস্তি ও সতর্কতা দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ এবং বিরোধী বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের তৎপরতার মুখে মাঠের রাজনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখা দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কোথাও কোথাও দূরত্ব বা উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বিএনপির অভ্যন্তরীণ ঐক্যে কিছুটা শৈথিল্যভাব এবং দুর্বল সাংগঠনিক কার্যক্রমের কারণে বেশিরভাগ স্থানেই বিরোধী দলের সেসব উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মসূচি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা যথাযথ হচ্ছে না।
জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। জনগণের এই সংগঠনকে আরও শক্তিশালী ও সুসংহত করার কাজ চলছে। আর রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রে কমিটি গঠন/পুনর্গঠন হচ্ছে-একটি চলমান প্রক্রিয়া। সম্প্রতি দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও সর্বস্তরের কমিটি পুনর্গঠনের ব্যাপারে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, দলটির সাংগঠনিক তৎপরতা কমে যাওয়া, ত্যাগী নেতা-কর্মীদের অবমূল্যায়নের অভিযোগ এবং মন্ত্রী-এমপিদের ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাববলয় তৈরির ফলে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা একদিকে যেমন ঝিমুনিতে পড়েছে অন্যদিকে বাড়ছে তাদের হতাশার সূরও।
দলটির জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী, এমপি ও প্রভাবশালী নেতারা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকায় সাংগঠনিক বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্ব হারাচ্ছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা নেতাদের ব্যস্ততায় সাংগঠনিক বিষয় অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্ব হারাচ্ছে। এতে তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্র ও স্থানীয় নেতৃত্বের দূরত্ব বাড়ছে।
দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা নেতা-কর্মীদের একটি অংশের অভিযোগ, তাদের প্রত্যাশা ছিল ক্ষমতায় ফেরার পর দলীয় পুনর্গঠন, ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন এবং সাংগঠনিক পদে যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ জোরদার হবে। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও স্থানীয় প্রভাব দলীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে বলে তাদের অভিযোগ। এতে পুরনো ও নতুন নেতৃত্বের মধ্যে বিরোধ এবং কর্মীদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, ক্ষমতায় আসার পর তাদের মূল্যায়নের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত নতুন ও প্রভাবশালী একটি অংশ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে পদ-পদবি, সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও পুরনো ও নতুন নেতৃত্বের মধ্যে বিরোধ তৈরি হচ্ছে।
এদিকে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে এমপি-মন্ত্রীদের ঘিরে গড়ে ওঠা নিজস্ব বলয়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের একটি অংশের অভিযোগ-গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে দলের সাংগঠনিক কাঠামোর চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্য ও ঘনিষ্ঠতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় দলীয় নেতৃত্বের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আবার একই এলাকায় একাধিক গ্রুপ সক্রিয় থাকায় কর্মীদের মধ্যেও বিভক্তি দেখা দিয়েছে। ফলে সরকারের আট মাসের মাথায় তৃণমূলে যে সাংগঠনিক প্রাণচাঞ্চল্য থাকার কথা, তা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। ফলে বিএনপির এ সাংগঠনিক দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে বিরোধী দলগুলো। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় পর্যায়ের ব্যস্ততা ও অভ্যন্তরীণ বিরোধকে কাজে লাগিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের সাংগঠনিক কার্যক্রম বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
এ ব্যাপারে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স এদিনকে বলেন, ‘একটি সরকার এবং সরকারি দলের কার্যক্রমকে আলাদা করা খুব দুরূহ ব্যাপার। কারণ যারা নেতা তারাই মন্ত্রী, তারাই এমপি। তারপরও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম থেকেই চেষ্টা করছেন যেন সরকার এবং দলের কার্যক্রমকে পৃথক রাখা যায়।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতাও স্বীকার করে বলেন, একই ব্যক্তির সরকারি ও দলীয় দায়িত্ব থাকায় দুই ধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্যে সমন্বয় করা আসলেই কঠিন। সেজন্য এক ব্যাক্তি এক পদ নীতির বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নাই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জানা গেছে, সরকার গঠনের পর দলীয় ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে একধরনের জড়তা এসেছে। মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের প্রশাসনিক ব্যস্ততা এবং নির্বাচনী এলাকায় সময় দেওয়ার কারণে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আগের মতো উপস্থিতি নেই বলেও জানা গেছে।
তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হলে তার প্রভাব শুধু দলীয় পদ বণ্টনে সীমাবদ্ধ থাকে না। তৃণমূলের অভিযোগ কেন্দ্রে পৌঁছানো, স্থানীয় বিরোধ মীমাংসা, নতুন নেতৃত্ব তৈরি এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে রাজনৈতিক অবস্থান জানানোর ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হতে পারে। কমিটি পুনর্গঠনের ঘোষণা থাকলেও তা বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ে।
সূত্র জানায়, বিএনপির সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যস্ততার মধ্যেও রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজস্ব কর্মপরিসর সচল রাখা। সরকার সফল হলে তার কৃতিত্ব যেমন দলের ওপর বর্তাবে, তেমনি সরকারের ব্যর্থতা বা বিতর্কের রাজনৈতিক দায়ও শেষ পর্যন্ত বিএনপিকে নিতে হবে। তাই সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নের পাশাপাশি দলীয় সংগঠনকে সক্রিয় রাখা ক্ষমতাসীন দলের জন্য কেবল সাংগঠনিক প্রয়োজন নয়, রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্মবিষয়ক সম্পাদক কাদের সিদ্দিকী বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন হওয়ায় নেতাকর্মীদের মধ্যে স্বস্তির অনুভূতি বিরাজ করছে। তিনি বলেন, এতদিন আন্দোলনের চাপ ছিল, এখন দায়িত্ব বেড়েছে। তাই সরকার পরিচালনার কাজেই নেতারা বেশি ব্যস্ত।
তিনি বলেন, সরকারি সিদ্ধান্তের পক্ষে জনমত তৈরি করা, সিদ্ধান্তের সীমাবদ্ধতা নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা করা, তৃণমূলের মতামত শোনা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত রাজনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা-এসব কাজ সরকার পরিচালনার বিকল্প নয়, বরং দল ও সরকারের পৃথক দায়িত্ব পালনের অংশ।
এদিকে দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে রাজধানীর নয়াপল্টনে অবস্থিত বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ছিল আন্দোলন-সংগ্রামের প্রাণকেন্দ্র। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নেতা-কর্মীদের আনাগোনা, সংবাদ সম্মেলন, মিছিলের প্রস্তুতি ও কৌশল নির্ধারণে সরগরম থাকত পুরো এলাকা। গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিও ছিল নিয়মিত। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পর সেই চিত্রে এসেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন। আগে যেখানে প্রতিদিন নেতা-কর্মীদের ভিড় লেগে থাকত, সেখানে এখন অনেক সময়ই কার্যালয়কে তুলনামূলক শান্ত ও ফাঁকা দেখা যাচ্ছে।
দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপির অনেক কেন্দ্রীয় নেতা এখন সংসদ সদস্য কিংবা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তাদের বড় একটি অংশ সচিবালয় ও নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় বেশি সময় দিচ্ছেন। এতে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে উপস্থিতি কমেছে।
সূত্র জানায়, মহানগর, জেলা ও উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা মন্ত্রী-এমপিরা ব্যস্ত সময় পার করছেন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজে। মাঠের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের অনেকেই এখন সাংগঠনিক কার্যক্রমের চেয়ে বেশি সময় কাটাচ্ছেন মন্ত্রী-এমপিদের আশপাশে। এমনকি অনেকে বাসা ভাড়া নিয়েও অবস্থান করছেন রাজধানী ঢাকায়। তাঁদের অনেকের সাংগঠনিক কাজে মনোযোগ বা সময় দেওয়ার আগ্রহ কম। একই সঙ্গে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ভাবমূর্তি ক্ষণ হওয়ার কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে হাইকমান্ডের কঠোর বার্তায়ও সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। এ পরিস্থিতিতে অনেকটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রমে।
কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আজম সৈকত বলেন, নির্বাচনের পর অধিকাংশ নেতা নিজ নিজ এলাকায় সংগঠন গোছানোর কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্দোলন-সংগ্রামে অবদান রাখা নেতা-কর্মীদের মূল্যায়নের বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। সাবেক এই ছাত্রদল নেতার দাবি, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকা প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জনের বেশি সাবেক ছাত্রদল নেতাকে মন্ত্রী-এমপি করা হয়েছে। অন্য নেতা-কর্মীদেরও ধাপে ধাপে সংগঠনের বিভিন্ন পদে মূল্যায়ন করা হবে বলে তিনি আশা করছেন।
তবে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বিএনপির বিভিন্ন স্তরের সাংগঠনিক কাঠামো পুনর্গঠনের কাজ চলছে বলে জানা গেছে। বিশেষত, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সংগঠনকে আরো শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
এ বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, সরকার গঠনের পর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়নি, বরং কিছুটা স্তিমিত হয়েছে। তবে দলীয় পদক্ষেপগুলো দেখলেই বোঝা যাবে যে নেতা-কর্মীদের সক্রিয় রাখতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘সরকার গঠনের মাত্র কয়েক মাস পার হলো। এই সময়ের মধ্যে ফার্স্ট প্রায়োরিটি ছিল জনগণ। জনগণের চাহিদাগুলো পূরণের পাশাপাশি আমরা সাংগঠনিক কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছি। শিগগিরই সাংগঠনিক তৎপরতা আরো বাড়ানো হবে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









