বাংলাদেশের পাঁচটি অগ্রাধিকার খাতে জাপানি বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ আহ্বানের অগ্রাধিকার খাতগুলো হলো- গাড়ি উৎপাদন, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা, দ্রুতগতির রেল ও লজিস্টিকস এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ। এসব খাতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাড়াতে সরকারি সহযোগিতা ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে সংস্কারের আশ্বাস দেন তিনি।
গতকাল বুধবার টোকিওতে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) সদর দপ্তরে বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে সমঝোতা স্মারক বিনিময়ের পাশাপাশি মোট ১৭টি বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্রকল্পের ঘোষণা দেওয়া হয়। জেট্রো এবং জাপান–বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন যৌথভাবে ফোরামের আয়োজন করে। সহযোগিতায় ছিল টোকিওস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস।
জ্বালানি খাতে এলএনজি অবকাঠামো, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ–জাপান প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা জানান।ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী, খুলনা ও বরিশালসহ প্রধান শহরগুলোকে যুক্ত করে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। জাপানি বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ দূর করতে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, উন্নত অবকাঠামো এবং কর ও শুল্কব্যবস্থায় পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
১৭টি বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্রকল্প
ফোরামের ঘোষণাপর্বের সরবরাহকৃত ট্রান্সক্রিপ্ট অনুযায়ী, মোট ১৭টি প্রকল্পের উল্লেখ করা হয়। এ পর্বে টয়োটা তসুশো করপোরেশন, মিৎসুই অ্যান্ড কো. এবং কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে আসে।
বিনিয়োগ পরিবেশ ও ব্যবসার সম্ভাবনা নিয়ে উপস্থাপনা
অনুষ্ঠানসূচি অনুযায়ী, উদ্বোধনী বক্তা ছিলেন জেট্রোর প্রেসিডেন্ট সুসুমু কাতাওকা। অতিথি বক্তা হিসেবে ছিলেন জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্পবিষয়ক পার্লামেন্টারি ভাইস-মিনিস্টার শিনজি ওয়াকায়ামা। ব্যবসায়িক অধিবেশনে বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর উপস্থাপনার বিষয় ছিল বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা। ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর উপস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল বিনিয়োগ সহজ করতে সংস্কার ও নতুন উদ্যোগ। জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মিৎসুই অ্যান্ড কো. (এশিয়া প্যাসিফিক)-এর ঢাকা শাখার ব্রাঞ্চ জেনারেল ম্যানেজার ও কান্ট্রি চেয়ারপারসন কেনইচিরো কাওয়ামোতোর উপস্থাপনার বিষয় ছিল বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গঠনে যৌথ উদ্যোগ।
ওয়াইকেকে করপোরেশনের গ্লোবাল সেলস হেডকোয়ার্টার্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট রেইসুকে আরাতানির উপস্থাপনার বিষয় ছিল বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক যাত্রা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদের উপস্থাপনার বিষয় ছিল বাংলাদেশের উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাময় উদীয়মান ব্যবসা। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন জেট্রো ঢাকা কার্যালয়ের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজুআকি কাতাওকা।
এর আগে টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে জেটরোর প্রেসিডেন্ট কাতাওকা সুসুমুর সঙ্গে বৈঠক হয় তারেক রহমানের। বৈঠকে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণে জেটরোর ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে উন্নত উৎপাদনশিল্প, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), অটোমোবাইল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে জাপানের বিনিয়োগ প্রত্যাশা করেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণেও জাপানের সহযোগিতা চান তিনি। তার আশা, দুই দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হবে। বৈঠকে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করে উভয় পক্ষ। বাংলাদেশের দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায়ও জাপানের সহযোগিতা চান তারেক রহমান। এসব উদ্যোগ জাপানে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় করতে সহায়ক হবে বলে তিনি মনে করেন।
শাহাদাৎ স্বাধীন বলেন, বৈঠকে জেটরোর প্রেসিডেন্ট কাতাওকা সুসুমু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে ‘বিনিয়োগের জন্য সম্ভাবনাময়’ হিসেবে বর্ণনা করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগে জাপানি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ তৈরি হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী জেটরোর প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। পরে কাতাওকা সুসুমুর আমন্ত্রণে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন তারেক রহমান।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। এ ছাড়া ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশে ইউনিক্লোর বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
এদিকে জাপানের পোশাক প্রস্তুতকারক ও খুচরা বিবিক্রির চেইন ইউনিক্লোকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ইউনিক্লোর মূল প্রতিষ্ঠান ফাস্ট রিটেইলিং কোম্পানি লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তাদাশি ইয়ানাইয়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বুধবার টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সেখানেই প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান রাখেন বলে তার উপপ্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন জানান। বৈঠকে প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন, পণ্যে উদ্ভাবন, উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে ইউনিক্লোর কার্যক্রম সম্প্রসারণে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। এ ক্ষেত্রে জমির ব্যবস্থা, বিনিয়োগের অনুমোদন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
বাংলাদেশে জেবিআইসির কার্যালয় খোলার অনুরোধ প্রধানমন্ত্রীর
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নর আমাকাওয়া কাজুহিকো।স্থানীয় সময় গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে এ সাক্ষাৎ হয় বলে প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন জানিয়েছেন। তিনি জানান, বৈঠকে বাংলাদেশের জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) এবং অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়। উপপ্রেস সচিব বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বলেছেন, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন বিধিবিধান সংস্কার ও সহজ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়ন এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে তার সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
বাংলাদেশে জেবিআইসির একটি কার্যালয় খোলার অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী। ব্যাংকটির গভর্নর প্রস্তাবটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন বলে জানান শাহাদাৎ স্বাধীন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এবং বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ ও সহযোগিতার জন্য জেবিআইসির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. শাকিরুল ইসলাম খান এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









