বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় শ্রমজীবী মানুষের অবদান অনস্বীকার্য হলেও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে তাদের অংশগ্রহণ এখনো প্রান্তিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। মে দিবসের চেতনা কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে, শ্রমিকের মর্যাদা, ন্যায্য অধিকার এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও শ্রমিক নেতারা।
রবিবার (১০ মে) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) আয়োজিত মহান মে দিবস ২০২৬-এর স্মারক বক্তৃতা অনুষ্ঠানে এসব কথা উঠে আসে।
‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণ ও প্রত্যাশা” শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিলস চেয়ারম্যান মো. মজিবুর রহমান ভুঞাঁ।
অনুষ্ঠানে স্মারক বক্তৃতায় বিশিষ্ট লেখক ও প্রাবন্ধিক আবুল মোমেন বলেন, “বর্তমানে লুটপাটের মাধ্যমে বিত্তবানদের ঊর্ধমুখী শ্রেণি-উত্তরণের পথ সুগম হয়েছে। একদিকে অর্থনীতির বিকাশ ঘটছে, অন্যদিকে সমাজে মানবিক বিকাশের ক্ষেত্রে ধস নেমেছে। শ্রমজীবী মানুষের ওপর ধর্মের নামে অন্ধ বিশ্বাস ও প্রথা-সর্বস্ব সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “শ্রমিকদের যদি কেবল যান্ত্রিকভাবে ব্যবহার করা হয় এবং তাদের চিত্তবিনোদন ও সৃজনশীল বিকাশের সুযোগ না দেওয়া হয়, তবে তাদের সংগ্রামী শক্তি টেকসই হয় না। মেহনতি মানুষের সহজাত বিকাশের পথ খুলে দিলেই তারা অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে আপস না করে টিকে থাকতে পারবে।”
উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও কৃষি মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা এবং বিলস মহাসচিব নজরুল ইসলাম খান মে দিবসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে বলেন, “১৮৮৬ সালের সেই আন্দোলন সফল হয়েছিল ভিন্ন ভাষা ও পেশার মানুষের সুদৃঢ় ঐক্যের কারণে। মে দিবস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, ন্যায্য দাবি আদায়ে সংহতির কোনো বিকল্প নেই।”
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহমান তরফদার এবং অন্যান্য আলোচকরা বর্তমান বিশ্ববাজারের চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেন।
অটোমেশন ও প্রযুক্তি: প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা ও অটোমেশনের ফলে শ্রমিকরা যে ঝুঁকির মুখে পড়ছে, তা মোকাবিলায় সময়োপযোগী শ্রমনীতি প্রয়োজন।
সামাজিক সুরক্ষা: অনানুষ্ঠানিক খাতের বিশাল শ্রমিক গোষ্ঠীকে শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের আওতায় আনতে হবে।
নীতি নির্ধারণে অংশগ্রহণ: রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক পরিবর্তন ও গণআন্দোলনে শ্রমিকদের ভূমিকা থাকলেও পরবর্তীকালে তাদের প্রত্যাশা উপেক্ষিত থাকে। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
স্বাগত বক্তব্যে বিলস নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহম্মদ শ্রমিকদের কণ্ঠস্বরকে জাতীয় নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানান।
অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন অর্থনীতিবিদ ড. অনন্য রায়হান, অধ্যাপক ড. মেজবাহ কামাল, অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ এবং বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ।
অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে বক্তারা একমত হন যে, শ্রমজীবী মানুষের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, বৈষম্যহীন সুরক্ষা এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকার, মালিকপক্ষ ও নাগরিক সমাজের একটি সমন্বিত ও আন্তরিক উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









