বিদ্যুতের দাবিতে আন্দোলন করে দেশজুড়ে আলোচনায় আসা চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাটে আবারও শুরু হয়েছে ঘনঘন লোডশেডিং। দিনে-রাতে কখন বিদ্যুৎ আসে আর কখন চলে যায়, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রাতে ঘনঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ভোগান্তি বেড়েছে কয়েকগুণ।
কানসাট ইউনিয়নের প্রবেশপথ বেকির মোড় এলাকায় সুমন আলীর চায়ের দোকানে কথা হয় স্থানীয়দের সঙ্গে। চা বিক্রেতা সুমন আলী বলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে। অথচ একসময় এ ইউনিয়নের মানুষ লোডশেডিংয়ের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল।
স্থানীয় ব্যবসায়ী সেলিম মিয়া ও শফিক মিয়া বলেন, বিগত সময়ে বিদ্যুৎ নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করতে হয়নি। কিন্তু এখন কখন বিদ্যুৎ আসবে, কখন চলে যাবে—তার কোনো ঠিক নেই। বিশেষ করে রাতে একটু শান্তিতে ঘুমানোরও সুযোগ থাকে না।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর সময়ে শিবগঞ্জসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো ছিল। তাদের দাবি, ওই সময়ে কানসাটসহ শিবগঞ্জের মানুষ কয়েক বছর অনেকটা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পেয়েছেন। ফলে লোডশেডিং নিয়ে তেমন ভাবতে হয়নি তাদের।
এরপর যাওয়া হয় কানসাটের ঐতিহাসিক বিদ্যুৎ আন্দোলনের অন্যতম নেতা গোলাম রাব্বানীর বাড়িতে। বিদ্যুৎ আন্দোলনের মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া গোলাম রাব্বানী পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
৫ আগস্টের পর গোলাম রাব্বানীর বাড়িতে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। বর্তমানে বাড়িটি অনেকটা পরিত্যক্ত ও নীরব। সেখানে তেমন কাউকে পাওয়া যায়নি।
বাড়িটির পাশের মুদি দোকানি সোহেল রানা বলেন, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর সময়, এরপর গোলাম রাব্বানীর সময়—প্রায় সব সময়ই এ এলাকায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ভালো ছিল। কিন্তু এবার আর সেই কানসাটের মতো গুরুত্ব নেই। দিন-রাত মিলিয়ে সর্বোচ্চ ১৪ ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।
গোলাম রাব্বানীর বাড়ি পেরিয়ে যাওয়া হয় কানসাট উচ্চ বিদ্যালয় এলাকায়। সন্ধ্যার পর স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে তারাও বিদ্যুতের দুর্ভোগের কথা জানান। তাদের ভাষ্য, যে কানসাট একসময় বিদ্যুতের দাবিতে আন্দোলন করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল, সেই কানসাটেই এখন বিদ্যুতের জন্য মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কারণ জানতে যাওয়া হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কানসাট জোনাল অফিসে। অফিসের সামনে থাকা মুদি দোকানি হাসান আলী বলেন, আগে বিদ্যুতের অবস্থা ভালো ছিল। গত দুই থেকে আড়াই বছর ধরে ব্যাপক লোডশেডিং শুরু হয়েছে। রাতে ঘুমাতেও সমস্যা হয়।
ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বিপাকে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। কানসাট উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আব্দুল হাদি বলে, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি বাড়িতেও পড়ালেখা করতে সমস্যা হচ্ছে।
কানসাটের ঐতিহাসিক বিদ্যুৎ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা গোলাম রাব্বানীর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব না হলেও ওই আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃত্বের কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয়।
আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার হওয়া জহির হাসান চৌধুরী বলেন, আন্দোলনের পর কানসাটসহ চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ভালো ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ঘনঘন লোডশেডিংয়ে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।
কানসাট বাজারের ব্যবসায়ী সোহেল রানা বলেন, গত কয়েক মাসের তুলনায় গত এক সপ্তাহ ধরে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে লোডশেডিংয়ের সমস্যা এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার ফজলুর রহমান বলেন, রাতে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৭৫ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে ৫৩ থেকে ৫৪ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি থাকায় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
বিদ্যুতের দাবিতে যে কানসাট একসময় আন্দোলনের মাধ্যমে দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়েছিল, সেই কানসাটের মানুষের এখন প্রশ্ন—চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের এই ঘাটতি কবে কাটবে, আর কবে ফিরবে স্বস্তির বিদ্যুৎ?


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









