দেশে বেসরকারি বিনিয়োগে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা আরও গভীর হয়েছে। একই সঙ্গে কমেছে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই)। শিল্পের উৎপাদনেও দেখা দিয়েছে সংকোচন। ফলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও উদীয়মান চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এ সেমিনারে জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হকসহ অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা অংশ নেন।
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘‘দেশের অর্থনীতি এখনো উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, জ্বালানি সংকট ও সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এসব সমস্যা বিচ্ছিন্নভাবে মোকাবিলা না করে সমন্বিত নীতিকাঠামোর আওতায় সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।’’
তিনি বলেন, ‘‘অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি ও শিল্পনীতিকে একই লক্ষ্য সামনে রেখে পরিচালনা করা প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি কঠোর করছে, তখন সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব আহরণেও কার্যকর পদক্ষেপ থাকতে হবে।’’
রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে শুধু করহার বাড়ানোর ওপর নির্ভর না করার পরামর্শ দেন তিনি। উৎপাদন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর পাশাপাশি করজাল সম্প্রসারণ, রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় ডিজিটালাইজেশন এবং কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন উপদেষ্টা।
জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে ড. তিতুমীর বলেন, ‘‘বর্তমান সংকটের দায় বর্তমান সরকারের নয়। আগের সরকারের সময়ে জ্বালানি খাত ঋণ ও আর্থিক চাপের মধ্যে পড়ায় এর প্রভাব এখনো বহন করতে হচ্ছে। অর্থনীতির এই চাপ সামাল দিতে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সরকার।’’
শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য উল্লেখ করে তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেন। পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
পে-স্কেল প্রসঙ্গে তিতুমীর বলেন, ‘‘২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ১০৪ শতাংশ বাড়লেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পে-স্কেল একই অনুপাতে বাড়েনি। নতুন পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে সরকারের বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এ ব্যয়ের অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছরে এনবিআর আদায় করেছিল ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে এবার লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। তবে অর্থনীতির মন্থর গতি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, শিল্প উৎপাদনে বাধা এবং আমদানি কমে যাওয়ায় এই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে বলে মনে করছেন এনবিআর কর্মকর্তারা।’’
সিপিডির ফেলো ড. ফাহমিদা বলেছেন, ‘‘বিনিয়োগ না বাড়লে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব নয়। বিনিয়োগের মন্দাভাব এরই মধ্যে কর্মসংস্থান ও মানুষের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’’
সিপিডির এ ফেলো বললেন, ‘‘গত এক দশকে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৩-২৪ শতাংশের মধ্যে আটকে ছিল। ২০২৬ অর্থবছরে তা আরও কমে ২২ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। বিনিয়োগের এই দুর্বলতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহেও।’’
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে ৪ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিনিয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ না থাকা এবং ব্যবসায়িক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় উদ্যোক্তারা ঋণ নিয়ে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। শুধু দেশীয় বিনিয়োগ নয়, বৈদেশিক বিনিয়োগের চিত্রও উদ্বেগজনক বলে জানান এই অর্থনীতিবিদ।
তার মতে, ২০২৬ অর্থবছরে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রায় ১৫ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও কমেছে। এসব সূচক দেশে নতুন শিল্প স্থাপন ও বিদ্যমান শিল্পে সম্প্রসারণের দুর্বলতাকেই নির্দেশ করছে।
বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরেন ড. ফাহমিদা খাতুন। এর মধ্যে অন্যতম জ্বালানিসংকট। গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারছে না। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাকেও বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে পৌঁছেছে। এর সঙ্গে সুশাসনের ঘাটতি যুক্ত হয়ে উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন পাওয়ার পরিবেশকে আরও কঠিন করে তুলছে। অন্যদিকে উচ্চ সুদের হার, দুর্বল অবকাঠামো ও দুর্নীতির কারণে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে। বর্তমানে নীতিসুদ ৯ দশমিক ৫ শতাংশ হওয়ায় ঋণের ব্যয়ও উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চাপ তৈরি করছে।
ড. ফাহমিদা খাতুনের বক্তব্যে উঠে আসে, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে শিল্প উৎপাদন শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। শিল্প খাতে এই সংকোচন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান— দুই ক্ষেত্রেই ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেছেন, বিনিয়োগের বর্তমান মন্দাভাব অব্যাহত থাকলে কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় আরও চাপে পড়তে পারে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই করতে হলে দ্রুত বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা জরুরি। বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতির জন্য গভীর সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন ড. ফাহমিদা। বিশেষ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের পাশাপাশি জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি।
তার মতে, অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে। তবে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে এখনই কার্যকর সংস্কার শুরু করা প্রয়োজন। কারণ বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও আয়—কোনোটিতেই টেকসই গতি ফিরবে না।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে নীতিগত ধারাবাহিকতা, জবাবদিহি ও আর্থিক খাতের সংস্কার প্রয়োজন। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করা গেলে অর্থনীতিতে নতুন গতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









