সাম্রাজ্য, নির্বাসন, ধর্ম ও মুক্তির কাব্য
কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে প্রচলিত বাক্যটি সম্ভবত—তিনি বিদ্রোহী কবি। বাক্যটি সত্য, কিন্তু এই সত্যের মধ্যেই একটি বিপদ লুকিয়ে আছে। কারণ ‘বিদ্রোহী’ শব্দটি যদি শুধু ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক ক্রোধের সমার্থক হয়ে যায়, তাহলে নজরুলের সাহিত্যের গভীরতম স্তরটি আমাদের চোখ এড়িয়ে । নজরুলের বিদ্রোহ কোনো এক শাসকের বিরুদ্ধে নয়; এটি সেই সমগ্র সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যা মানুষকে শ্রেণি, ধর্ম, জাত, লিঙ্গ, সাম্রাজ্য ও ক্ষমতার বিভিন্ন শ্রেণিবিন্যাসে স্থাপন করে।
এইখানেই এডওয়ার্ড সাঈদের চিন্তার আলো নজরুলকে নতুনভাবে পড়ার একটি শক্তিশালী পদ্ধতি কাজে আসতে পারে।
সাঈদের ‘কালচার অ্যান্ড ইমপেরিয়ালিজম’ থেকে আমরা জানতে পারি—যে সাহিত্যকে তার নান্দনিক স্বায়ত্তশাসনের মধ্যে বন্দী করে পাঠ করা যায় না। একটি উপন্যাস, একটি অপেরা, একটি কবিতা বা একটি সাংস্কৃতিক রূপ প্রায়ই এমন এক বৃহত্তর ভূগোলের সঙ্গে যুক্ত থাকে, যেখানে সাম্রাজ্য, পুঁজি, জাতীয়তা, বর্ণ, অভিবাসন এবং প্রতিরোধ পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। সাঈদের ‘কনট্রাপান্টাল রিডিং’—অর্থাৎ একই সঙ্গে সাম্রাজ্যের প্রধান সুর এবং তার দ্বারা চাপা পড়া প্রতিসুর শুনে পাঠ করা—এই পদ্ধতির কেন্দ্রে।
নজরুলকে এইভাবে পাঠ করলে তার সাহিত্য আর শুধু ‘বাংলার বিদ্রোহী কবির সাহিত্য’ থাকে না। বরং তা হয়ে ওঠে ঔপনিবেশিক আধিপত্যের ভিতর থেকে উঠে আসা এক প্রতিসাংস্কৃতিক কণ্ঠ—যে কণ্ঠ একদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে প্রত্যাখ্যান করে, অন্যদিকে জাতীয়তাবাদের ভেতরের সাম্প্রদায়িকতা, শ্রেণিবিভাজন ও পিতৃতন্ত্রকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
নজরুলের সঙ্গে সাঈদের এই বিন্দুতে এসে একটি গভীর আত্মীয়তা তৈরি হয়। দুজনেই সংস্কৃতিকে নির্দোষ ক্ষেত্র হিসেবে দেখেন না। দুজনের কাছেই ভাষা একটি রাজনৈতিক ভূখণ্ড।
সাম্রাজ্য কেবল ভূখণ্ড দখল করে না
সাম্রাজ্যবাদকে আমরা সাধারণত সেনাবাহিনী, প্রশাসন, অর্থনীতি কিংবা ভূখণ্ডের দখল দিয়ে বুঝি। কিন্তু সাঈদের দার্শনিক চিন্তা হলো এটা দেখানো— যে সাম্রাজ্য সংস্কৃতির মধ্যেও প্রবেশ করে। সাম্রাজ্য তার নিজের আধিপত্যকে স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করতে একটি ভাষ্য/কাহিনি নির্মাণ করে— কে সভ্য, কে অসভ্য; কে আধুনিক, কে পশ্চাৎপদ; কে শাসন করবে, কে শাসিত হবে। ‘কালচার অ্যান্ড ইমপেরিয়ালিজম’-এর মূল তর্কগুলোর একটি ছিল—ইউরোপীয় উচ্চসংস্কৃতিকে সাম্রাজ্যিক ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন করে পড়লে সেই সংস্কৃতির গঠনগত বাস্তবতার একটি অংশ অদৃশ্য হয়ে যায়।
