নিজের একটি বক্তব্যই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের জন্য। অপরাধ দমনে সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে ‘ক্রসফায়ারে’ যেতে পুলিশ দ্বিধা করবে না-এমন মন্তব্যের পাশাপাশি সাংবাদিকদের পেশাগত সততা নিয়ে ঢালাও অভিযোগ তুলে এখন নিজেই সমালোচনার কেন্দ্রে তিনি।
ক্রসফায়ার নিয়ে সরকারের অবস্থান, সাংবাদিকদের প্রতিবাদ, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ-সব মিলিয়ে চাপে পড়েছে পুলিশ প্রধানের অবস্থান। এমতাবস্থায় বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে আইজিপি পদে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্যসংবলিত নথি তলব করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে। ফলে একটি মাত্র বক্তব্যে দুটি বিতকের জন্ম দিয়ে এখন টক অব দ্য কান্ট্রি তিনি।
আইজিপির বক্তব্যকে সরাসরি নাকচ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সরকার ক্রসফায়ার চায় না, এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীও মন্তব্যটিকে সরকারের জন্য বিব্রতকর বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, আইজিপির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফেরার পর বিবেচনা করবেন। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর শেষে আজ রাতে দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
জানা গেছে, আইজিপির পদে সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা এবং কয়েকজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্যসংবলিত নথি তলবের খবর সামনে এসেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ব্যাখ্যা দিয়েই কি বিতর্ক সামাল দিতে পারবেন পুলিশ প্রধান, নাকি নিজের বক্তব্যের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়ও নিতে হবে তাঁকে?
আইজিপির বক্তব্যের পরপরই বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক ও নাগরিক পরিসরে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা বলা সরকারের আমলে পুলিশপ্রধানের মুখে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দের ব্যবহার নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগকে দেখা হচ্ছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পুলিশের জবাবদিহি নিয়ে নতুন সংঘাতের সূত্র হিসেবে।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ আইজিপির বক্তব্যকে সমর্থন না করে স্পষ্ট জানিয়েছেন, সরকার ক্রসফায়ার চায় না। তিনি বলেন, আইনের কঠোর প্রয়োগের কথা বলতে গিয়ে আইজিপি অসতর্কতাবশত মন্তব্যটি করেছেন। কিন্তু সেটি ঠিক হয়নি, এমন কথা বলা উচিতও ছিল না। সরকারের অবস্থান বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’-এ কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। সেই দলের সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় পুলিশপ্রধানের মুখে ক্রসফায়ারের কথা তাঁদের ভাবিয়ে তুলেছে। তাঁর মতে, দেশে অপরাধ দমনের জন্য প্রচলিত আইন রয়েছে; আইনবহির্ভূত পদ্ধতিতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, পুলিশ সদর দপ্তর আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাপান সফর শেষে দেশে ফেরার পর তাঁর বিষয়ে অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন আছে কি না, তা বিবেচনা করবেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের অপেক্ষার কথা বলা হলেও আইজিপিকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে হয়েছে- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিশ্বস্ত্র সূত্র এমনটি জানিয়েছেন।
গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) পুরান ঢাকার চকবাজারে একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে আইজিপি বলেন, ‘ক্রসফায়ার’ প্রয়োজন হলে এবং সরকার অনুমোদন দিলে পুলিশ তা করতে পিছপা হবে না। পুলিশের বলপ্রয়োগ নিয়ে সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, পুলিশ কঠোর হলে এক পক্ষ তাকে ফ্যাসিস্ট বলে, আবার নিষ্ক্রিয় থাকলে দুর্বল বলে আখ্যা দেয়। দায়িত্ব পালনে পুলিশকে উপযুক্ত পরিবেশ দেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
একই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের নিয়েও মন্তব্য করেন পুলিশপ্রধান। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, মাদক কারবারিদের কাছ থেকে অর্থ না পেলে সাংবাদিকরা পুলিশকে অকার্যকর বলে সংবাদ প্রকাশ করেন। এই মন্তব্যে সাংবাদিকদের পেশাগত সততা ও স্বাধীন সাংবাদিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অপরাধ, মাদক, অনিয়ম ও দুর্নীতির খবর প্রকাশ সাংবাদিকদের দায়িত্বের অংশ-এ কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানায়।
যদিও সমালোচনা শুরুর পর সোমবার রাতেই পুলিশ সদর দপ্তর আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেয়। এতে বলা হয়, ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বোঝাতে ব্যবহার করা হয়নি, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ বোঝাতেই তিনি রূপক অর্থে শব্দটি বলেছেন। সাংবাদিকদের নিয়ে মন্তব্যটিও অসাবধানতাবশত হয়েছে বলে ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনও পৃথক বিবৃতিতে আইজিপির বক্তব্যকে প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের আলোকে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশের অযথা দ্বিধাগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়; তবে আইনের সীমার মধ্যে থেকেই দৃঢ়তা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
কিন্তু এই ব্যাখ্যা বিতর্ক থামাতে পারেনি। সমালোচকদের প্রশ্ন, বক্তব্যটি যদি কেবল রূপক অর্থে হয়ে থাকে, তাহলে ‘সরকার অনুমতি দিলে’ ক্রসফায়ারে যাওয়ার কথা বলার প্রয়োজন কেন হলো? বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর বিষয়ে পুলিশের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার শব্দচয়ন কি শুধু অসতর্কতা বলে বিবেচিত হতে পারে? সাংবাদিকদের নিয়ে ঢালাও অভিযোগের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন-নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া এমন মন্তব্য কি পেশাদার সাংবাদিকতাকে সন্দেহের মুখে ঠেলে দেয় না?
