কানাই মামার জন্য পুরো দমে পাত্রী দেখা চলছিল। পাত্রী যেমনই হোক মামার এই মাসেই বিয়ে করতে হবে। চল্লিশটি বসন্ত পার হয়ে গেছে। সবাই কানাই মামাকে বাতিল মামা বলে ডাকে। মামা এবার কোমর বেঁধে নেমেছেন। বিয়ে তাকে করতেই হবে।
পত্রিকা থেকে শুরু করে এ পাড়ার ও পাড়ার যত ঘটক আছেন সবাইকে খোঁজ করা হলো। কোনো চাহিদা নেই শুধু পাত্রী চাই। বিয়ের পরে পাত্রী পরকীয়া করলেও সমস্যা নেই। তবু একটি পাত্রী কানাই মামার লাগবেই। কত দিন আর পাড়ার ছেলেরা বাতিল মামা বাতিল মামা বলে চিৎকার করবে? এর একটা বিহিত অবশ্যই করতে হবে।
চারদিকে মাইকিং করে জানিয়ে দেওয়া হলো। দফায় দফায় ঘটকেরা মেয়ের বায়োডাটা নিয়ে হাজির হতে লাগলেন।
কানাই মামা ভ্রু কুঁচকে বললেন মেরে কপালে দিল্লিকা লাড্ডু নেহি সব বরবাদ!’
কানাই মামা আবার হিন্দি ভাষাটাও আয়ত্ত করে ফেলেছেন। হিন্দি নায়িকাদের নাচ দেখতে দেখতে মামার আজ এই অবস্থা। পাত্রী দেখতে গেলে খোঁজেন সুন্দরী নায়িকাদের মতো চেহারা। মেয়েরা কি আর সব সময় নায়িকাদের মতো রংঢং করে থাকতে পারে?
সে যাই হোক সবাই কোমর বেঁধে কানাই মামার বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগল। আমিও ছিলাম এই দলের একজন। একবার কানাই মামার জন্য এক বিপদের মধ্যে পড়তে হয়েছিল আমাকে।
একটি পাত্রী দেখতে যাওয়ার দিন নির্ধারণ করা হলো। পাত্রীর বাড়িতে আগে থেকেই জমজমাট আয়োজন। এককথায় এলাহি কাণ্ডকারখানা। কিন্তু আমাদের কানাই মামা কোথায়? তার কোনো খোঁজ নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেল তিনি নাকি ভীষণ ঝামেলার মধ্যে আছেন। আসতে পারবেন না।
পাত্রীপক্ষকে মিথ্যা বলে সান্ত্বনা দিয়ে কোনোমতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেল। আবার ওই পাত্রীকে দেখার জন্য কিছুদিন পর দিন নির্ধারণ করা হলো। কিন্তু এবারও কেল্লাফতে! কানাই মামার কিছুই হলো না। তার এক বন্ধু বাইক দুর্ঘটনায় পড়ে পটল তুলেছেন।
কী আর করা! কিন্তু এবার তো আর পাত্রীপক্ষকে মিথ্যা কথা বলা যাবে না।
কানাই মামা আমাকে ফোন করে বললেন একটা নাটক করতে হবে তোকে। নাটকটা খুবই সহজ কিন্তু চরিত্রটা ভীষণ কঠিন। খুব সাবধান! তা না হলে বিপদ আছে।
কানাই মামার কাছ থেকে কী করতে হবে তা জানার পর আমার হাত পা কাঁপতে শুরু করল। বুকের খাঁচার ভেতর ধরফর করতে লাগল। আমাকে নকল বর সেজে পাত্রীর বাড়িতে উপস্থিত হতে হবে!
