প্রায় ১০ লাখ মানুষের বসবাস সিলেট নগরীতে। আবাসিক, রেস্তোরাঁ ও মেডিকেল বর্জ্য মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ টন বর্জ্য উৎপাদন হয় এ নগরে। এসব বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করতে দেশের প্রথম ‘ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি’ (এমআরএফ) প্ল্যান্ট স্থাপন করেছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হলেও এর অন্ধকার দিকটি এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগের অভাব, তীব্র দুর্গন্ধ এবং প্ল্যান্ট থেকে নির্গত বিষাক্ত কালো তরলে বিপন্ন হচ্ছে দক্ষিণ সুরমার লালমাটিয়া ও পারাইরচক এলাকার পরিবেশ। যার প্রভাব পড়ছে ওই এলাকার চাষাবাদ ও মৎস্য সম্পদে।
পরিবেশবাদীদের মতে, দেশের প্রথম ম্যাটেরিয়াল রিকভারি প্ল্যান্ট হিসেবে সিসিকের এ উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও, পরিবেশ সুরক্ষার অংশগুলো যেমন লিচেড ট্রিটমেন্ট ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত বাস্তবায়ন করা না গেলে এটি সিলেটের পরিবেশের জন্য একটি স্থায়ী ‘টাইম বোম’ এ পরিণত হতে পারে। ১৬ কোটির প্ল্যান্ট, তবুও কমছে না বর্জ্যের পাহাড়: পরিবেশবান্ধব উপায়ে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং ডাম্পিং স্টেশনের ওপর চাপ কমাতে সিসিক ও লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ যৌথভাবে দক্ষিণ সুরমার লালমাটিয়া ডাম্পিং গ্রাউন্ডে প্রায় ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এ অত্যাধুনিক বর্জ্য পৃথকীকরণ প্ল্যান্ট স্থাপন করে। ২০২৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় এবং গত বছরের মাঝামাঝি থেকে পুরোদমে কাজ শুরু হয়।
জানা গেছে, প্রতিদিন তিন শিফটে ৯ জন ড্রাইভার, ৪ জন সুপারভাইজার এবং ২০-২৫ জন শ্রমিক এখানে কাজ করছেন। তেল, বিদ্যুৎ ও বেতনসহ প্রতি মাসে খরচ হচ্ছে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ লাখ টাকা। প্রতিদিন প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ টন বর্জ্য এখানে পৃথকীকরণ করা হচ্ছে। সিসিকের প্রধান বর্জ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবদীন জানান, শহরে প্রতিদিন উৎপন্ন ৪৭৫ থেকে ৫০০ টন বর্জ্যের মধ্যে আমরা ৩০০ টনের বেশি পরিবহন করি। বাকি বর্জ্য ভাঙারি চ্যানেল বা ড্রেন-খালের মাধ্যমে অপসারিত হয়।
প্লাস্টিক বাদে বাকি বর্জ্য জমছে ভেতরেই: চুক্তি অনুযায়ী, প্ল্যান্টে প্রক্রিয়াজাত করা বর্জ্য থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৭০ টন পলিথিন ও প্লাস্টিক আলাদা করা হয়। এ বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য কারিগরি সহযোগিতা দেওয়ার বিনিময়ে লাফার্জ হোলসিম বাংলাদেশ নিজ খরচে সুনামগঞ্জের ছাতকে তাদের সিমেন্ট কারখানায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য নিয়ে যায়। তবে মূল সংকট তৈরি হচ্ছে প্লাস্টিক বাদে অবশিষ্ট বিপুল পরিমাণ বর্জ্য নিয়ে। সিসিকের জনবল ও জায়গার অভাবে এ বর্জ্যগুলো আলাদা করে বাণিজ্যিক বিট বানিয়ে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রক্রিয়াজাতকরণের পর বাকি অংশ ডাম্পিং স্টেশনের ভেতরেই স্তূপ আকারে রাখা হচ্ছে। সেখানে আবার নতুন করে অপ্রক্রিয়াজাত বর্জ্যও ফেলা হচ্ছে। ফলে বর্জ্যের পাহাড় প্রতিদিন বড় হচ্ছে। ফলে প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
