একদিকে অচেনা কক্ষ, হাত-পা বাঁধা; অন্যদিকে ধারালো ছুরি হাতে পিছু নেওয়া এক ব্যক্তি। মাঝখানে প্রাণ বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা। শেষ পর্যন্ত দৌড়ে একটি সুতার কারখানায় ঢুকে শ্রমিকদের কাছে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে ফিরেছেন ২১ বছরের তরুণ মো. আব্দুল্লাহ।
গাজীপুরের কালীগঞ্জে অটোরিকশায় তুলে অচেতন করার পর তাকে আটকে রেখে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ করেছেন তিনি।
বুধবার (২৬ আগস্ট) রাতে কালীগঞ্জ থানায় নিজে বাদী হয়ে লিখিত অভিযোগ করেন আব্দুল্লাহ।
আব্দুল্লাহ কালীগঞ্জ পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বড়নগর গ্রামের মো. ফজলুল হকের ছেলে। তিনি সদ্য সমাপ্ত এইচএসসি পরীক্ষার্থী। বিডি ক্লিন কালীগঞ্জ শাখার একজন স্বেচ্ছাসেবী।
অভিযোগে বলা হয়, গত ২৫ আগস্ট দুপুর সাড়ে ২টার দিকে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের বাসায় দাওয়াত খেয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন আব্দুল্লাহ। নাগরী বাজারের তিন রাস্তার মোড় থেকে অটোরিকশায় ওঠেন তিনি।
অটোরিকশায় আগে থেকেই সামনে বসা ছিলেন দুজন। তুমলিয়া মোড়ের কিছুটা আগে পেছনের দুই পাশে আরও দুজন যাত্রী ওঠেন। অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের মুখে মাস্ক ছিল।
কিছুদূর যাওয়ার পর ওই দুজনের একজন অপরজনকে একটি পোটলা দেন। পরে সেটি আব্দুল্লাহর নাকের কাছে নেওয়া হলে তীব্র গন্ধ পান তিনি। এরপরই অচেতন হয়ে পড়েন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেছেন আব্দুল্লাহ।
জ্ঞান ফেরার পর দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যায়। নিজেকে একটি অচেনা কক্ষে টেবিলের পায়ের সঙ্গে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় দেখতে পান তিনি। সেখানে থাকা দুই ব্যক্তি তাকে ভয়ভীতি দেখায়।
নিজের পকেট হাতড়ে আব্দুল্লাহ দেখতে পান, দুটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন, হাতঘড়ি ও নগদ ২ হাজার টাকা নেই।
এরপর ওই কক্ষে আরও ৫/৬ জন আসে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাকে মারধর করা হয় এবং দেশীয় ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে প্রাণনাশের ভয় দেখানো হয়।
একপর্যায়ে তার ব্যবহৃত নম্বর থেকেই বড় ভাইকে ফোন করে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। অভিযোগ, টাকা দেওয়ার পরও তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি।
আব্দুল্লাহর দাবি, পরে তাকে হত্যার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। তখন কক্ষে থাকা একজনের অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে জানালার পাশের অংশ ভেঙে বেরিয়ে আসেন তিনি। এরপর শুরু হয় তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন দৌড়।
অভিযোগ অনুযায়ী, একজন ধারালো ছুরি হাতে তাকে পেছন থেকে ধাওয়া করছিল। প্রাণপণে দৌড়াতে দৌড়াতে আব্দুল্লাহ ঢুকে পড়েন একটি সুতার কারখানায়। সেখানে শ্রমিকদের কাছে সাহায্য চাইলে তারা তাকে নিরাপদে আশ্রয় দেন।
পরে শ্রমিকরাই তার বড় ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। খবর পেয়ে বড় ভাই আরও ২/৩ জন আত্মীয়কে সঙ্গে নিয়ে সেখানে গিয়ে আহত আব্দুল্লাহকে উদ্ধার করেন। পরে তাকে স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
আব্দুল্লাহর অভিযোগ, পরে বড় ভাইয়ের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, গাজীপুর চৌরাস্তার ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কসংলগ্ন এলাকার একটি কারখানা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়েছে।
ঘটনার পর আতঙ্কে রয়েছেন আব্দুল্লাহ ও তার পরিবারের সদস্যরা। অভিযুক্ত অজ্ঞাত ব্যক্তিরা আবারও তাদের ক্ষতি করতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।
কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাকির হোসেন অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কীভাবে ঘটনাটি ঘটেছে, কারা জড়িত এবং অভিযোগে উল্লেখ করা বিষয়গুলোর সত্যতা কী-সবকিছু যাচাই করা হবে। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনায় সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকতে হবে। অপরিচিত ব্যক্তির আচরণ বা কোনো বস্তু নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে তা এড়িয়ে চলতে হবে। কেউ বিপদে পড়লে দ্রুত নিরাপদ স্থানে গিয়ে পুলিশকে জানানো উচিত।’
পুলিশের তদন্তে এখন বেরিয়ে আসার অপেক্ষায়-অটোরিকশার সেই যাত্রা থেকে শুরু করে অচেতন হওয়া, আটকে রাখা, মুক্তিপণের দাবি এবং শেষ পর্যন্ত সুতার কারখানায় আশ্রয় নেওয়ার পুরো ঘটনার নেপথ্যে কারা ছিল।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