তবে ভাগ্য ভালো পাত্রীর বাড়ির লোকেরা আগে কখনো কানাই মামাকে দেখেননি। কিন্তু বয়সের তারতম্য অনেক। পাত্রী আমার চেয়ে দশ বারো বছরের বড় হবেন। তাই নিজেকে একটু বয়স্ক দেখাতে যা যা করা দরকার সবই করলাম।
কথাবার্তায় গাম্ভীর্য নিয়ে এলাম। হ্যাঁ সূচক বাক্যকে প্রাধান্য দিলাম।
গাড়িতে করে যখন পাত্রীর বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম তখন অজানা আতঙ্কে বারবার কানাই মামাকে মনে মনে গালি দেওয়ার ইচ্ছা জাগল। কিন্তু মনের আকাঙ্ক্ষা মনেই পুষে রাখলাম।
পাত্রীর বাড়িতে পৌঁছে দেখি হরেক পদের বাহারি রান্নার আয়োজন। আমার সঙ্গে দুই তিনজন চেলাও এসেছিল। একটা ভাব তো বজায় রাখতে হবে! তাই পেটপুরে আচ্ছামতো খেতে লাগলাম। খাসি থেকে গরু গরু থেকে মুরগি রুই, কাতলা, বোয়াল। খাওয়া শেষ হলে এবার পাত্রী দেখার পালা।
পাত্রী আমার চেয়ে দশ বারো বছরের বড় হবেন। অবশ্য পাত্রী আমার জন্য নয় আমি তো নকল বর!
পাত্রী আমাকে দেখে হা করে তাকিয়ে রইলেন। মনে হলো তিনি কিছু একটা বলতে চান। পাত্রীর ভাই আমার নাম জিজ্ঞাসা করলেন। আমি নির্দ্বিধায় কানাই মামার নাম উচ্চারণ করলাম।
মানে তখনকার সেই মুহূর্তে আমিই কানাই!
বাবার নাম মায়ের নাম পড়াশোনা এমনকি উচ্চতা পর্যন্ত বলতে হলো। ভাগ্য ভালো বুকের মাপ জিজ্ঞাসা করেননি!
পাত্রীর ভাই বললেন তোমরা আধুনিক যুগের মানুষ। একটু পাত্রীর সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলো।
আমিও রাজি হয়ে গেলাম। ভাবলাম এবার তো ভাগ্য খুলেছে! যাচাই বাছাই করে নিই। বিয়ে তো আর আমার হবে না তবে বিয়ের একটা ফিল নিয়ে যাওয়া যাবে!
পাত্রীর সঙ্গে যখন আলাদাভাবে কথা বলতে বসলাম তখন দেখি, তিনি শুধু আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আছেন। ওমা এ কী কাণ্ড! মনে হলো তিনি মনে মনে কাঁচকলা খেয়ে বসে আছেন!
আমি মনে মনে বললাম আপনি তো আমার মামী হওয়ার যোগ্য! আমি নকল বর। কানাই মামার এই গণ্ডগোল সমাধান করতে এসেছি।
তারপর কথা হলো চোখাচোখি হলো কিন্তু প্রেম হলো না।
আমি কেন যে কানাই মামার হয়ে এই পাত্রী দেখতে এলাম! এখন তো ঘোর বিপদ!
মেয়ে আমার মোবাইল নম্বর চেয়ে বসলেন। আমিও দিয়ে দিলাম। তারপর আরও কত কথা! এত কথা লেখা সম্ভব নয়। তবে রোমাঞ্চের নদীতে হাবুডুবু খেতে খেতে যখন বাড়িতে এসে পৌঁছালাম তখন কানাই মামা দৌড়ে এসে আমাকে বললেন ভাগনে অভিনয়ের দক্ষতা কেমন হলো তোমার?’
আমি শুধু এটুকুই বললাম এই দক্ষতা প্রেমের রূপ নেয় কি না সন্দেহ আছে। আমাকে আবার অন্য চোখে দেখবেন না মামা!
এই হচ্ছে কানাই মামার কাণ্ড! তাঁর কপালে বিয়ে হোক বা না হোক আমি যে একটা বিপদের হাত থেকে বেঁচে ফিরতে পেরেছি সেটাই ঢের!
কাজেই কানাই মামার পাত্রী দেখতে হলে আসল ঘটক লাগবে। পাত্রী রেফারেন্স ভাইয়ের রেফারেন্স কোনো কিছুতেই কাজ হবে না। নইলে সবকিছু কেল্লাফতে হয়ে যাবে!


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