এই ধারণা থেকে নজরুলকে পড়লে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়।
ব্রিটিশ শাসন ভারতে কেবল প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেনি; উপনিবেশিত মানুষকে নিজেদের সম্পর্কে একটি বিশেষ ধারণার মধ্যে স্থাপনও করেছে। ভারতীয় সমাজকে ধর্ম, জাতি, সম্প্রদায় ও শ্রেণির নানা শ্রেণিবিন্যাসে পাঠ করার যে ঔপনিবেশিক অভ্যাস তৈরি হয়েছিল, তা পরবর্তী ভারতীয় রাজনীতির ওপরও প্রভাব ফেলেছিল। নজরুল এই শ্রেণিবিন্যাসের বিরুদ্ধে একটি ভিন্ন ভাষা তৈরি করেন।
সেই ভাষার কেন্দ্রে থাকে ‘মানুষ’। ‘মানুষ’: নজরুলের সবচেয়ে বিপজ্জনক রাজনৈতিক শব্দ ‘সাম্যবাদী’ কবিতার সেই বহুল উদ্ধৃত উচ্চারণ— “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।” এটি কেবল মানবতাবাদী বাণী নয়। উপনিবেশিত সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে এটি একটি রাজনৈতিক পুনর্নামকরণ।
কারণ ‘মানুষ’ বলে সবাইকে সমানভাবে চিহ্নিত করা সহজ নয়। ঔপনিবেশিক সমাজে মানুষকে বলা হয়েছিল প্রজা। ধর্মীয় রাজনীতিতে মানুষ হয়ে উঠেছিল হিন্দু অথবা মুসলমান। শ্রেণিবিন্যাসে কেউ জমিদার, কেউ কৃষক, কেউ শ্রমিক। বর্ণব্যবস্থায় কেউ উচ্চ, কেউ নিম্ন। পিতৃতন্ত্রে কেউ নাগরিক, কেউ গৃহস্থালির অন্তরালে আবদ্ধ।
নজরুলের ‘মানুষ’ এই সমস্ত পরিচয়ের পূর্বে একটি নৈতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে। তিনি বলেন না যে পরিচয় অপ্রয়োজনীয়। বরং তিনি বলেন—কোনো পরিচয়ই মানুষের চেয়ে বড় নয়। নজরুলের সাম্যবাদ তার রাজনৈতিক তত্ত্বের পাশাপাশি একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক বিদ্রোহও। কে কাকে কী নামে ডাকবে—এই ক্ষমতাটিও ক্ষমতার অংশ। নজরুল সেই নামকরণের ক্ষমতাকে মানুষের দিকে ফিরিয়ে দেন।
প্রান্ত থেকে কেন্দ্রে
নজরুলের জীবনকেও এই আলোয় পড়া দরকার। ১৮৯৯ সালে চুরুলিয়ায় জন্ম। পিতার মৃত্যু তার শৈশবেই। মসজিদের সঙ্গে যুক্ত কাজ, মক্তবের শিক্ষা, মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব, লেটো দলের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, সেনাবাহিনীতে যোগদান, কলকাতায় সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ—এই বিচিত্র জীবনপথ কোনো সরল ‘কবির জীবনী’ নয়।
বরং এটি ঔপনিবেশিক ভারতের সামাজিক ভূগোলের মধ্য দিয়ে এক মানুষের যাত্রা। মক্তব থেকে সেনানিবাস। গ্রাম থেকে মহানগর। ধর্মীয় শিক্ষার ভিতর থেকে আধুনিক রাজনৈতিক চেতনা। লোকসংস্কৃতি থেকে মুদ্রিত সাহিত্য। সৈনিক জীবন থেকে বিদ্রোহী কবিতা।
