সার্বিক সুরক্ষার বিষয়টি ক্রমে কমে যাওয়ায় একাকিত্বের নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন দেশের এক কোটি ৬০ লাখ ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ নাগরিকের সিংহভাগই। কর্মহীন-আয়হীন ও উন্নয়নে পিছিয়ে পড়া দরিদ্র প্রবীণদের মানবেতর জীবনযাপন থেকে রক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগও যৎসামান্য। মাত্র ২৩ লাখ প্রবীণ মাসে মাত্র ৬৫০ টাকা করে বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে। তবে, তাদের আয় নিরাপত্তার উন্নয়নে আন্তঃপ্রজন্মভিত্তিক কার্যক্রমের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে রিসোর্স ইন্টিগ্রেশন সেন্টার (রিক)। উন্নয়ন সংস্থাটির নবীন-প্রবীণের আন্তঃপ্রজন্ম সংহতি সম্মিলনীতে উন্মোচিত হচ্ছে প্রবীণদের সুরক্ষা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার নতুন দিগন্ত।
জার্মান ইকনোমিক কো-অপারেশন (বিএমজেড) ও হেল্পএইজ জার্মানির সহযোগিতায় রিকের ‘ইমপ্রুভড ইনকাম সিকিউরিটি থ্রু স্ট্রেনদেনদ্ ইন্টারজেনারেশনাল গ্রুপস ফর ওল্ডার পিপল ইন বাংলাদেশ (আইএসআইজিওপি) শীর্ষক প্রকল্পটি রাজধানী ঢাকার খিলগাঁও থানা, নরসিংদীর সদর ও পলাশ উপজেলা এবং পিরোজপুর সদর উপজেলার অর্থনৈতিক-সামাজিক, স্বাস্থ্য ও নতুন নতুন উদীয়মান ঝুঁকিতে থাকা প্রবীণদের আয় নিরাপত্তার উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত, দুর্যোগ ও জলবায়ু প্রশমনে প্রবীণের অন্তর্ভুক্তি এবং উন্নয়নে পিছিয়ে পড়া প্রবীণ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিতে নবীন-প্রবীণের আন্তঃপ্রজন্ম সংহতি গড়ে তুলছে। এক্ষেত্রে ওই চার এলাকার ১২টি করে ৪৮টি আন্তঃপ্রজন্ম স্বনির্ভর ক্লাবের ৫০ জন করে দুই হাজার ৪০০ জন নবীন-প্রবীণ সদস্য প্রবীণবান্ধব সমাজ গড়ে তুলতে অনবদ্য ভূমিকা রাখছেন। নবীন-প্রবীণের এই সম্মিলিত অগ্রযাত্রায় প্রবীণের মাঝে আসছে নতুন প্রাণের স্পন্দন, সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রেরণা।
মঙ্গলবার (১৯ মে) ঢাকার মোহাম্মদপুরে ওয়াইডব্লিউসিএ মিলনায়তনে আন্তঃপ্রজন্ম নীতি-নির্ধারণী বিষয়ক জাতীয় কনসালটেশন সভায় আন্তঃপ্রজন্ম সংহতির অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন ওই ক্লাবগুলো ও বিভিন্ন এনজিওসহ সমাজের নানা স্তরের প্রতিনিধিরা। বর্তমান আর্থ-সামাজিক চ্যালেঞ্জিং প্রেক্ষাপটে নবীন-প্রবীণের সংহতিতে জোর তাগিদ দিয়ে দেশজুড়ে কমিউনিটি-ভিত্তিক আন্তঃপ্রজন্ম স্বনির্ভর ক্লাব গঠন এবং প্রবীণদের সুরক্ষায় আন্তঃপ্রজন্মভিত্তিক সম্মিলিত প্রচেষ্টার যথাযথ উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেন অংশগ্রহণকারীরা। রাষ্ট্রের কাছে প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো, বিনোদন, ডিজিটালাইজড কর্মসংস্থান, আয় বাড়ানো, পাঠাগার, বই ও পত্রিকা পাঠ, পরিবহন, আইনি ও পর্যাপ্ত আর্থিক সুবিধা, প্রবীণদের ডাটাবেজ তৈরিসহ গবেষণা ও তথ্যভান্ডার গড়ার দাবিও জানান তারা। নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে প্রবীণও যুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে তৃণমূলের প্রতিনিধিরা বলেন, সমাজের সচ্ছলদের এগিয়ে আসাসহ যৌথ পরিবারের আদলে পারিবারিক সচেতনতাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর হবে।
