দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা থামাতে পারেনি তার শিক্ষার অদম্য অগ্রযাত্রা। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে এবার শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক হয়েছেন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলসের সমিরঞ্জন বিশ্বাস।
সিলেটের জিন্দাবাজারে অবস্থিত গ্রিন ডিজঅ্যাবলড ফাউন্ডেশন (জিডিএফ) পরিচালিত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে ব্রেইল শিক্ষক হিসেবে গত ১ এপ্রিল নিয়োগ পেয়েছেন তিনি। তার এ অর্জন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠার এক অনুপ্রেরণাদায়ী দৃষ্টান্ত।
সমিরঞ্জন বিশ্বাস শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস এলাকার ভূমিহীন দিনমজুর সুবল বিশ্বাস ও ললিতা রাণী বিশ্বাসের দ্বিতীয় সন্তান। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে দ্বিতীয় সমিরঞ্জন জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। দারিদ্র্যের কারণে শৈশবে তার শিক্ষাজীবন শুরু করাও ছিল কঠিন। এলাকায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় দীর্ঘদিন ঘরেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয় তাকে।
পরে সুনামগঞ্জ ভার্ড চক্ষু হাসপাতালের সামাজিক পুনর্বাসন প্রকল্পের কমিউনিটি বেইজড রিহ্যাবিলিটেশন (সিবিআর) কার্যক্রমের মাধ্যমে তার সন্ধান পান প্রকল্পের ফিল্ড সুপারভাইজার মো. আবু সঈদ। তার সহযোগিতায় সমিরঞ্জনের পরিবার সিলেটের জিডিএফের খোঁজ পায়। পরে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক প্রয়াত রজব আলী খান নজীব তাঁকে বিনা মূল্যে আবাসিক সুবিধাসহ বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন।
রজব আলী খান নজীব নিজেও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছিলেন। নিজের সীমাবদ্ধতা জয় করে তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা, আবাসন, চিকিৎসা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের সুযোগ সৃষ্টিতে কাজ করেছেন। তার প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানেই সমিরঞ্জনের শিক্ষাজীবন থেকে কর্মজীবনে উত্তরণের পথ তৈরি হয়।
২০০৬ সালে শিক্ষাজীবন শুরু করেন সমিরঞ্জন। শ্রুতিলেখকের সহায়তায় পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ২০১০ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী, ২০১৩ সালে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি), ২০১৬ সালে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) এবং ২০১৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে সিলেটের সরকারি মদন মোহন কলেজে ভর্তি হয়ে ২০২২ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
পড়াশোনা শেষে চাকরি করে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখলেও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতার কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চেষ্টা করেও চাকরি পাননি তিনি। এ নিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি জিডিএফে ফিরে এসে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ বেতারের লোকসংগীতের ‘গ’ বিভাগে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিল্পী হিসেবেও স্বীকৃতি পান সমিরঞ্জন। এরপর জিডিএফের মহাসচিব ও নির্বাহী পরিচালক বায়েজিদ খানের উদ্যোগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন করা হয়। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের কমিটির সিদ্ধান্তে তাঁকে ব্রেইল শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এদিকে সমিরঞ্জনের বাবা সুবল বিশ্বাস ভূমিহীন দিনমজুর। অন্যের জায়গায় ঘর তৈরি করে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন তিনি। ২০২৪-২৫ সালে বসবাসের উপযোগী এক টুকরো জমি বন্দোবস্তের আবেদন করেও সরকারি সহায়তা পাননি বলে জানা গেছে।
নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক হওয়ার সুযোগ পেয়ে আনন্দিত সমিরঞ্জন বিশ্বাস। শিক্ষক হিসেবে অর্জিত জ্ঞান ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চান তিনি। তার প্রত্যাশা, তার মতো কোনো শিক্ষার্থী যেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা ও আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে পিছিয়ে না থাকে এবং সবাই যেন সমাজে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ পায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