যদিও এই চলাচলকে সাঈদের ‘এক্সাইল’ বা স্থানচ্যুতির ধারণার সঙ্গে আক্ষরিক অর্থে এক করে দেখা যাবে না; নজরুল, সাঈদের মতো প্রবাসী ছিলেন না। কিন্তু তার জীবন ছিল ক্রমাগত সীমানা অতিক্রমের জীবন। তিনি এক পরিচয়ের মধ্যে স্থির থাকেননি। এই অস্থিরতাই তার সৃষ্টিশীলতার শক্তি।
ধর্ম পরিচয় নয়, প্রতিস্বর
নজরুলকে সাঈদীয় পদ্ধতিতে পড়ার সবচেয়ে ফলপ্রসূ ক্ষেত্র সম্ভবত তার ধর্মচেতনা।
নজরুল গভীরভাবে ইসলামী ঐতিহ্যের সন্তান। শৈশবের ধর্মীয় শিক্ষা তার কাব্যভাষাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। কিন্তু পরবর্তী জীবনে তিনি একই সঙ্গে হিন্দু পুরাণ, শাক্ত ঐতিহ্য, বৈষ্ণব সংগীত, ইসলামী ইতিহাস এবং পারস্যীয় কাব্যভাণ্ডার ব্যবহার করেন। নজরুল তার সাহিত্যকে হিন্দু ও মুসলমান—দুই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সম্মিলিত ব্যবহারের মধ্য দিয়ে বিভাজনের বিপরীতে মর্যাদাপূর্ণ সম্প্রীতির এক বিশেষদিক চিহ্নিত করেছেন।
এখানে নজরুলের ধর্মীয় বহুত্বকে শুধু ‘সম্প্রীতি’র উদাহরণ হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। এটি আসলে সাংস্কৃতিক ভূখণ্ড পুনর্দখলের কাজ। যে সমাজে ধর্মীয় পরিচয় ক্রমশ রাজনৈতিক শ্রেণিতে পরিণত হচ্ছিল, নজরুল সেখানে দেখালেন যে মুসলমান কবি কৃষ্ণের বাঁশি শুনতে পারেন; ইসলামী ঐতিহ্যের কবি কালীকে আহ্বান করতে পারেন; আরবি-ফারসি শব্দ বাংলা কবিতার স্বাভাবিক সম্পদ হতে পারে।
অর্থাৎ তিনি সংস্কৃতির ওপর মালিকানার ধারণাকে ভেঙে দেন। কোনো প্রতীক একমাত্র কোনো সম্প্রদায়ের সম্পত্তি নয়। এই দৃষ্টিতে নজরুলের ধর্মচেতনা এক ধরনের ‘অ্যান্টি-এসেনশিয়ালিজ ‘—মানুষকে একটিমাত্র অপরিবর্তনীয় পরিচয়ে আবদ্ধ করার ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে।
‘বিদ্রোহী’: সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আত্মপরিচয়ের পুনর্দখল
‘বিদ্রোহী’ কবিতার শক্তি এর রাজনৈতিক ঘোষণায় যেমন, তার চেয়েও বেশি তার ভাষার বিস্ফোরণে। কবি নিজেকে একটিমাত্র পরিচয়ে স্থাপন করেন না। তিনি একই সঙ্গে ধ্বংস, সৃষ্টি, প্রেম, আগুন, ঝড়, দেবতা, মানুষ এবং পৌরাণিক স্মৃতির বাহক।
এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ সাম্রাজ্য শ্রেণিবিন্যাস করতে ভালোবাসে। একজন ভারতীয়। একজন মুসলমান। একজন ‘নেটিভ’। একজন প্রজা। একজন সৈনিক। একজন লেখক। কিন্তু ‘বিদ্রোহী’র ‘আমি’ এই প্রশাসনিক পরিচয়গুলোর কোনো একটিতে স্থির হয় না। সে বহুস্বর। সে অস্থির। সে অসমাপ্ত। সে একাধিক সভ্যতার উত্তরাধিকার দাবি করে।
সাঈদের ‘কনট্রাপান্টা ‘ পাঠের ভাষায় বলা যায়, এখানে একটি কণ্ঠের সঙ্গে আরেকটি কণ্ঠের সংঘর্ষ ঘটে। নজরুলের ‘আমি’ কোনো একক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কাছে আত্মসমর্পণ করে না; বরং নানা ঐতিহ্যের সুরকে একই কাব্যিক শরীরে সংঘর্ষে ও সংলাপে রাখে।
