একটি দেশকে কতভাবে বহন করা যায়
কেউ মানচিত্রে বহন করে, কেউ স্মৃতিতে, কেউ একটি পুরোনো বাড়ির দরজার ভাঙা কাঠে, কেউ দাদির হাতের তৈরি কাদার পাত্রে, কেউ একটি জলপাইগাছের ছায়ায়, আর কোনো কোনো মানুষ—যখন আর কিছুই করার থাকে না—নিজের শরীরের ভেতর বহন করে নিয়ে যায় সেই দেশটিকে, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, এমনকি যখন দেশটি তার নিজের চোখের সামনে আর আগের মতো থাকে না তখনও।
সুলেইমান মানসুরের ছবিগুলোর দিকে তাকালে প্রথমে মনে হয়, তিনি যেন মানুষ আঁকছেন, নারী আঁকছেন, গাছ আঁকছেন, একটি উট আঁকছেন, একটি সকাল আঁকছেন, একটি ঘর, একটি পথ, একটি দূরের আকাশ। কিন্তু একটু বেশি সময় তাকিয়ে থাকলে বোঝা যায়, তিনি আসলে একই জিনিস বারবার আঁকছেন—একটি ভূখণ্ডকে মানুষের স্মৃতির ভেতর থেকে হারিয়ে যেতে না দেওয়ার চেষ্টা।
এই কারণেই তার শিল্পে মানুষ এবং মাটি আলাদা নয়।
মাদারহুড, কোয়ায়েট মর্নিং, দ্য ক্যামেল/ক্যারিয়ার অব হার্ডশিপস, দ্য ফ্লাইট টু ইজিপ্ট, শ্রিঙ্কিং অবজেক্ট, সেটলমেন্ট, পার্সিভিয়ারেন্স অ্যান্ড হোপ, গাজা, স্যাড টিউন, ফ্রম দ্য রিভার টু দ্য সি—এগুলোকে আলাদা আলাদা চিত্রকর্ম হিসেবে দেখা যায়, অবশ্যই দেখা যায়, কিন্তু তাদের মধ্যে দিয়ে একটিমাত্র দীর্ঘ, অসমাপ্ত বাক্যও পড়া যায়। সেই বাক্যের শুরু কোথায়, তা বলা কঠিন; হয়তো নাকবার আগে, হয়তো তারও আগে, আর শেষ কোথায়—তা আমরা আজও কেউ জানি না।
মানসুরের শিল্পে ফিলিস্তিনের পরিচয় গড়ে ওঠে জলপাই ও কমলা, নারী ও মা, গ্রাম ও শহর, পোশাক ও মাটি, স্মৃতি ও অপেক্ষার মধ্য দিয়ে। তার শিল্পকে তাই কেবল রাজনৈতিক শিল্প বললে তার একটি অংশ দেখা হয়, পুরোটা নয়। কারণ রাজনীতি যেখানে মানুষের জীবনের ওপর আঘাত করে, শিল্প সেখানে মানুষের জীবনের ক্ষুদ্রতম চিহ্নগুলোকে ধরে রাখে।
আর সেই ধরে রাখার মধ্যেই প্রতিরোধ।
মা যখন একটি দেশ।‘মাদারহুড’-এর দিকে তাকালে প্রথমে যে বিষয়টি চোখে পড়ে তা হলো মা। কিন্তু মানসুরের শিল্পে মা কখনো শুধু একজন মা নন। তার নিজের কথাতেই নারী ও মাতৃমূর্তি মাতৃভূমির প্রতীক; কখনো তারা বিপ্লবেরও প্রতীক।
এখানে মাতৃত্ব তাই ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাইরে চলে যায়।
