চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ স্থলবন্দরে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২৮২ কোটি ২০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা কম রাজস্ব আদায় হয়েছে।
একই সঙ্গে আগের অর্থবছরের তুলনায়ও রাজস্ব আদায় কমেছে প্রায় ৮৯ কোটি ৭৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা, যা বন্দরের সামগ্রিক বাণিজ্য কার্যক্রমে স্থবিরতারই প্রতিফলন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সোনামসজিদ স্থলবন্দর কাস্টমস কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ১০১ কোটি ৮৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। এর বিপরীতে আদায় হয়েছে ৮১৯ কোটি ৬৯ লাখ ২৩ হাজার ৮৫৮ টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৮২ কোটি ২০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা ঘাটতি হয়েছে, যা শতকরা হিসাবে প্রায় ২৫.৬১ শতাংশ কম।
অন্যদিকে, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে এ বন্দরে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৯০৯ কোটি ৪৬ লাখ ১ হাজার ১২৬ টাকা। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায় কমেছে ৮৯ কোটি ৭৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ৯.৮৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, অর্থবছরের শুরু থেকেই অধিকাংশ মাসে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়নি। জুলাই ২০২৫ মাসে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৩ কোটি ৯৮ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। আদায় হয়েছে ৫৬ কোটি ৯৮ লাখ ৭৬ হাজার ৪০০ টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ কম**। এ মাসে ঘাটতি ছিল ১৬ কোটি ৯৯ লাখ ৭৯ হাজার টাকা।
আগস্ট ২০২৫ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৬ কোটি ১১ লাখ ৩১ হাজার টাকা। আদায় হয়েছে ৫৩ কোটি ৭৯ লাখ ১ হাজার ৭৩০ টাকা, যা প্রায় ২৯.৩ শতাংশ কম। ঘাটতি দাঁড়ায় ২২ কোটি ৩২ লাখ ২৯ হাজার টাকা।
সেপ্টেম্বর ২০২৫ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭১ কোটি ২১ লাখ ১৪ হাজার টাকা। আদায় হয় ৭০ কোটি ১৪ লাখ ৮৩ হাজার ৫১০ টাকা। এ মাসে ঘাটতি ছিল ১ কোটি ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা, যা প্রায় ১.৫ শতাংশ।
অক্টোবর ২০২৫ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯৬ কোটি ২৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা। আদায় হয়েছে ৭৫ কোটি ৮৯ লাখ ১৬ হাজার ২৭০ টাকা, যা প্রায় ২১.২ শতাংশ কম। ঘাটতি ছিল ২০ কোটি ৩৬ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
নভেম্বর ২০২৫ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১০৩ কোটি ৩৬ লাখ ৮০ হাজার টাকা। আদায় হয়েছে ৭৪ কোটি ২৯ লাখ ৯ হাজার ৯৪০ টাকা, যা প্রায় ২৮.০১ শতাংশ কম। ঘাটতি ছিল ২৯ কোটি ৭ লাখ ৭০০ টাকা।
ডিসেম্বর ২০২৫ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১৪ কোটি ৭৬ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। আদায় হয়েছে ৭৯ কোটি ৭ লাখ ২৬ হাজার ৮৯০ টাকা, যা প্রায় ৩১.০১ শতাংশ কম। এ মাসে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩৫ কোটি ৬৯ লাখ ১৮ হাজার টাকা।
জানুয়ারি ২০২৬ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১৯ কোটি ৭২ লাখ ৩ হাজার টাকা। আদায় হয়েছে ৯৪ কোটি ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৫৯০ টাকা, যা প্রায় ২১.৫ শতাংশ কম। ঘাটতি ছিল ২৫ কোটি ৬৮ লাখ ২৬ হাজার টাকা।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯৫ কোটি ১৪ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। আদায় হয়েছে ৭৩ কোটি ৫৩ লাখ ১২ হাজার টাকা, যা প্রায় ২২.৭ শতাংশ কম। ঘাটতি ছিল ২১ কোটি ৬১ লাখ ৪১ হাজার টাকা।
মার্চ ২০২৬ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১৪ কোটি ৯১ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। আদায় হয়েছে ৬৩ কোটি ১৯ লাখ ১১ হাজার ৯৬০ টাকা, যা প্রায় ৪৫ শতাংশ কম। এ মাসেই সবচেয়ে বেশি ৫১ কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার টাকা রাজস্ব ঘাটতি হয়।
এপ্রিল ২০২৬ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৮ কোটি ৬৬ লাখ ২০ হাজার টাকা। আদায় হয়েছে ৬৮ কোটি ৬৬ লাখ ১৬ হাজার ৬১৩ টাকা (প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী প্রায় ০.৫ শতাংশ কম)। এ মাসে ঘাটতি ছিল মাত্র ৩ হাজার ৩৮৭ টাকা।
মে ২০২৬ মাসে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯৭ কোটি ৬২ লাখ ৩৮ হাজার টাকা, কিন্তু আদায় হয় মাত্র ৩৯ কোটি ৬৪ লাখ ৭১ হাজার ৮০০ টাকা, যা প্রায় ৫৯.৪ শতাংশ কম। এ মাসে ঘাটতি ছিল ৫৭ কোটি ৯৭ লাখ ৬৬ হাজার টাকা।
জুন ২০২৬ মাসে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭০ কোটি ১৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা। আদায় হয়েছে ৭০ কোটি ১৩ লাখ ২৯ হাজার ৫২৯ টাকা। এ মাসে ঘাটতি ছিল মাত্র ৪৭১ টাকা, ফলে বছরের শেষ মাসে প্রায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হলেও সার্বিক ঘাটতি আর পুষিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
সোনামসজিদ স্থলবন্দর সি অ্যান্ড এফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদ্য নির্বাচিত সভাপতি মোবিনুল ইসলাম (মোবিন মিয়া) বলেন, ‘‘আমদানি কমে যাওয়াই রাজস্ব ঘাটতির অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আমদানির ব্যয় দেশের অন্যান্য স্থলবন্দরের তুলনায় বেশি হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী বিকল্প বন্দর ব্যবহার করছেন।’’
সংগঠনটির সদ্য নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন বলেন, ‘‘৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহযোগিতা পাচ্ছেন না। ফলে আমদানি কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পাশাপাশি সোনামসজিদে পূর্ণাঙ্গ কাস্টমস অফিস না থাকায় প্রয়োজনীয় নথিপত্রের জন্য ব্যবসায়ীদের বারবার রাজশাহীতে যেতে হচ্ছে, যা সময় ও ব্যয় দুটিই বাড়িয়ে দিচ্ছে।’’
পানামা পোর্টের ম্যানেজার মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘‘বর্তমানে এ বন্দর দিয়ে আমদানি হওয়া পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই পাথর। আগে যে পরিমাণ ফল আমদানি হতো, এখন তা প্রায় বন্ধ। এছাড়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং প্রশাসনের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগের অভাবের কারণে পাথর ছাড়া অন্য পণ্যের আমদানি বাড়ছে না। ফলে রাজস্ব আয়ও ধারাবাহিকভাবে কমছে।’’
এ বিষয়ে সোনামসজিদ স্থলবন্দরের সহকারী কমিশনার মো. সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘‘ফলসহ ইমিটেশন ফেব্রিকসসহ কমার্শিয়াল গুডস আমদানি বন্ধ থাকায় চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি হয়েছে। তবে খুব শিগগিরই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে আমদানি-বাণিজ্য সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের রাজস্ব ঘাটতি আর না থাকে।’’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









