নগরবাসীর ওপর নতুন কোনো করের বোঝা না চাপিয়ে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ৬৪৭ কোটি ৫৩ লাখ ৮৫ হাজার ৩০৯ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেছে বরিশাল সিটি করপোরেশন (বিসিসি)। এবারের বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, নিরাপদ পানি সরবরাহ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, নারী ও শিশু কল্যাণ এবং ডিজিটাল নাগরিকসেবাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) নগর ভবনে আয়োজিত বাজেট ঘোষণা অনুষ্ঠানে বিসিসির প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বাজেট উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, সীমিত রাজস্ব আয় সত্ত্বেও নাগরিক সেবার পরিধি আরও বাড়ানোর লক্ষ্যেই কর বৃদ্ধি ছাড়া এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। একটি পরিচ্ছন্ন, পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব, নারী ও শিশুবান্ধব এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট বরিশাল গড়ে তোলাই এই বাজেটের মূল দর্শন।
তিনি জানান, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের মূল বাজেট ছিল ৫২০ কোটি ৮৬ লাখ ১৬ হাজার ৯২৮ টাকা। বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায় শেষে সংশোধিত বাজেট দাঁড়িয়েছে ৪৬২ কোটি ৮৬ লাখ ২২ হাজার ৮৩৭ টাকায়। নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে বাস্তব চাহিদা, চলমান উন্নয়নকাজ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বরিশাল নগরীর দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা দূর করতে বড় পরিসরের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সিটি করপোরেশন। জেলখাল, আমানতগঞ্জ, সাগরদী ও লাকুটিয়া খাল পুনঃখনন এবং খালের তীর সংরক্ষণের জন্য ৭৬৯ কোটি ৪০ লাখ টাকার প্রকল্প ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি কীর্তনখোলা নদীর পশ্চিম তীরে শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণে ৫৩৩ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্পও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই দুটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নগরীর জলাবদ্ধতা, নদীভাঙন ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের দীর্ঘদিনের সংকট অনেকটাই দূর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নগরবাসীর বিশুদ্ধ পানির চাহিদা পূরণে রূপাতলী সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ইতোমধ্যে উৎপাদনে এসেছে। বেলতলা ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট চালুর প্রস্তুতিও শেষ পর্যায়ে। ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় কীর্তনখোলা সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণের জন্য নতুন উন্নয়ন প্রকল্পও প্রস্তুত করা হয়েছে।
একই সঙ্গে পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে। গত অর্থবছরে এক হাজার ৬৪টি নতুন সংযোগ দেওয়া হয়েছে। নাগরিক সেবাকে আরও সহজ করতে নতুন পানির সংযোগের আবেদন, ফি পরিশোধ ও অনুমোদন সম্পূর্ণ অনলাইনে নিয়ে আসা হয়েছে। আগামী অর্থবছরে নগরীর বিভিন্ন স্থানে আধুনিক ‘ওয়াটার এটিএম’ বুথ স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রতিদিন প্রায় ২০০ টন বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ করছে বরিশাল সিটি করপোরেশন। এই ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হয়েছে। এর আওতায় ভবিষ্যতে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে নতুন ডাম্প ট্রাক, মেডিকেল বর্জ্য পরিবহনের জন্য বিশেষ কম্প্যাক্টর ট্রাক এবং ভ্যাকুয়াম ট্রাক সংগ্রহ করা হয়েছে। গত ঈদুল আজহায় মাত্র ছয় ঘণ্টার মধ্যে কোরবানির বর্জ্য অপসারণের বিষয়টিও সিটি করপোরেশনের সক্ষমতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
নারীদের জন্য আধুনিক পাবলিক টয়লেট, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ মার্কেট, অসচ্ছল নারীদের আইনি সহায়তা এবং কর্মজীবী নারীদের জন্য হোস্টেল নির্মাণের উদ্যোগ রাখা হয়েছে বাজেটে।
শিশুদের জন্য গ্রীন সিটি পার্ক আধুনিকায়ন, নতুন বিনোদন রাইড স্থাপন, খেলাধুলার সরঞ্জাম ক্রয় এবং বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজনেও বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আগামী অর্থবছরে ৫০ হাজার বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পার্ক উন্নয়ন, নতুন ফোয়ারা নির্মাণ, দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা এবং "সবার আগে বাংলাদেশ" শীর্ষক মানচিত্রভিত্তিক ভাস্কর্য নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
ডিজিটাল সেবার পরিধি বাড়িয়ে কর পরিশোধ, ট্রেড লাইসেন্স, ভবনের নকশা অনুমোদন, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা অনলাইনে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে নাগরিক হয়রানি কমবে এবং সেবার গতি বাড়বে বলে আশা করছে সিটি করপোরেশন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর ৪২ কিলোমিটার বিটুমিনাস কার্পেটিং সড়ক, ৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার আরসিসি সড়ক, ৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার সিসি সড়ক এবং ১৬ দশমিক ৫ কিলোমিটার আরসিসি ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে বলে বাজেটে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া প্রায় ২৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকার আলোকায়ন প্রকল্প অনুমোদিত হলে নগরজুড়ে ১৬ হাজারের বেশি বৈদ্যুতিক খুঁটি এবং ২০ হাজারের বেশি আধুনিক এলইডি সড়কবাতি স্থাপন করা হবে।
গত অর্থবছরে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ১০ হাজার ৪৭৯ জন নারী ও শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। হাম-রুবেলা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন ৪৩ হাজার ৮৫০ জন এবং ভিটামিন-এ প্লাস ক্যাম্পেইনে অংশ নিয়েছে ৫৮ হাজার ৫৫৭ শিশু।
আগামী অর্থবছর থেকে নগরীর তিনটি জোনে নারী ও শিশুদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।
সাংবাদিকদের পেশাগত কর্মকাণ্ডের পরিবেশ উন্নয়নে বরিশাল প্রেসক্লাব ও বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির ভবন সংস্কারের জন্যও এবারের বাজেটে পৃথক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাজেট বক্তব্যের শেষাংশে প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, দুর্নীতি ও অপচয় রোধ করে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। কর বৃদ্ধি ছাড়াই নাগরিকদের আরও উন্নত, দ্রুত ও আধুনিক সেবা পৌঁছে দেওয়াই আমাদের অঙ্গীকার। নগরবাসী, গণমাধ্যম, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতায় একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ, বাসযোগ্য ও স্মার্ট বরিশাল গড়ে তুলতে চাই।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









