এক গভীর সবুজ বনে বাস করত অনেকগুলো হরিণ। বনটি ছিল যেন প্রকৃতির নিজের হাতে আঁকা এক বিশাল ছবি। চারদিকে উঁচু উঁচু গাছ, লতাপাতা, বুনো ফুল আর নানা রকম পাখির ডাক। সকালে সূর্যের আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে যখন মাটিতে পড়ত, তখন মনে হতো বনের মাটিতে কেউ যেন সোনালি চাদর বিছিয়ে দিয়েছে।
সেই বনে হরিণদের একটি বড় দল ছিল। তাদের মধ্যে ছিল ছোট-বড় অনেক হরিণ। আর ছিল একটি ছোট্ট হরিণছানা। তার নাম ছিল টুকু।
টুকু ছিল ভীষণ কৌতূহলী। অন্য হরিণেরা যখন বনের ভেতর ঘাস খেত, টুকু তখন গাছের আড়াল থেকে নতুন কিছু দেখার চেষ্টা করত। কখনো প্রজাপতির পেছনে ছুটত, কখনো পাখির সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করার চেষ্টা করত। তবে টুকুর বাবা-মা তাকে সব সময় একটি কথা বলতেন- “বনের সীমানার বাইরে যাবে না।” টুকু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করত, “কেন বাবা?” বাবা গম্ভীর হয়ে বলতেন, “ওদিকে মানুষের বসতি। মানুষ খুব বিপজ্জনক।” মা তখন আরও ভয় দেখিয়ে বলতেন, “মানুষ আমাদের ধরে নিয়ে যেতে পারে। কেউ কেউ আবার প্রাণীদের কষ্টও দেয়। তাই কখনো মানুষের কাছে যেও না।”
টুকু তখন ভয়ে মাথা নাড়ত। বনের অন্য হরিণেরাও একই কথা বিশ্বাস করত। তারা মনে করত, মানুষ মানেই বিপদ। বছরের পর বছর ধরে এই ধারণা তাদের মনে গেঁথে গিয়েছিল। একদিন দুপুরে টুকু কয়েকটি প্রজাপতির পেছনে ছুটতে ছুটতে অনেক দূরে চলে গেল। প্রজাপতিগুলো একবার ডানদিকে, একবার বাঁদিকে উড়ছিল। টুকুও তাদের পেছনে ছুটছিল। হঠাৎ সে বুঝতে পারল, চারপাশটা কেমন অচেনা। সে থেমে গেল। সামনে বনের শেষ প্রান্ত। তার ওপারে দেখা যাচ্ছে কয়েকটি বাড়ি, মানুষের চলাফেরা, উঠানে খেলছে কিছু শিশু।
টুকুর বুক ধক করে উঠল। “আমি তো মানুষের লোকালয়ে চলে এসেছি!”
সে দ্রুত ফিরে যেতে চাইল। কিন্তু কোন পথ দিয়ে এসেছে, কিছুতেই মনে করতে পারল না। ভয়ে তার শরীর কাঁপতে লাগল।
ঠিক তখনই কয়েকজন শিশু তাকে দেখতে পেল। একটি ছেলে চিৎকার করে বলল, “দেখো! দেখো! একটা হরিণ!” আরেকটি মেয়ে দৌড়ে এসে বলল, “আহা! কী সুন্দর!” টুকু ভয়ে পিছিয়ে গেল। সে ভাবল, “এবার বুঝি আমাকে ধরে ফেলবে!” কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, কেউ তাকে ধরল না।
একজন ছোট্ট মেয়ে ধীরে ধীরে তার কাছে এসে মাটিতে কিছু সবুজ ঘাস রাখল আর বলল, “ভয় পেও না। এটা খাও।”
টুকু কিছুক্ষণ দূর থেকে তাকিয়ে রইল। তারপর একটু একটু করে এগিয়ে এসে ঘাস খেতে শুরু করল। মেয়েটি আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল আর বলল, “ও খাচ্ছে! ও আমাদের ভয় পাচ্ছে না!”
আরেকজন শিশু কিছু সবজি এনে দিল। কেউ পানি এনে রাখল।
কেউ দূর থেকে ছবি তুলল। একজন বৃদ্ধ লোক শিশুদের বললেন, “তোমরা কেউ ওকে বিরক্ত করবে না। ও নিশ্চয়ই পথ হারিয়ে এখানে এসেছে।” একটি শিশু বলল, “দাদু, আমরা কি ওকে বাড়িতে রেখে দিতে পারি?” বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, “না বাবা। ওর আসল বাড়ি বন। বনের প্রাণীকে বনে ফিরিয়ে দেওয়াই ভালো।”
টুকু অবাক হয়ে সব শুনছিল। মানুষ কি তাহলে সত্যিই খারাপ?