মানবাধিকারকর্মী ও সামাজিক সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ ড. নাবিলা ইদ্রিসের প্রশ্ন, আইজিপি বিধি ভেঙেছেন কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব কি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের, নাকি প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে? তাঁর মতে, একজন কর্মকর্তার পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না, আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করাও জরুরি।
১২ সংগঠনের প্রতিবাদ, আলটিমেটাম
এদিকে আইজিপির বক্তব্য ঘিরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ), বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব), ল রিপোর্টার্স ফোরাম (এলআরএফ), ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), অধিকার, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস), সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, মায়ের ডাক ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ অন্তত ১২টি সংগঠন প্রতিবাদ জানিয়েছে বলে সংগৃহীত সংবাদ-উপাদানে উল্লেখ রয়েছে।
সাংবাদিকদের নিয়ে মন্তব্যের প্রতিবাদে ডিআরইউ ও ক্র্যাব ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানায়। ডিআরইউ প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবিও তোলে এবং তা না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেয়। ক্র্যাবও অন্য সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি নেওয়ার কথা জানায়। এলআরএফও বক্তব্য প্রত্যাহার ও ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়েছে।
অন্যদিকে, টিআইবি, আসকসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো ক্রসফায়ার-সংক্রান্ত মন্তব্যের নিন্দা জানিয়ে বক্তব্য প্রত্যাহার, ব্যাখ্যা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনগুলোও বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছে।
আইজিপি পদে পরিবর্তনের আলোচনা
এদিকে বিতর্কের মধ্যে আইজিপি পদে নতুন কর্মকর্তা নিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কয়েকজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্যসংবলিত নথি তলব করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আজ রাতে জাপান থেকে ফেরার পরই সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলে সরকারি একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
তবে আইজিপির বিতর্কিত বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এখন দুটি বিষয় সামনে এসেছে-বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রশ্নে রাষ্ট্রের অবস্থান এবং গণমাধ্যমের সমালোচনা সহ্য করার ক্ষেত্রে পুলিশের পেশাদারত্ব। অপরাধ দমনে পুলিশকে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু সে দায়িত্ব পালনের সীমা নির্ধারিত হবে আইন ও সংবিধান দিয়ে, সরকারের অনুমোদন কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিতে পারে না।
একইভাবে, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ থাকলে তা প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করা যেতে পারে। কিন্তু গোটা সাংবাদিক সমাজকে ঢালাওভাবে অভিযুক্ত করলে স্বাধীন সাংবাদিকতা, জনস্বার্থে অনুসন্ধান এবং পুলিশের জবাবদিহি-সবই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এখন দেখার বিষয়, প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পর আইজিপির বক্তব্য নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি পদে থাকবেন, নাকি নেতৃত্বে পরিবর্তন আসবে-তার উত্তর এখনো অনিশ্চিত। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, পুলিশপ্রধানের ব্যাখ্যার পরও বিতর্ক থামেনি, বরং তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিণতি নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। যে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দ ব্যবহার করে তিনি কঠোরতার বার্তা দিতে চেয়েছিলেন, সেই শব্দই এখন তাঁর নিজের পদ ও পেশাগত গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্নের কেন্দ্রে। শেষপর্যন্ত নিজের কথার ক্রসফায়ারেই আইজিপিকে পড়তে হবে কি না, তা নির্ভর করছে সরকারের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি জবাবদিহির প্রশ্নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয় তার ওপর।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