তাই ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটিকে শুধু ‘ব্রিটিশবিরোধী’ কবিতা বলা তার রাজনৈতিক অর্থকে সংকুচিত করে। এটি উপনিবেশিকভাবে সংজ্ঞায়িত আত্মপরিচয়ের বিরুদ্ধে আত্মপরিচয়ের পুনর্দখল।
মুদ্রিত শব্দ যখন রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ
১৯২২ সালের ১১ আগস্ট নজরুল সম্পাদিত ধূমকেতু প্রকাশিত হয়। এটি দ্রুতই সমকালীন র্যাডিক্যাল রাজনীতির কণ্ঠ হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা ও স্বরাজের পক্ষে নজরুলের লেখাগুলো ব্রিটিশ সরকারকে উদ্বিগ্ন করে এবং শেষ পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়।
‘আনন্দময়ীর আগমনে’ প্রকাশের পর পত্রিকাটি নিষিদ্ধ হয় এবং নজরুল গ্রেপ্তার হন। এই ঘটনা সাঈদের চিন্তার আলোয় পড়লে নতুন অর্থ পায়।
রাষ্ট্র বুঝেছিল—মুদ্রিত শব্দ কেবল মতামত নয়। মুদ্রিত শব্দ মানুষকে একটি নতুন রাজনৈতিক কল্পনা দিতে পারে। রাষ্ট্রের ক্ষমতা বলে—আমি বৈধ। কবি বলে—তোমার বৈধতার ইতিহাস আছে। রাষ্ট্র বলে—এই শাসন স্বাভাবিক। কবি বলে— কোনো শাসন স্বাভাবিক নয়; তার ইতিহাস আছে, তার সহিংসতা আছে, তার বিকল্পও আছে।
এইখানে সাহিত্য রাষ্ট্রের বাইরে কোনো নিরীহ সৌন্দর্য নয়; সাহিত্য হয়ে ওঠে বৈধতার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী বিকল্প।
‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’: আদালতের ভাষাকে উল্টে দেওয়া
নজরুলের কারাবাস এবং ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ এই সংঘর্ষকে আরও গভীর করে। আদালত কবিকে অভিযুক্ত করে। কবি আদালতের ভাষাকে নিজের বিরুদ্ধে ব্যবহার না করে সেই ভাষার নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্ন করেন। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক ঘটনা ঘটে—ক্ষমতা কথা বলার অধিকার দাবি করে; কবি ক্ষমতাকে জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করান।
এই রূপান্তরটি উপনিবেশবিরোধী সাহিত্যের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। ঔপনিবেশিক শাসক উপনিবেশিত মানুষকে ‘অপরাধী’, ‘অসভ্য’, ‘অপরিণত’ বা ‘শাসনের উপযুক্ত’ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। প্রতিরোধী লেখক সেই শ্রেণিবিন্যাস উল্টে দেন। নজরুলের সাহিত্যিক নৈতিকতা এখানেই—অপরাধী কে—এই প্রশ্নটি নজরুল রাষ্ট্রের কাছ থেকে ফিরিয়ে নেন।
মাটির মানুষের পাল্টা-ইতিহাস
১৯২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর লাঙল প্রকাশিত হয়। পত্রিকাটি ছিল শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ-সম্প্রদায়ের মুখপত্র এবং শ্রেণিবৈষম্য দূর করার রাজনৈতিক প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। প্রথম সংখ্যায় ‘সাম্যবাদী’ শিরোনামে এগারোটি কবিতা প্রকাশিত হয়। প্রচ্ছদে ছিল কাঁধে লাঙল নেওয়া কৃষকের ছবি।