সে তো ভেবেছিল মানুষ তাকে ধরে ফেলবে, বেঁধে রাখবে, খাবার দেবে না। অথচ এখানে সবাই তাকে খাবার দিচ্ছে, পানি দিচ্ছে, আদর করছে।
একটি ছোট্ট মেয়ে খুব সাবধানে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। টুকু প্রথমে একটু চমকে উঠলেও পরে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মেয়েটি বলল, “তুমি তোমার মায়ের কাছে ফিরে যাবে, ঠিক আছে?” মায়ের কথা মনে পড়তেই টুকুর চোখ যেন কেমন ভারী হয়ে গেল। সে তখন বনের দিকে তাকাল। সন্ধ্যা নামার আগেই গ্রামের কয়েকজন মুরুব্বী টুকুকে নিয়ে বনের কাছাকাছি চলে এলেন। তারা তাকে এমন একটি জায়গায় রেখে দিলেন, যেখান থেকে বনটি স্পষ্ট দেখা যায়।
একজন বললেন, “যাও ছোট্ট বন্ধু। তোমার মা-বাবা নিশ্চয়ই তোমার অপেক্ষায় আছে।” টুকু একবার মানুষের দিকে তাকাল। তারপর দৌড়ে বনের ভেতর ঢুকে গেল।
এদিকে টুকু হারিয়ে যাওয়ার পর বনে শুরু হয়েছে হুলস্থুল কাণ্ড। তার মা কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, “আমার টুকু কোথায় গেল?” বাবা একদিকে ছুটছেন, অন্যদিকে ছুটছেন। অন্যান্য হরিণও তাকে খুঁজতে বেরিয়েছে। এক হরিণ বলল, “নিশ্চয়ই সে মানুষের লোকালয়ে চলে গেছে!” আরেকজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “হায়! তাহলে তো আর তাকে পাওয়া যাবে না!” টুকুর মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন।।“মানুষ ওকে নিশ্চয়ই ধরে ফেলেছে!”
ঠিক তখনই দূর থেকে টুকুর ছুটে আসার শব্দ শোনা গেল। টুকু দৌড়ে এসে মায়ের সামনে দাঁড়াল। মা প্রথমে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। তারপর ছুটে এসে টুকুকে জড়িয়ে ধরল। সব হরিণ আনন্দে ছুটে এল।।কেউ টুকুর শরীর দেখছে, কেউ তার পা দেখছে। কোথাও কোনো আঘাত লেগেছে কি না। বাবা বললেন, “মানুষ তোকে কী করেছে?”
টুকু মুচকি হেসে বলল, “কিছুই করেনি বাবা।” সবাই অবাক।
“কিছুই করেনি?”
“না। বরং আমাকে খাবার দিয়েছে। পানি দিয়েছে। শিশুরা আমার সঙ্গে খেলতে চেয়েছে। একজন মেয়ে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছে।”
সব হরিণ চুপ হয়ে গেল। এক বৃদ্ধ হরিণ ধীরে ধীরে বলল, “এটা কী করে সম্ভব?” টুকু বলল, “আমি নিজ চোখে দেখেছি।” আরেক হরিণ বলল, “কিন্তু আমরা তো শুনে এসেছি মানুষ প্রাণীদের কষ্ট দেয়!”
টুকু মাথা নেড়ে বলল, “সব মানুষ একরকম নয়। আমি এমন মানুষও দেখেছি যারা আমাকে ভালোবেসেছে। তারা আমাকে নিজের কাছে রাখতে চায়নি। বরং আমার মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে।” টুকুর মা ছেলের মাথায় মুখ ঘষতে ঘষতে বললেন, “তাহলে এতদিন আমরা শুধু ভয়টাই দেখেছি, ভালো দিকটা দেখিনি।” বৃদ্ধ হরিণটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “হয়তো এটাই আমাদের ভুল ছিল। দূরে থেকে কাউকে দেখলে তাকে বোঝা যায় না। কাছে গিয়ে তার মনটা বুঝতে হয়।”
সেদিন বনের সব হরিণ অনেকক্ষণ ধরে টুকুর কথা শুনল। তারা বুঝতে পারল, মানুষের মধ্যে যেমন খারাপ মানুষ থাকতে পারে, তেমনি ভালো মানুষও আছে। ঠিক যেমন সব প্রাণী একরকম নয়, সব মানুষও একরকম নয়। টুকু সেদিন মাকে বলল, “মা, তুমি আমাকে সব সময় বলেছিলে মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকতে।”
মা একটু হেসে বললেন, “হ্যাঁ। কারণ আমি ভয় পেতাম তোকে হারাব বলে।” টুকু বলল, “কিন্তু মা, ভয় থেকে যদি আমরা সবাই সবার কাছ থেকে দূরে থাকি, তাহলে ভালোবাসাটা চিনব কী করে?” মা কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু টুকুকে বুকের কাছে টেনে নিলেন। দূরে তখন সন্ধ্যার পাখিরা বাসায় ফিরছে। বনের গাছের পাতায় হালকা বাতাস দুলছে। টুকু তার পরিচিত বনের দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল- দূরে থাকলে মানুষকে শুধু ভয়ের মতো মনে হয়।।কাছে গেলে হয়তো তার হৃদয়ের মায়াটাও দেখা যায়।
সেদিন থেকে হরিণেরা আর মানুষের লোকালয়কে আগের মতো ভয় পেত না। তারা অবশ্যই সতর্ক থাকত, কারণ বনের বাইরে বিপদ থাকতেই পারে। কিন্তু তারা এটাও জানল- শুধু শোনা কথার ওপর ভর করে কাউকে ভালো বা খারাপ বিচার করা ঠিক নয়।
আর টুকু? সে যখনই বনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে দূরের গ্রামের দিকে তাকাত, তখন তার সেই ছোট্ট বন্ধু মেয়েটির কথা মনে পড়ত। মনে পড়ত, কীভাবে সে বলেছিল- “তুমি তোমার মায়ের কাছে ফিরে যাবে, ঠিক আছে?” টুকু তখন মনে মনে বলত, “হ্যাঁ, আমি মায়ের কাছেই ফিরেছি। তবে তোমাদের ভালোবাসার কথাও কোনোদিন ভুলব না।”
তারপর সে দৌড়ে চলে যেত সবুজ বনের গভীরে, তার নিজের আপন ঠিকানায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