মা সন্তানকে যেমন শরীরের ভেতর বহন করেন, তেমনি একটি মানুষ তার দেশকে বহন করতে পারে স্মৃতির মধ্যে। সন্তানকে যেমন কেউ পৃথিবী থেকে আলাদা করে নিয়ে যেতে পারে না, তেমনি মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও কেবল একটি রাজনৈতিক রেখা টেনে শেষ করে দেওয়া যায় না।
এই কারণেই মানসুরের নারীরা দুর্বল নন। তাদের শরীরের মধ্যে আছে কাজের শক্তি, তাদের পোশাকে আছে ইতিহাস, তাদের স্থিরতায় আছে এমন এক নীরবতা যা কোনো বক্তৃতার চেয়ে দীর্ঘ।
নারী এখানে অপেক্ষা করেন না শুধু। তিনি বহন করেন। তিনি রক্ষা করেন। তিনি অপক্ষোয় থাকেন।

মানুষ যখন নিজের শহরকে বহন করে। মানসুরের বহুল পরিচিত ‘দ্য ক্যামেল/ক্যারিয়ার অব হার্ডশিপ ‘ ছবিতে একজন ক্লান্ত বৃদ্ধকে দেখা যায়, যিনি তার পিঠে জেরুজালেমকে বহন করছেন। এই ছবিটি ফিলিস্তিনি সংগ্রামের একটি শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু ছবিটির ভেতরের সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয়টি হয়তো উট নয়, মানুষটি নয়, এমনকি তার পিঠে থাকা জেরুজালেমও নয় আশ্চর্য হলো—কেউ একটি শহরকে বহন করছে। সাধারণত শহর মানুষকে ধারণ করে। এখানে মানুষ শহরকে ধারণ করছে। এই উল্টে যাওয়া সম্পর্কেই ছবিটির গভীরতা। যে শহর একসময় মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিল, এখন সেই শহরই মানুষের পিঠে। ইতিহাসের ভার, পরাজয়ের ভার, নির্বাসনের ভার, স্মৃতির ভার—সবকিছু একসঙ্গে জমে আছে সেই শরীরে।
মানুষটি হাঁটছে। হয়তো খুব ধীরে। য়তো এত ধীরে যে দূর থেকে মনে হতে পারে সে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সে হাঁটছে। এবং এই হাঁটাই মানসুরের শিল্পের অন্যতম মৌলিক গতি—ভার নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। কখনো থেমে না যাওয়া।
বাঁধা হাত, খোলা আকাশ
১৯৭৬ সালের ‘পার্সিভিয়ারেন্স অ্যান্ড হোপ’ ছবিতে ঐতিহ্যবাহী ফিলিস্তিনি পোশাক পরা তিনটি মানুষকে দেখা যায়, তাদের হাত বাঁধা, আর তারা তাকিয়ে আছে ওপরের একটি পাখির দিকে। পেছনে রয়েছে ধ্বংস ও বিপর্যয়ের দৃশ্য। পাখিটি শান্তি ও আশার প্রতীক হিসেবে কাজ করে।
এখানে ছবির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হাত। হাত বাঁধা। অর্থাৎ শরীর আটকে আছে। কিন্তু চোখ বাঁধা নেই। তারা আকাশের দিকে তাকাতে পারে। এই সামান্য ব্যবধানেই মানসুর আশার জায়গাটি তৈরি করেন। মানুষের শরীরকে আটকে রাখা যায়, কিন্তু তার দৃষ্টিকে পুরোপুরি আটকে রাখা যায় কি?

