পাকিস্তানপন্থী শক্তি ধারাবাহিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও জাতীয় চেতনার প্রতীকগুলোর ওপর হামলা চালাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও লেখক এবং অগ্রদূত সম্পাদক আবু সাইদ খান। তিনি বলেছেন, ‘১৯৭১ সালের পরাজিত শক্তির পুনরুত্থান ঠেকাতে সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, নাগরিক সমাজ ও ছাত্র-জনতাকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।’
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) দুপুর ১টায় ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের ভাংচুর হওয়া ভাস্কর্য পরিদর্শন ও শ্রদ্ধা নিবেদন উপলক্ষে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে দুপুরে ঢাকা থেকে আসা ছয় সদস্যের নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি দল ঝিনাইদহ বাস টার্মিনালসংলগ্ন চত্বরে এসে পৌঁছায়। ভাস্কর্য পরিদর্শন শেষে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তারা। পরে প্রতিনিধি দলটি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এসময় ভাস্কর্যটি পূর্বের স্থানে পুনঃনির্মাণ, ভাংচুরের সাথে জড়িত অপরাধীদের চিহ্নিত করে শাস্তি এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও জাতীয় বীরদের সম্মান রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানান তারা।
সমাবেশে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সাঈদ খান বলেন, ‘এর আগে মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স ও স্মৃতিসৌধেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও জাতীয় বীরদের ভাস্কর্যে হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত সব স্মৃতিস্তম্ভ ও ভাস্কর্য পুনর্নির্মাণ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অস্তিত্ব, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার ধারাবাহিকতায় জুলাইয়ের অভ্যুত্থান ঘটেছে। তাই মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাইকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তবে কোনো কিছুই মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনীয় নয়।’
সমাবেশে আবু সাঈদ খান আরও বলেন, ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য জাতীয় সংহতি এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসের প্রতীক। এটি ধ্বংস করার মাধ্যমে ইতিহাস ও জাতীয় চেতনাকেই আঘাত করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘শুধু হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য নয়, মুজিবনগর স্মৃতিসৌধসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধ, ভাস্কর্য ও স্মৃতিফলক পুনর্নির্মাণ করতে হবে।’ একই সঙ্গে সরকারের ‘জুলাই জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ের স্মৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের স্মারকগুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে সংরক্ষণ করতে হবে।’
ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের পরিচয় প্রকাশ এবং তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে আবু সাঈদ খান বলেন, ‘যারা এই অপকর্ম করেছে, তাদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং জনসমক্ষে তাদের নাম প্রকাশ করতে হবে।’
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান আরও বলেন বলেন, ‘দেশটা আমাদের সবার। সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, নাগরিক সমাজ ও ছাত্র-জনতাকে সম্মিলিতভাবে ৭১-এর পরাজিত শক্তির উত্থান মোকাবিলা করতে হবে। বাংলাদেশের মাটিতে কোনো অপশক্তির স্থান হতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সমুন্নত রাখা এবং সব অপরাধের বিচার নিশ্চিত করাই আমাদের দায়িত্ব।’
সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি মানবাধিকার কমিশনের সাবেক কমিশনার ও গুম কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান লিটন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ফারাহ তানজীম তিতিল প্রমুখ।
মানবাধিকার কমিশনের সাবেক কমিশনার ও গুম কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান লিটন বলেন, ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য উপড়ে ফেলা হয়েছে দুঃখজনক হচ্ছে প্রশাসনের কেউই এ ব্যাপারে জানেন না। এই যে আমার মুক্তিযুদ্ধের যে অস্তিত্ব, আমার দেশের অস্তিত্ব, হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য, আমার প্রাণের অস্তিত্ব। যারা এ ধরনের কাজ করেছে তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের না। এদেশের বিরোধী শক্তি, সে উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী কে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। এবং এ ভাস্কর্য পুনঃনির্মান করতে হবে। আরও সুন্দরভাবে এবং এখানেই।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বটম লাইন সেটা হল মুক্তিযুদ্ধ সেটা হচ্ছে একাত্তর। ৭১ এর সঙ্গে আপোষ করে বাংলাদেশে রাষ্ট্রে কোন কিছু চলতে পারেনা। আমরা ৭১ কে ধারণ করি আমরা স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনকে ধারণ করি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি ৭১-৯০ এবং ২৪ এর মধ্যে কোন বিরোধিতা নাই কিন্তু একটা সম্প্রদায়িক উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীরা একাত্তরের পরাজিত শক্তি।’ তিনি বলেন, ’তারা মুক্তিযুদ্ধকে মানতে চায় না এবং একাত্তরে তাদের যে ভূমিকা ছিল সেটার জন্য তারা আজ পর্যন্ত জাতির কাছে ক্ষমা চাই নাই। তাহলে কারা ভেঙেছে যারা ৭১ কে মানে না বাংলাদেশের অস্তিত্বকে স্বীকার করে না।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