বর্জ্যের বিষাক্ত তরলে চাষাবাদ ও মৎস্য সম্পদের ক্ষতি: সরেজমিন দেখা গেছে, ডাম্পিং স্টেশনের বিশাল এলাকাজুড়ে খোলা আকাশের নিচে ময়লার স্তূপ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, যার ফলে পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দম বন্ধ করে চলাচল করতে হয়। আরো মারাত্মক রূপ নিয়েছে বর্জ্য থেকে নির্গত কালো বিষাক্ত তরল (লিচেড)। এ কেমিক্যালযুক্ত পানি ড্রেনের মাধ্যমে আশপাশের নিচু জমি, খাল ও বিলে মিশে যাচ্ছে।
পারাইরচক এলাকার একাধিক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বৃষ্টির সময় ডাম্পিং স্টেশনের বিষাক্ত পানি জমিতে ঢুকে ধানের চারা নষ্ট করে দিচ্ছে। জমির উর্বরতা হারিয়ে এখন আর কোনো ফসল হচ্ছে না। এমনকি আগের মতো খাল-বিলে মাছও পাওয়া যাচ্ছে না। ফসলি জমিগুলো এখন বড় বড় ঘাসে পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছে। যদিও সিসিক কর্মকর্তাদের দাবি, বর্জ্যের তরল পানি নিয়মিত বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। অতিবৃষ্টি বা বন্যার কারণে সাময়িকভাবে পানি বাইরে গেলেও পরে বাঁধ দিয়ে তা আটকানো হয়েছে।
বর্জ্যের পাহাড় ও বিষাক্ত পানির স্থায়ী সমাধান নিয়ে জানতে চাইলে প্রধান বর্জ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবদীন স্বীকার করেন, এখানে একটি ‘লিচেড ম্যানেজমেন্ট’ (তরল বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা) থাকা উচিত ছিল, যা গত ১৫-২০ বছরে করা হয়নি। একদিনে সব পরিবর্তন সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং একটি চীনা কোম্পানির সঙ্গে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়ে আলোচনা করছি। এছাড়া ‘বায়োমাইনিং’ প্রযুক্তির মাধ্যমে ২০-৩০ বছরের পুরোনো ময়লা প্রসেস করা সম্ভব, তবে এতে বিপুল অর্থ ও শ্রমের প্রয়োজন। পর্যাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার ও টেকনিক্যাল স্টাফ নিয়োগ করতেও কিছু সময় লাগবে।
প্রসঙ্গত, বর্জ্যের এই ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে ২০২২ সালেই সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব তৎকালীন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে ডাম্পিং স্টেশনটি দ্রুত স্থানান্তরের জন্য চিঠি দিয়েছিলেন। কিন্তু চার বছর পেরিয়ে গেলেও স্থানান্তরের কোনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা) সিলেট এর বিভাগীয় সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট শাহ শাহেদা আখতার এদিনকে বলেন, ‘পরিবেশ সুরক্ষার মৌলিক বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করে কোনো প্রকল্পই সফল হতে পারে না। বর্জ্য থেকে প্লাস্টিক আলাদা করা হলেও বাকি বিশাল অংশের সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকা এবং বর্জ্যের বিষাক্ত তরল (লিচেড) উন্মুক্ত স্থানে ছড়িয়ে পড়া অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। এই লিচেড বা বিষাক্ত কেমিক্যালযুক্ত পানি আশপাশের ফসলি জমি ও জলাশয়ে মিশে একদিকে যেমন মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে, অন্যদিকে মৎস্য সম্পদ ধ্বংসের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি করছে। এটি স্থানীয় মানুষের জীবন ও জীবিকাকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









