বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রমবর্ধমান মূল্য এবং দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অধিক গুরুত্ব ও বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে এখনই নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বিকল্প নেই।
বুধবার (৩ জুন) সকালে বরিশাল প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত “বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি: প্রাক-বাজেট সংবাদ সম্মেলন”-এ বক্তারা এসব কথা বলেন। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সামনে রেখে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়।
প্রতিবেশ উন্নয়ন ফোরাম বরিশালের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট সুভাষ দাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সংবাদ সম্মেলনের যৌথ আয়োজক ছিল প্রান্তজন, ফোরাম অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-বরিশাল (এফইডি-বরিশাল), কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্ক (ক্লিন) এবং বাংলাদেশ ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ইকোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিডব্লিউজিইডি)।
বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও কয়লার মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। একই সঙ্গে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি ও ক্যাপাসিটি পেমেন্ট জাতীয় অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিবেশ উন্নয়ন ফোরামের সদস্য শুভঙ্কর চক্রবর্তী বলেন, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতি প্রমাণ করেছে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা কোনো দেশের জন্য স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। নিজস্ব সম্পদ, প্রযুক্তি ও সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার ঘটানোই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই পথ।
সংগঠনের সদস্য মো. আমিনুর রহমান খোকন বলেন, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান এখনও অত্যন্ত সীমিত। অথচ রুফটপ সোলার, সোলার ইরিগেশন, এগ্রিভোল্টাইকস, ফ্লোটোভোল্টাইকস এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার মতো উদ্যোগগুলো একদিকে যেমন জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে পারে, অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পরিবেশ সুরক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা আগামী জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি সোলার প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর আরোপিত কর ও শুল্ক প্রত্যাহার, সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা চালু এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সময়োপযোগী ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানান।
সংগঠনের সদস্য আকতারুল কবির বলেন, নতুন কয়লা, তেল ও এলএনজিনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগ কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের আধুনিকায়ন, নেট মিটারিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং শিল্প খাতে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
বক্তারা আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার শুধু জ্বালানি খাতের উন্নয়ন নয়, বরং জলবায়ু সহনশীল অর্থনীতি গঠনেরও অন্যতম পূর্বশর্ত। তাই জাতীয় বাজেটে এ খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
সমাপনী বক্তব্যে অ্যাডভোকেট সুভাষ দাস বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে হবে। একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও টেকসই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবুজ জ্বালানির কোনো বিকল্প নেই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