সম্ভবত এটাই ‘পার্সিভিয়ারেন্স অ্যান্ড হোপ’-এর সবচেয়ে গভীর প্রশ্ন।
পেছনে ধ্বংস, সামনে বাঁধা হাত, আর ওপরে একটি পাখি—যেন পৃথিবী তার সমস্ত দরজা বন্ধ করে দিয়েছে, কিন্তু আকাশের একটি ছোট অংশ এখনো খোলা। সেই ছোট অংশটুকুই আশা। আর আশার অর্থ এখানে আনন্দ নয়। আশা হলো—সবকিছু দেখেও এখনো সম্পূর্ণ ভেঙে না পড়া।

বিপর্যয়ের বিপরীতে একটি সকাল। ‘কোয়ায়েট মর্নিং’। নামটি খুব সাধারণ। এত সাধারণ যে প্রথমে মনে হতে পারে, এখানে কোনো ইতিহাস নেই। একটি সকাল তো প্রতিদিনই আসে। আলো আসে, মানুষ জেগে ওঠে, জীবন আবার শুরু হয়।
কিন্তু ফিলিস্তিনের ইতিহাসে একটি শান্ত সকালও কখনো সম্পূর্ণ শান্ত নয়। কারণ শান্তির ভেতরেও স্মৃতি থাকে। গত রাতের স্মৃতি। হারিয়ে যাওয়া মানুষের স্মৃতি। চেকপয়েন্টের স্মৃতি। বাড়ি ছাড়ার স্মৃতি। আর সেই সঙ্গে থাকে পরের মুহূর্তের অনিশ্চয়তা।
মানসুরের শিল্পের একটি বড় শক্তি—তিনি সব সময় চিৎকার করেন না। তার ছবির অনেক কিছু খুব ধীরে ঘটে। তার শিল্পে অবিচল থাকার ধারণা গুরুত্বপূর্ণ, তার মধ্যেও এই ধীরতা আছে। Sumud অর্থ দৃঢ়ভাবে টিকে থাকা, ভেঙে না পড়া।
একটি শান্ত সকাল তাই কখনো কেবল সকাল নয়। এটি বলা—আজও আমরা উঠেছি। আজও আমরা এখানে।

মায়ের শরীরের ভেতর আশ্রয়। ‘দ্য ফ্লাইট টু ইজিপ্ট’-এ মা ও শিশুর সম্পর্ক আবার সামনে আসে। কিন্তু এখানে মাতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত হয় যাত্রা, পালিয়ে যাওয়া এবং আশ্রয়ের প্রশ্ন।
শিশুকে কোলে নিয়ে যে নারী এগিয়ে চলেন, তার শরীর তখন শুধু একটি শরীর থাকে না। সেটিই হয়ে ওঠে প্রথম আশ্রয় রাষ্ট্র যখন আশ্রয় দিতে পারে না, যখন বাড়ি নিরাপদ থাকে না, যখন পথ নিজেই বিপদের আরেক নাম, তখন মা-ই হয়ে ওঠেন ঘর। মানসুরের শিল্পে এই কারণে নারীকে বারবার মাতৃভূমির সঙ্গে যুক্ত করা যায়।
মা সন্তানকে ধরে রাখেন। মাটি মানুষকে ধরে রাখে। আর মানুষ, যতক্ষণ পারে, মাটিকে ধরে রাখে। এই তিনটি সম্পর্কের মধ্যে যেন একটি অদৃশ্য বৃত্ত তৈরি হয়।
যখন মাটি নিজেই কথা বলতে শুরু করে। মানসুরের শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে যখন তিনি প্রচলিত শিল্পসামগ্রীর বদলে ফিলিস্তিনের মাটি, কাদা, খড় ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করেন। প্রথম ইন্তিফাদার সময় ইসরায়েলি তৈরি শিল্পসামগ্রী বর্জনের সঙ্গে এই পরীক্ষার সম্পর্ক ছিল। পরে তিনি কাদার ফাটলকে ফিলিস্তিনের ভৌগোলিক বিভাজনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে শুরু করেন।
এখানে শিল্পের উপকরণ আর বাইরে থেকে আনা কোনো বস্তু নয়। ছবিটিই হয়ে ওঠে মাটি। আর মাটি শুকোতে শুরু করলে ফাটে। শিল্পী সেই ফাটল বন্ধ করেন। তারপর ক্লান্ত হয়ে একদিন তাকিয়ে থাকেন। আর তখন তিনি বুঝতে পারেন—ফাটলটি হয়তো ছবির ত্রুটি নয়। ফাটলই ছবির ভাষা। ফাটলই মানচিত্র। ফাটলই ইতিহাস।

এখানে ‘শ্রিঙ্কিং অবজেক্ট’ কেবল একটি শিল্পকর্ম নয়; এটি একটি প্রশ্ন—যখন একটি ভূখণ্ড ক্রমাগত সংকুচিত হতে থাকে, তখন তার মানচিত্র কি মানুষের শরীরের মতোই সংকুচিত হয় না?
