রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের হামলার ঘটনায় ৪ সাংবাদিক গুরুতর আহত হন। এ সময় আরও ১০ এর অধিক সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী আহত ও লাঞ্ছিত হন।
সোমবার (৫ অক্টোবর) এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের নামে মামলা করেছে।
এর আগে, রবিবার (৪ অক্টোবর) দিবাগত রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে সাংবাদিকদের ওপর এ হামলার ঘটনা ঘটে।
রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারকে নিয়ে ছাত্রদল নেতা এম আহসান হাবীবের একটি ফেসবুক পোস্টে রাকসুর সহ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক রাকিবুল ইসলামের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়। পরে এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি পোস্ট ও জিয়া হলের সামনে অবস্থানকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়ায়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ’ নামে একটি গ্রুপে রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মারকে নিয়ে শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি এম আহসান হাবীবের একটি ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে তার বিরোধের সূত্রপাত।
ওই পোস্টে ছাত্রদল নেতা এম আহসান হাবীব লেখেন, ‘‘খুনি, ধর্ষক, চাঁদাবাজ, মববাজ, নিয়োগ বাণিজ্যকারী, অর্থ আত্মসাৎকারী কুলাঙ্গার সালাউদ্দিন আম্মারের ডিএনএ টেস্টের দাবি জানাচ্ছি। আমি নিশ্চিত সে বহু নারীকে ভয় দেখিয়ে, ফাঁদে ফেলে অথবা লোভ দেখিয়ে বহুবার ধর্ষণ করেছে। ওর হিম্মত থাকলে ও প্রমাণ করুক সে ভার্জিন।’’
এক পর্যায়ে রাকিব ও ছাত্রদল নেতা হাসিব ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যে গালিগালাজ হয়। এ সময় হাসিব রাকিবকে মারার হুমকি দেয়।
পরে রবিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত পরিবহন চত্বরে অবস্থান করেন রাকিবুল। ফেসবুকে একাধিক পোস্টে তিনি তার অবস্থানের কথা জানান। বিকেল ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে ছাত্রদল নেতা আহসান হাবীব না আসলে রাকিবুল চলে যান। পরে সন্ধ্যা ৬টায় সেখানে অবস্থান নেন আহসান হাবীব। তিনিও সামাজিক মাধ্যমে পাল্টা পোস্ট দিতে থাকেন। তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন ছাত্রদল নেতা-কর্মীর হাতে বেসবল ব্যাট দেখা যায়। তারা রাত ১০টা পর্যন্ত সেখানে অবস্থানের ঘোষণা দেন।
সন্ধ্যায় ছাত্রদল নেতা-কর্মীদের এমন অবস্থানের সমালোচনা করে শহীদ জিয়াউর রহমান হল সংসদের জিএস আরিফুল ইসলাম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘‘তারেক রহমানের সোনার ছেলেরা চাঁদাবাজি ছেড়ে দিয়ে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করছে।’’ এরপর রাতে ছাত্রদলের অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন নেতা-কর্মীরা শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে জড়ো হন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, তাদের কয়েকজনের হাতে রামদা, চাপাতি, হকি স্টিক, পাইপ ও বেসবল ব্যাটসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র ছিল। খবর পেয়ে প্রক্টর মাহবুবুর রহমান ঘটনাস্থলে গেলে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা অস্ত্রগুলো লুকিয়ে ফেলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
পরে তাদের হাতে অস্ত্র দেখতে পেয়ে দৈনিক সমকাল ও আজকের পত্রিকার বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিরা ভিডিও ধারণ করতে এগিয়ে গেলে সমকালের প্রতিনিধিকে লাঠি দিয়ে মারধর করা হয়। এ সময় আজকের পত্রিকার প্রতিনিধির মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিনিধিকেও মারধর করা হয়। পরে প্রক্টর সাংবাদিকদের হলের ভেতরে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার খবর পেয়ে অন্য সাংবাদিকেরা ঘটনাস্থলে গেলে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিনিধি নূর আহসান মৃদুল ও আগামীর সময়ের প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলামকে মারধর করা হয়। এতে জাহিদুলের মাথা ফেটে যায়। এছাড়াও অন্যান্য সাংবাদিকরা রক্ষা করার জন্য এগিয়ে আসলে তাদের হুমকি দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি এম আহসান হাবীব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম, সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম ও সহ-দপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলম অথীসহ অন্তত ১০ নেতা-কর্মীর জড়িত ছিল।
হামলার পরে সামাজিক মাধ্যমে নিজের টাইমলাইনে এক পোস্টে ছাত্রদল সহ-সভাপতি এম আহসান হাবীব দাবি করেন, কোন নিরপেক্ষ সাংবাদিকের ওপর হামলা করা হয়নি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তিকারী সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, জিয়া হলের জিএস আরিফুলকে ধরতে জিয়া হলে গেলে সংক্ষুব্ধ ছাত্রদল নেতাকর্মীদের উপর যেসব সাংবাদিক নামধারী গুপ্ত শিবির ছানা হামলা করতে এসেছে তাদেরকে প্রতিহত করা হয়েছে মাত্র।
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার এবং জড়িত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিকরা। একইসঙ্গে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ করে শাখা ছাত্রশিবির।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
হামলার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘‘আমরা ব্যর্থ, আমাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।’’
প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, হামলার আগে থেকেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে অবস্থানের অভিযোগের পরও যদি তখনই প্রশাসন ব্যবস্থা নিত, তাহলে পরবর্তী হামলার ঘটনা এড়ানো যেত কি না-এমন প্রশ্ন তুলছেন সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীরা।
ঘটনার পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে জিয়া হলে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল আলীম, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মামুনুর রশীদ। এ সময় ক্যাম্পাসে কর্মরত সাংবাদিকরা প্রশাসনের কাছে তিন দাবি তুলে ধরে রাত ২টা পর্যন্ত হল প্রাধ্যক্ষের কক্ষেই অবস্থান নেন। পরে প্রশাসনের পক্ষ সোমবার দুপুর ১২টার মধ্যে থেকে মামলা করার আশ্বাস দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল আলীম বলেন, ‘‘মামলা হয়েছে এটা নিশ্চিত। হল প্রশাসন মামলা করেছে। তবে কাদের আসামি করা হয়েছে আমি জানি না।’’
জিয়া হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘‘হামলার ঘটনায় হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। তবে মামলায় নির্দিষ্ট কোনো নাম উল্লেখ না করে কতিপয় অজ্ঞাতনামা শিক্ষার্থীকে আসামি করা হয়েছে।’’
হামলার ঘটনায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও নাম কেন আসেনি বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভিডিওতে হামলাকারীদের পরিচয় সম্পর্কে ধারণা থাকলেও প্রমাণ ছাড়া মামলায় কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের নাম উল্লেখ করা যায় না। অভিযুক্তরা ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত কি না, তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত মামলায় সংগঠনের পরিচয় দেওয়া সম্ভব নয়।
এদিকে সোমবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ব্যানারে একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মানববন্ধনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া বিকেল ৫টায় রাকসুর মানবন্ধনে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









