ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) জুলাই ৩৬ আবাসিক হলের এক ছাত্রী সহপাঠী, রুমমেট ও হলের বাসিন্দাদের ‘গোপন ছবি’ তুলে লন্ডন প্রবাসী প্রেমিকের কাছে পাঠানোর ঘটনায় তোলপাড় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। এবার দায় স্বীকার করে মুখ খুললেন অভিযুক্ত শিক্ষার্থী তোবাউল জান্নাতী ঐশী।
অভিযুক্ত শিক্ষার্থী এদিনকে বলেন, ‘‘সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাকে অভিযুক্ত করার অধিকার তাদের (ভুক্তভোগীর) অবশ্যই আছে। কারণ, তাদের রুমে বসা বা চলাফেরা করার কিছু ছবি আমি অন্য একজনকে দিয়েছি। তবে এটি আমি কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ, তাদের মানহানি, ক্ষতিসাধন বা ব্যক্তিগত ছবি বিক্রি করার মতো কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে কখনোই করিনি।’’
যাকে ছবি পাঠানো হয়েছে ওই প্রেমিকের সঙ্গে বান্ধবীদের আগে থেকেই পরিচয় ছিল দাবি করে তিনি বলেন, ‘‘তাদেরকে (ভুক্তভোগী) আমি আমার সহপাঠী ও বান্ধবী মনে করেছি এবং তাদের সাথে আমার অনেক ভালো সম্পর্ক ছিল। যে ছেলেটার সাথে আমার কথা হতো; তার (প্রেমিকের) সাথে ওই বান্ধবীদেরও কথা হতো। ফেসবুকে তারা (বান্ধবী) যুক্ত ছিল এবং তাদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। বরং বান্ধবীরাই আমাকে বলত, ‘ছেলেটা ভালো, ওর সাথে সম্পর্ক কর। তুই জীবনে অনেক কষ্ট পেয়েছিস, অনেকবার ঠকেছিস, তাই এই ছেলেটাকে বিশ্বাস করে বিয়ে করে ফেল।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘ছেলেটির সাথে যখন আমার নিয়মিত কথা হতো, তখন সে আমার রুমমেট এবং আশপাশের মানুষদের চিনতো। কথা বলার সময় অনেক ক্ষেত্রে আমরা যেমন ছবি দিয়ে বলি যে, ‘একে তুমি চেনো কি-না, সে আমার বান্ধবী’—বিষয়টা ঠিক সেভাবেই ঘটেছে। কথা বলার সময় আমি কোথায় আছি বা কী করছি, তা বোঝাতে গিয়ে সামনে যে-ই ছিল তার ছবি তুলে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। এটা যে বেআইনি বা অনুচিত কাজ হয়েছে, তা আমি তখন বুঝতে পারিনি। কিন্তু এখন বিষয়টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়েছে এই বলে যে, আমি তাদের ব্যক্তিগত ছবি পাচার করেছি।’’
অভিযুক্ত ছাত্রী দায় স্বীকার করে বলেন, ‘‘অবশ্যই তারা নিজেদের মতো রুমে বসে ছিল, সেই ছবি আমার দেওয়া ঠিক হয়নি। আমি স্বীকার করছি, আমার ভুল হয়েছে এবং এর জন্য আমি যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নেব। প্রয়োজনে আমাকে হল থেকে বহিষ্কার করা হলেও আমি মেনে নেব। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে কারও ক্ষতি করা বা কারও সম্মানে আঘাত করার অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অতিরঞ্জিত।’’
তিনি বলেন, ‘‘আমি একজন শিক্ষার্থী। আমার ভুলটিকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা হোক। আমি আমার বান্ধবীদের কাছেও ক্ষমা চেয়েছি। প্রশাসন, শিক্ষক ও হল প্রভোস্টের কাছে আমার বিনীত অনুরোধ—আমার অপরাধের বিচার হোক, কিন্তু এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমার ব্যক্তিগত জীবন, শিক্ষাজীবন বা ক্যারিয়ার যেন ধ্বংস করে দেওয়া না হয়।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘ছেলেটি আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি এই মুহূর্তে তাকে বিয়ে করতে রাজি হইনি। সে দাবি করেছে যে আমার পেছনে সে টাকা খরচ করেছে। অথচ আমি কোনোদিন তার কাছে একটি টাকাও চাইনি। আমার কোনো কিছুর অভাব নেই, আমার বাবা-মা দুজনেই শিক্ষক এবং চাকরিজীবী।’’