আর যদি হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত কী থাকে? হয়তো মাটি। হয়তো স্মৃতি। হয়তো একটি নাম।

মানুষ আর কাঁটাতারের মধ্যে পার্থক্য কোথায়। ‘সেটলমেন্ট’-এ বসতিস্থাপনকারীর প্রতীকী শরীর কাঁটাতারের সঙ্গে মিশে যায়। শিল্পী নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন, কাঁটাতারের লাল রং রক্ত নয়, মরিচা; বসতিস্থাপনকারী, সৈনিক এবং কাঁটাতার—তিনটি আলাদা সত্তা ধীরে ধীরে একে অপরের সঙ্গে মিশে যাওয়ার ধারণাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
এটি একটি ভয়ংকর ছবি, কারণ এখানে সহিংসতা কোনো বিস্ফোরণের মতো নয়। এটি ধীরে ধীরে ছড়ায়। একটি কাঁটাতার। তারপর আরেকটি। তারপর আরেকটি। তারপর মানুষ। তারপর সৈনিক। তারপর জমি। তারপর এমন একটি জায়গা যেখানে মানুষ এবং কাঁটাতারের মধ্যে আর কোনো পরিষ্কার সীমারেখা থাকে না। এই অস্পষ্টতাই ছবিটির আতঙ্ক।
কারণ সহিংসতা যখন প্রতিদিনের স্বাভাবিক দৃশ্য হয়ে যায়, তখন একসময় মানুষ আর তাকে আলাদা কোনো ঘটনা হিসেবে দেখতে পারে না।
একটি নাম, যার মধ্যে অসংখ্য রাত। ‘গাজা’ নামটি নিজেই এত ভার বহন করে যে ছবির সামনে দাঁড়ানোর আগেই দর্শক যেন একটি ইতিহাসের মধ্যে প্রবেশ করে। গাজা একটি ভূগোল, কিন্তু একই সঙ্গে এটি একটি স্মৃতি, একটি অবরুদ্ধ জীবন, একটি শহরের নাম, এবং অসংখ্য মানুষের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা।
মানসুরের শিল্পে ভূগোল কখনো নিরপেক্ষ নয়। জেরুজালেমকে একজন মানুষ বহন করেন। মাটি ফেটে যায়। দেয়াল উঠে দাঁড়ায়। নারী গাছকে জড়িয়ে ধরে। শিশু মায়ের শরীরে আশ্রয় নেয়। আর গাজা—একটি নাম হয়ে—সবকিছুর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে। এই নামটি যতবার উচ্চারিত হয়, ততবার মনে হয়, আমরা আসলে কোনো দূরের শহরের কথা বলছি না। আমরা কথা বলছি মানুষের নিজের একটি ঘর সম্পর্কে।

যে গান শেষ হয় না। ‘স্যাড টিউন’ যেন মানসুরের শিল্পের আরেকটি দরজা। একটি বিষণ্ন সুর শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি থেকে যায়।ফিলিস্তিনের ইতিহাসেও এমনই কিছু আছে—একটি ঘটনা শেষ হয়, কিন্তু তার প্রতিধ্বনি পরের প্রজন্মে পৌঁছায়। একটি বাড়ি হারানোর স্মৃতি একটি শিশুর মধ্যে থাকে, সেই শিশু বড় হয়, তার সন্তান হয়, তারপর সেই গল্প আবার বলা হয়।
এখানে দুঃখ কোনো একক মুহূর্ত নয়। দুঃখ একটি উত্তরাধিকার। কিন্তু মানসুরের শিল্পের আশ্চর্য বিষয় হলো, এই দুঃখ কখনো সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে যায় না। তার ভেতরেই থাকে প্রতিরোধ। তার ভেতরেই থাকে স্মৃতি। তার ভেতরেই থাকে বেঁচে থাকার জেদ।

একটি গাছের দুই শাখা। আর তারপর ‘ফ্রম দ্য রিভার টু দ্য সি’, ২০২১।
এখানে একটি নারী একটি গাছকে জড়িয়ে ধরে আছেন। গাছটির একদিকে জলপাই, অন্যদিকে কমলা—ফিলিস্তিনের ভূমি, কৃষি, স্মৃতি ও পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত দুটি প্রতীক। মানসুরের নিজের সাইটেও কাজটি ২০২১ সালের তেলচিত্র হিসেবে নথিভুক্ত।
এখানে গাছটি যেন একটি শরীর। তার দুটি শাখা। দুটি ফল। কিন্তু শিকড় এক। এটাই ছবিটির সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্য।
কারণ শাখাগুলো আলাদা হতে পারে, ফলের রং আলাদা হতে পারে, ইতিহাসের ব্যাখ্যা আলাদা হতে পারে, মানুষের রাজনৈতিক অবস্থান আলাদা হতে পারে—কিন্তু মাটির গভীরে শিকড়গুলো কি সত্যিই আলাদা করা যায়?
