প্রায় দুই বছর ধরে গাজীপুর সাফারি পার্কে থাকার পর সম্রাট ও নিহারকলি নামে দুটি হাতিকে শর্তসাপেক্ষে তাদের মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে বন বিভাগ। হাতি দুটিকে নির্যাতন না করা, মানুষের কাছ থেকে টাকা তোলার কাজে ব্যবহার না করা এবং যথাযথভাবে লালন-পালন করাসহ কয়েকটি শর্তে গত ১২ আগস্ট দুপুরে মালিকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সহকারী বনসংরক্ষক (এসিএফ) মো. তারেক রহমান।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সড়ক-মহাসড়কসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হাতি দিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা তোলার অভিযোগে প্রায় দুই বছর আগে সম্রাট ও নিহারকলিকে উদ্ধার করা হয়। পরে হাতি দুটিকে গাজীপুর সাফারি পার্কের হাতিশালায় রাখা হয়। পরবর্তীতে মালিকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যাচাই-বাছাই করে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত আরোপ করে হাতি দুটি ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বন বিভাগ।
সম্রাট নামের হাতিটি বুঝে নেন এর মালিক মনির মিয়া। আর নিহারকলি নামের হাতিটি বুঝে নেন মালিক আব্দুল মজিদ।
নির্যাতনের অভিযোগে উদ্ধার নিহারকলি
বন বিভাগ জানায়, ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের ভুলতা এলাকা থেকে নিহারকলিকে উদ্ধার করা হয়। হাতিটি ব্যবহার করে মানুষের কাছ থেকে টাকা তোলার অভিযোগ ছিল। পাশাপাশি হাতিটিকে নির্যাতন করার অভিযোগও ওঠে। এসব কারণে বন বিভাগের কর্মকর্তারা হাতিটিকে উদ্ধার করে গাজীপুর সাফারি পার্কে নিয়ে আসেন।
প্রায় দুই বছর সাফারি পার্কে থাকার পর মালিকের আবেদনের ভিত্তিতে হাতিটির বিষয়ে পুনরায় যাচাই-বাছাই করা হয়। পরে মালিকের আর্থিক সক্ষমতা ও হাতিটির দেখভালের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নির্দিষ্ট শর্তে নিহারকলিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
মাহুত নিহতের পর উদ্ধার সম্রাট
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় মাহুত নজরুল ইসলামকে পিষে হত্যার ঘটনার পর সম্রাট নামের হাতিটিকে উদ্ধার করে বন বিভাগ। পরে হাতিটিকে গাজীপুর সাফারি পার্কে এনে রাখা হয়।
সাফারি পার্ক থেকে হাতিটি বুঝে নেওয়ার পর মালিক মনির মিয়া জানান, বর্তমানে সম্রাটকে মৌলভীবাজার এলাকায় রাখা হয়েছে। সেখানে নিজের দায়িত্বে হাতিটির লালন-পালন করা হবে।
নেওয়া হয়েছে জিম্মানামা ও মুচলেকা
গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও এসিএফ মো. তারেক রহমান বলেন, ‘‘হাতির মালিকরা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বন বিভাগের কাছে আবেদন করেছিলেন। আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পাশাপাশি মালিকদের আর্থিক সক্ষমতাও যাচাই করা হয়েছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘মালিকদের কাছ থেকে জিম্মানামা ও মুচলেকা নেওয়া হয়েছে। সবকিছু বিবেচনা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় হাতি দুটি মালিকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’’
বন বিভাগের বন সংরক্ষক মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারী বলেন, ‘‘হাতি দুটি যাতে নির্যাতনের শিকার না হয়, কষ্ট না পায় এবং চাঁদা তোলার কাজে ব্যবহার করা না হয়—এমন শর্ত দেওয়া হয়েছে। ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে জিম্মানামা নিয়ে হাতি দুটি মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘সাফারি পার্কে সম্প্রতি দুটি হাতির মৃত্যুর কারণে সম্রাট ও নিহারকলিকে ফেরত দেওয়া হয়নি। মালিকদের আগের আবেদনের পর নিয়ম অনুযায়ী যাচাই-বাছাই শেষে হাতি দুটি ফেরত দেওয়া হয়েছে।’’
পার্কে পরপর দুই হাতির মৃত্যু
এদিকে, গাজীপুর সাফারি পার্কের হাতিশালায় গত ৬ ও ৭ আগস্ট পরপর দুটি হাতির মৃত্যু নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে একটি ছিল ১০ বছর বয়সী রাজু বাহাদুর।
চলতি বছরের ২৪ মে পার্কের হাতিশালায় শেকলে বাঁধা রাজু বাহাদুরের ওপর হামলা করে চার বছর বয়সী হাতি জয়িতা। ওই ঘটনায় রাজু বাহাদুরের একটি পা ভেঙে যায়। পরে তার চিকিৎসায় মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড থেকে বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আনা হয়। পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার চিকিৎসকদের সঙ্গেও পরামর্শ করা হয়।
দীর্ঘদিন চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যার পরও শেষ পর্যন্ত গত ৭ আগস্ট রাজু বাহাদুরের মৃত্যু হয়। এর একদিন আগে, ৬ আগস্ট ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে সাফারি পার্কের আরও একটি হাতির মৃত্যু হয়।
পরপর দুই হাতির মৃত্যুর পর সাফারি পার্কের হাতিশালার ব্যবস্থাপনা ও হাতিদের নিরাপত্তা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। এর মধ্যেই শর্তসাপেক্ষে সম্রাট ও নিহারকলিকে মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি সামনে আসে।
বন বিভাগ বলছে, মালিকদের কাছ থেকে নেওয়া জিম্মানামা ও মুচলেকার শর্ত অনুযায়ী হাতি দুটির যথাযথ পরিচর্যা নিশ্চিত করা এবং কোনোভাবেই নির্যাতন বা মানুষের কাছ থেকে টাকা তোলার কাজে ব্যবহার না করার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