টাকা পাঠাতেন কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘‘সে আমাকে খুশি করার জন্যই হয়তো কিছু উপহার দিয়েছিল। কিন্তু পরে সে বান্ধবীদের কাছে দাবি করেছে যে, সে আমার পেছনে অনেক টাকা খরচ করেছে। ছেলেটি যখন দেশে আসার কথা জানাল, আমি বলেছিলাম ঠিক আছে, দেশে এলে দেখা হবে। সে দেশে আসার পর কুষ্টিয়ার দিশা টাওয়ারে আমাদের দেখাও হয়। তখন আমার রুমের বান্ধবীরা খুব উচ্ছ্বসিত ছিল এবং সেখানে আমার আরেকজন ছেলে বন্ধুও উপস্থিত ছিল। বান্ধবীরা তখন আমাকে চাপ দেয় ওকে বিয়ে করার জন্য। কিন্তু আমি বারবার বলেছি, এই মুহূর্তে আমি বিয়ে করব না। তবে সবার সামনে কথা হয়েছিল যে, আমি বাসায় গিয়ে তার বিষয়ে কথা বলব, কারণ ছেলেটিকে আমার ভালোই লেগেছিল।’’
অভিযুক্তের দাবি— ছেলেটার বিয়েতে রাজি না হওয়ায় সে ব্যক্তিগত ক্ষোভ থেকে আমার বান্ধবীদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করার পাঁয়তারা করছে। সে আমাকে হুমকিও দিয়েছে এবং তার সেই ক্ষোভের শিকার হয়েই আজ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষিপ্ত হয়েই সে আমার বান্ধবীদের কাছে ছবিগুলো পাঠিয়েছে।’’
তিনি জানান, আমি কেবল তাকে বলেছিলাম যে, এই মুহূর্তে আমি বিয়ে করতে চাই না। আমি সত্যের পথেই আছি এবং বারবার বলছি, আমি অনাকাঙ্ক্ষিত এই পরিস্থিতির শিকার।
এদিকে প্রবাসী প্রেমিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিকাশে টাকা পাঠানোর কিছু ডকুমেন্টস রয়েছে। প্রবাসী প্রেমিকের দাবি— আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। বিয়ে করবে বলে যা চেয়েছে তাই দিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও একবার গিয়েছি। ছবি আমি পাঠাতে বলিনি, সে নিজ উদ্যোগে অনেক মেয়ের ছবি পাঠাতো। এমনকি তার খালাতো বোনের ছবিও।
প্রসঙ্গত, অভিযুক্ত শিক্ষার্থী (ঐশী) হলে অবস্থানরত কয়েকজন ছাত্রীর ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি তাদের অনুমতি ছাড়াই আবিদ নামে যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এক ব্যক্তির কাছে পাঠাতেন। সম্প্রতি ওই ব্যক্তির সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের অবনতি হলে ছবিগুলোর কিছু অংশ ভুক্তভোগীদের কাছে পাঠান আবিদ। এরপর হলটিতে চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। এবং জানাজানি হলে হল ও প্রক্টরিয়াল বডি উপস্থিত হন।
পরবর্তীতে জরুরি সভা ডেকে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কমিটিতে আহ্বায়ক হিসেবে অধ্যাপক ড. আরিফা আক্তার, সদস্য হিসেবে সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহা. খাইরুল ইসলাম ও সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. মুহা. কামরুজ্জামানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