নারীটি গাছটিকে জড়িয়ে আছেন। যেন তিনি গাছটিকে রক্ষা করছেন। অথবা গাছটি তাকে রক্ষা করছে। অথবা দুজনেই একই জিনিসকে আঁকড়ে আছেন—একটি মাটি, যা তাদের দুজনেরই। এখানে জলপাই ও কমলা কেবল ফল নয়। তারা স্মৃতি। তারা শ্রম। তারা ঘর। তারা মৃতদের স্মৃতি। তারা ভবিষ্যৎ সন্তানদের জন্য রেখে যাওয়া একটি পৃথিবীর প্রতিশ্রুতি।
শিল্পের শেষ প্রান্তে যে মানুষটি দাঁড়িয়ে থাকে মানসুরের ছবিগুলোকে যদি একসঙ্গে রাখা যায়, তাহলে একটি অদ্ভুত যাত্রাপথ তৈরি হয়।
একদিকে মা। অন্যদিকে বৃদ্ধ মানুষ, যার পিঠে শহর। তারপর বাঁধা মানুষ, যারা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তারপর নারী, শিশু, মাটি। তারপর ফাটল। তারপর কাঁটাতার। তারপর গাজা। তারপর বিষণ্ন সুর। আর শেষে একটি গাছ, যার দুই শাখা একে অপরের দিকে ছড়িয়ে গেছে এবং যার শিকড় নিচে, অন্ধকার মাটির মধ্যে, এখনও একসঙ্গে।
এ যেন ইতিহাসের কোনো সরল গল্প নয়। বরং একই স্মৃতির চারপাশে ঘুরে চলা একটি মানুষ। সে বারবার ফিরে আসে।
জলপাইগাছের কাছে। মায়ের কাছে। জেরুজালেমের কাছে। মাটির কাছে। সমুদ্রের কাছে। তারপর আবার সেই দেয়ালের কাছে, যেখানে সে একদিন ছবি আঁকতে চেয়েছিল কিন্তু দেয়ালের বিশালতা দেখে থেমে গিয়েছিল।
কিন্তু শিল্পী থামেননি। তিনি দেয়ালে ছবি না এঁকে মাটিতে এঁকেছেন। মানুষের শরীরে এঁকেছেন। নারীর পোশাকে এঁকেছেন। গাছের পাতায় এঁকেছেন। কাদার ফাটলে এঁকেছেন। আর এভাবেই তার শিল্পের সবচেয়ে বড় প্রতিরোধটি তৈরি হয়েছে—যা মুছে ফেলতে চাওয়া হয়, তাকে আবার দৃশ্যমান করে তোলা।
হয়তো এই কারণেই মানসুরের শিল্পে আশার রং খুব উজ্জ্বল নয়। এটি কোনো বিজয়োল্লাস নয়। এটি একটি ছোট পাখির মতো। দূরে। খুব দূরে। কখনো দেখা যায়, কখনো যায় না। তবু মানুষ তাকিয়ে থাকে। কারণ তার হাত বাঁধা হলেও চোখ এখনো খোলা। আর যতক্ষণ চোখ খোলা থাকে, ততক্ষণ ছবিটি শেষ হয় না। ততক্ষণ মাটির ফাটলও শেষ হয় না। ততক্ষণ গাছের শিকড় মাটির নিচে কাজ করে যায়। ততক্ষণ একটি মানুষ তার পিঠে একটি শহর বহন করে হাঁটতে থাকে। ধীরে।অত্যন্ত ধীরে। কিন্তু হাঁটে।
সেই হাঁটার মধ্যেই হয়তো সুলেইমান মানসুরের শিল্পের সবচেয়ে নীরব, সবচেয়ে দীর্ঘ বাক্যটি শোনা যায়—
মাটি এখনো স্মরণ করে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