এই নামটিকে অবহেলা করা যায় না। লাঙল একটি কৃষিযন্ত্র। কিন্তু নজরুলের হাতে তা ইতিহাসের যন্ত্র হয়ে ওঠে। সাম্রাজ্য ইতিহাসকে প্রশাসনের চোখে লেখে। উচ্চবিত্ত জাতীয়তাবাদ ইতিহাসকে নেতৃত্বের চোখে লেখে। নজরুল ইতিহাসকে শ্রমের চোখে দেখতে চান। যে কৃষক মাটি চাষ করে, সে কেবল অর্থনীতির উৎপাদক নয়—সে জাতির নির্মাতা।
এইখানে ‘লাঙল’ সাঈদের ‘ওভারল্যাপিং টেরিটরি’-এর ধারণার সঙ্গে চমৎকারভাবে মিলে যায়। সাম্রাজ্যের ভূগোল এবং কৃষকের ভূগোল একই ভূখণ্ডে থাকে, কিন্তু তাদের পৃথিবী এক নয়।
একজনের কাছে ভারত প্রশাসনিক অঞ্চল। অন্যজনের কাছে জমি। একজনের কাছে উপনিবেশ। অন্যজনের কাছে ঘর একজনের কাছে উৎপাদনের পরিসংখ্যান। অন্যজনের কাছে ক্ষুধা ও জীবন। নজরুল লাঙল-এর মাধ্যমে এই দুই ভূগোলকে মুখোমুখি দাঁড় করান।
আকাশ ও মাটির দ্বৈত প্রতীক
নজরুলের সাংবাদিকতাকে দুটি প্রতীক দিয়ে চিহ্নিত করা যায়—ধূমকেতু—আকাশের বিদ্রোহ। লাঙল—মাটির বিদ্রোহ ধূমকেতু সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক বৈধতার ওপর আঘাত করে। লাঙল সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিতরে প্রবেশ করে।একটি বলে—স্বাধীনতা চাই। অন্যটি জিজ্ঞেস করে—স্বাধীনতা কার? এই দ্বিতীয় প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ব্রিটিশ চলে গেলে যদি জমিদার থাকে? যদি শ্রমিকের শোষণ থাকে? যদি সাম্প্রদায়িক বিভাজন থাকে? যদি নারী অধীন থাকে? তবে ঔপনিবেশিকতার পতন কি মানুষের পূর্ণ মুক্তি? নজরুলের রাজনৈতিক পরিণতি এখানেই—তিনি রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে সামাজিক স্বাধীনতার প্রশ্ন দিয়ে বুঝবার চেষ্টা করেছেন।
জাতীয়তাবাদকে ভালোবাসা এবং তাকে প্রশ্ন করা
এখানে নজরুলকে সাঈদের চিন্তার সঙ্গে যুক্ত করার একটি সূক্ষ্ম পথ রয়েছে। সাঈদ একদিকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামকে গুরুত্ব দিয়েছেন, অন্যদিকে জাতীয়তাবাদকে নিজস্ব একমাত্রিকতার মধ্যে আটকে পড়ার বিপদ সম্পর্কেও সতর্ক ছিলেন। তার সমালোচনামূলক অবস্থান ছিল একই সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং বদ্ধ জাতীয়তাবাদবিরোধী।
নজরুলের সাহিত্যেও এই দ্বৈততা আছে। তিনি ভারতের স্বাধীনতা চান। কিন্তু তিনি এমন ভারত চান না যেখানে এক ধর্ম অন্য ধর্মকে গ্রাস করবে। তিনি জনগণের ঐক্য চান। কিন্তু এমন ঐক্য নয় যেখানে দরিদ্রের কণ্ঠ হারিয়ে যায়। তিনি জাতীয় মর্যাদা চান। কিন্তু এমন জাতীয়তা নয় যা নারী, শ্রমিক বা সংখ্যালঘুকে প্রান্তে ঠেলে দেয়। এই কারণে তার জাতীয়তাবাদকে একটি সমালোচনামূলক জাতীয়তাবাদ বলা যায়। নজরুল জাতীয় মুক্তির ভেতরেই জাতীয়তার সমালোচনার বীজ পুতে দেন।