রিকের নির্বাহী পরিচালক আবুল হাসিব খানের সভাপতিত্বে কনসালটেশন সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) শাহ মোহাম্মদ মাহবুব। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক আবু সাঈদ খান ও উন্নয়ন সংস্থা নারীপক্ষের সদস্য অ্যাডভোকেট কামরুন নাহার। সম্মানীয় অতিথি ছিলেন নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা শিরীন হক এবং বিশেষ আলোচক ছিলেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক এম এম মাহামুদুল্লাহ। সভায় আন্তঃপ্রজন্ম নীতি-নির্ধারণী বিষয়ক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইএসআইজিওপি প্রকল্পের জাতীয় সমন্বয়কারী গবেষক তোফাজ্জল হোসেন মঞ্জু।
সভায় প্রবীণদের সুরক্ষায় আন্তঃপ্রজন্মভিত্তিক এই কার্যক্রমের অভিনবত্বের প্রশংসা করে সরকারি-বেসরকারি সব উদ্যোগকে সার্বিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুব। প্রধান অতিথির বক্তব্যে যদিও তিনি হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১৪০০ জন জনবসতির এই বাংলাদেশে সীমিত সম্পদ দিয়ে এক কোটি ৬০ লাখ প্রবীণকে সুরক্ষা দেওয়া চ্যালেঞ্জিং ও কঠিন। অতিদরিদ্রতা ও প্রয়োজন-চাহিদার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মাত্র ২৩ লাখ প্রবীণকে মাসিক ৬৫০ টাকা করে বয়স্ক ভাতা দিতে পারছে সরকার। তারপরও দেশের আট বিভাগে প্রবীণদের শান্তি নিবাস ও শিশু পরিবার পাশাপাশি রেখে প্রবীণদের পারিবারিক আবহে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাসহ সব ধরনের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাই, স্বচ্ছল প্রবীণদের এ কাজে সহায়তাসহ সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে শাহ মোহাম্মদ মাহবুব বলেন, সামাজিক সচেতনতা ও যৌথ পরিবার ধারণার বাস্তবায়নসহ এক্ষেত্রে এমন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যেন, প্রবীণদের জন্য দেশে প্রবীণ নিবাসেরই প্রয়োজন না হয়।
তবে, ‘মানুষ বেশি সম্পদ কম’- এ বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক আবু সাঈদ খান বলেন, ‘আসলে সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন নেই’। দুর্নীতি-অনিয়ম দূর করা গেলে প্রবীণদের আরও বেশি সেবা দেওয়া সম্ভব মন্তব্য করে তিনি বলেন, প্রবীণদের অভিজ্ঞতা, সৃজনশীলতা এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত থাকা কর্মক্ষমতাকে কাজে লাগাতে হবে। এর সঙ্গে তরুণদের তারুণ্য এবং প্রাণ ও কর্মচাঞ্চল্যের সমন্বয় করা গেলে শুধু প্রবীণবান্ধবই নয়, সব নাগরিকবান্ধব কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ে উঠবে।
রিকের নির্বাহী পরিচালক আবুল হাসিব খান বলেন, ‘আমরা বর্তমানে এমন আর্থ-সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বসবাস করছি, যেখানে যৌথ পরিবার ভেঙে কেবল একক পরিবারে রূপান্তরিত হচ্ছে। বর্তমানে প্রবীণদের সংখ্যা আগের চেয়ে যেমন ক্রমেই বেড়ে চলেছে, তেমনি দ্রুত নগরায়নের ফলে সবাই শহরমুখী হয়ে পড়ায় প্রবীণদের পাশে আপনজন কেউ আর থাকছে না। এ অবস্থায় আন্তঃপ্রজন্ম সম্প্রীতি এখন খুবই প্রয়োজন। প্রবীণের সুরক্ষায় সবারই দায় রয়েছে। তাই এই সময়ে প্রয়োজন নবীন-প্রবীণের আন্তঃপ্রজন্ম সংহতি। আমাদের প্রত্যাশা, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্ঠায় নতুন প্রবীণবান্ধব সমাজ গঠন হোক।’
সভা ও ওয়ার্কিং সেশনে প্রবীণ নীতি নির্ধারণী বিষয়ক অংশগ্রহণমূলক আলোচনা শেষে বিভিন্ন প্রস্তাবনা নেওয়া হয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









