বরিশাল বিভাগে হঠাৎ করেই জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে হাম ও হামের উপসর্গ। গত পাঁচ মাসে পুরো বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে সাড়ে সাত হাজারেরও বেশি শিশু এই রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়েছে। এর মধ্যে চিকিৎসারত অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছে ৪৮টি শিশু। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসকরা নিরলস চেষ্টা করে গেলেও সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) তীব্র সংকটের কারণে মৃত্যুর মিছিল ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
রবিবার (৩১ মে) দুপুরে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. লোকমান হাকিম এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়ে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ৭ হাজার ৬৫২ শিশু। এর মধ্যে ৭ হাজার ২৬১ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে এবং পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হওয়া ২২৫ জন শিশু চিকিৎসা নিয়েছে।
এই সময়ের মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৬ হাজার ৬৫৭ শিশু। তবে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, হামের উপসর্গে ৪৫ জন এবং হামে আক্রান্ত হয়ে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৮ জনে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়া, টিকা না নেওয়া এবং বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি মারাত্মক রূপ নিচ্ছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়েছে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। গত পাঁচ মাসে হাসপাতালটিতে হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ২ হাজার ৮৪২ শিশু। এর মধ্যে ৩৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা বিভাগের মোট মৃত্যুর বড় অংশ।
রোগীর সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পটুয়াখালী জেলা। সেখানে ১ হাজার ৭৩৩ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। অন্যদিকে ভোলার বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছে ৬১৮ শিশু। জেলাটিতে হামের উপসর্গে ৭ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টাতেও নতুন রোগী ভর্তি হওয়ার ধারা অব্যাহত রয়েছে। বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১৬১ জন শিশু হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৪২ জন।
সার্বিক পরিস্থিতি ও সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. লোকমান হাকিম বলেন, আমাদের হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ (ICU) সংকটের কারণে জটিল রোগীদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে একদম শেষ মুহূর্তে শিশুদের যখন হাসপাতালে আনা হয়, তখন আইসিইউ সাপোর্ট ছাড়া তাদের ফেরানো অসম্ভব হয়ে পড়ে।
তিনি আরও যোগ করেন, আমরা আমাদের সাধ্যমতো সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে যাচ্ছি। তবে এই সংকট থেকে বাঁচতে অভিভাবকদের সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।
হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং বায়ুবাহিত রোগ হওয়ায় দ্রুত এক শিশু থেকে অন্য শিশুতে ছড়ায়। চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের যথাসময়ে ইপিআই (EPI) কর্মসূচির হামের টিকা দেওয়া নিশ্চিত করতে হবে। শিশুর শরীরে তীব্র জ্বর, চোখ লাল হওয়া, সর্দি এবং লালচে দানা বা র্যাশ দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি না করে নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা হাসপাতালে নিয়ে আসার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









