একসময় সকাল-বিকাল রং বদলায়- এরকম একটি ফুলের সৌন্দর্যে মুখরিত থাকত গ্রামের বাড়ির আঙিনা। ফুলটির নাম স্থলপদ্ম। এখন নার্সারিতেও যার দেখা পাওয়া ভার, সেই ফুল গাছটিকে পরম মমতায় বাঁচিয়ে রেখেছেন সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শিবপুর এলাকার কল্যাণী মজুমদার। সদর উপজেলার বাবুলিয়া জয়মণি শ্রীনাথ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রয়াত জ্যেষ্ঠ শিক্ষক রণজিৎ কুমার মজুমদারের স্ত্রী কল্যাণী মজুমদার।
শাশুড়ির কাছ থেকে পাওয়া স্থলপদ্মের একটি গাছ পরম যত্নে বড় করে তুলেছেন তিনি। সেই একটি গাছ থেকেই এখন নিজের বাড়ি ও পাশের একটি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে দিয়েছেন স্থলপদ্মের সৌন্দর্য। রঙ বদলানো এই অপরূপ ফুলের সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিনই সেখানে ভিড় করছেন ফুলপ্রেমীরা।
সাতক্ষীরা সদরের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্লাবনী সরকার জানান, জলপদ্ম চীন ও তাইওয়ানের আদি ফুল। এই উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম (হিবিসকাস মিউটাবিলিস)। স্থলপদ্ম জবা পরিবারের একটি বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। তিনি বলেন, ‘এর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো দিনের বিভিন্ন সময়ে ফুলের রঙের পরিবর্তন। সকালে সাদা বা হালকা গোলাপি রঙে ফুটে থাকা ফুলটি সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে গোলাপি এবং বিকালের দিকে গাঢ় গোলাপি বা লালচে রং ধারণ করে।’
তিনি বলেন, ‘শরৎ ও হেমন্তকালে ফোটা এই ফুলের সৌন্দর্য আর ঔষধি গুণের কারণে একসময় ব্যাপক চাহিদা থাকলেও অসচেতনতা ও সংরক্ষণের অভাবে এটি বিলুপ্তির মুখে পড়ে। তবে কল্যাণী মজুমদারের এই উদ্যোগ গাছপ্রেমীদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।’ জলাবদ্ধতামুক্ত দোআঁশ মাটি এই গাছের বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে উপযোগী। এছাড়া বর্ষাকালে সহজেই ডাল কেটে তা রোপণের মাধ্যমে এর বংশবিস্তার করা সম্ভব বলে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
পরম মমতায় আগলে রাখা গাছটিতে যখন একের পর এক ফুল ফোটে তখন সেই ফুলের মায়াবী দোলায় দুলে ওঠে কল্যাণী মজুমদারের মন। প্রতিটি ফুল যেন তার ভালোবাসা, পরিচর্যা আর স্মৃতির এক একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। কল্যাণী বলছিলেন, তিনি তার শাশুড়ি মায়ারাণী মজুমদারের কাছ থেকে এই গাছটি পান। মায়ারাণী মজুমদার ভারত থেকে ফেরার পথে একটি ডাল নিয়ে এসেছিলেন। সেই গাছ থেকে সেই ডাল থেকে অনেকগুলো গাছ তৈরি হয়। তারপর থেকে এই স্থলপদ্মের বিস্তার ঘটতে থাকে।
তিনি বলেন, ‘এখন গাছে শত শত স্থলপদ্ম ফোটে। আশেপাশের বহু মানুষ এ ফুল দেখার জন্য আাসে। তখন আমার যে কি ভালো লাগে সেটা বলে বোঝানোর মতো না।’ ফুলপ্রেমী কল্যাণী মজুমদার শখের বশে বাড়ি ও পাশের বর্ণমালা স্কুলের প্রাঙ্গণে বিভিন্ন ধরনের দুষ্প্রাপ্য ফল ও ফুলের গাছ সংরক্ষণ ও পরিচর্যা করেন। তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগে উৎসাহ জোগায় তার সন্তানও। মায়ের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গাছগুলোর যত্ন ও পরিচর্যায় সহযোগিতা করে সে।
বর্ণমালা স্কুলের প্রধান শিক্ষক পল্লব মজুমদার বলছেন, স্থলপদ্ম শুধু তার বিদ্যালয়ের আঙিনার সৌন্দর্যই বাড়াচ্ছে না বরং শিক্ষার্থীদের প্রকৃতি ও পরিবেশ সম্পর্কে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। স্থলপদ্মের পাশাপাশি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নানা প্রজাতির ফুল, ফল ও ঔষধি গাছ রয়েছে। এর মাধ্যমে বিশেষ করে স্কুলের কমলমতি শিশুদের উদ্ভিদজগৎ, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের বাস্তুতন্ত্র সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি।
শিবপুরের বাসিন্দা স্মরণিয়া নামের এক তরুণী বলছিলেন, ‘স্থলপদ্মের সকালে-বিকালে রঙ বদলানোর দৃশ্য সত্যি বিষ্ময়কর! এই ফুলের সৌন্দর্য প্রতিদিনই নতুন করে মুগ্ধ করে। এ ফুল আমার অনেক প্রিয়।’ তিনি বলেন, স্থলপদ্ম যেহেতু একটি দুষ্প্রাপ্য ফুল তাই এই গাছটি দেখে তিনি যতটা খুশি হন, ততটা শান্তি পান।
কৃষি কর্মকর্তা প্লাবনী সরকার বলেন, স্থলপদ্ম গাছ খুব সহজেই সম্প্রসারণ করা সম্ভব। বর্ষাকালে এর ডাল রোপণ করলেই নতুন চারা গজায়; এটি কোনো কঠিন কাজ নয়। শুধু গাছ যেন প্রতিদিন অন্তত চার থেকে ছয় ঘণ্টা সরাসরি সূর্যের আলো পায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘উদ্ভিদ প্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া স্থলপদ্ম গাছ পরিচর্যা নিয়ে আহামরি কোনো নিয়মকানুন নেই। সঠিক পরিচর্যা করলে বাড়ির আঙিনায় ও বাড়ির ছাদে এই সুন্দর ফুল গাছটি খুব সহজেই বাঁচিয়ে রাখা এবং বিস্তার ঘটানো সম্ভব।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