বিশ্বরাজনীতি বাংলার কণ্ঠে
রুশ বিপ্লবের অভিঘাত নজরুলকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। লাঙল ও গণবাণী-তে তার ‘সাম্যবাদী’ ও ‘সর্বহারা’ কবিতার প্রকাশ এবং ‘কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল’-এর বাংলা রূপান্তরের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়।
কিন্তু নজরুলকে এখানে কেবল একটি ইউরোপীয় রাজনৈতিক মতবাদের অনুসারী হিসেবে পাঠ করা ভুল হবে। তিনি ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক ধারণাকে বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করেন। কোরআন। পুরাণ। কারবালা।কৃষক। শ্রমিক। রুশ বিপ্লব। বাংলার ক্ষুধা। সবকিছু একই কাব্যিক পরিসরে এসে দাঁড়ায়।
এই প্রক্রিয়াটি উপনিবেশমুক্তির সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। বিশ্ব থেকে ধারণা গ্রহণ করা মানেই সাংস্কৃতিক অনুকরণ নয়। একটি ধারণা যখন স্থানীয় ইতিহাসে প্রবেশ করে, তখন সেটি বদলে যায়। নজরুলের সাম্যবাদ তাই ‘বাংলায় অনুবাদ করা মার্ক্সবাদ’ নয়; এটি বাংলার সামাজিক বাস্তবতায় পুনর্গঠিত সাম্যবাদী কল্পনা।
নজরুলের দূরবর্তী আত্মীয়েরা
জোসে মার্তি, পাবলো নেরুদা, নিকোলাস গিয়েন, আইমে সেজার—তাদের প্রত্যেকের ইতিহাস নজরুলের ইতিহাস থেকে আলাদা। কিন্তু তারা প্রত্যেকেই এমন সাহিত্যিক ভূখণ্ডে কাজ করেছেন যেখানে সাম্রাজ্য, জাতীয়তা, শ্রেণি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় একে অন্যের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত।
মার্তির প্রশ্ন ছিল—কার আমেরিকা? নজরুলের প্রশ্ন—কার ভারত? নেরুদার কাব্যিক প্রকল্প—কার ইতিহাস? গিয়েনের প্রশ্ন—কার কণ্ঠ? সেজারের প্রশ্ন—উপনিবেশ মানুষকে কী করে? এই প্রশ্নগুলোকে পাশাপাশি রাখলে নজরুল বিশ্বসাহিত্যের একটি বৃহত্তর প্রতিরোধী ধারায় প্রবেশ করেন।
এখানে প্রভাবের সম্পর্ক খোঁজা জরুরি নয়। জরুরি হলো ঐতিহাসিক সাদৃশ্যের ভেতর পার্থক্যকে শুনতে শেখা। এটাই সাঈদের ‘কনট্রাপান্টা’ পদ্ধতির সৌন্দর্য।
নেরুদা ও নজরুল
পাবলো নেরুদার ‘কান্তো জেনেরাল’-এ লাতিন আমেরিকার ভূগোল, আদিবাসী ইতিহাস, শ্রম, বিজয় ও সাম্রাজ্য এক বৃহৎ কাব্যিক ইতিহাসে পরিণত হয়। নজরুলের ক্ষেত্রেও কবিতার কেন্দ্রে ক্রমশ উঠে আসে এমন মানুষ, যাদের প্রচলিত সাহিত্যিক অভিজাত সংস্কৃতি প্রায়ই উপেক্ষা করে।
কৃষক। মজুর। ক্ষুধার্ত। সর্বহারা। কারাবন্দী। পতিতা। নারী। ধর্মীয় প্রান্তিক মানুষ।
এখানে কবি ইতিহাসের পাঠ্যক্রম বদলাতে চান। রাজাদের ইতিহাসের পাশে শ্রমিকের ইতিহাস। বিজেতার ইতিহাসের পাশে পরাজিতের স্মৃতি। রাষ্ট্রের ইতিহাসের পাশে ক্ষুধার ইতিহাস। এই পাঠের ফলে কবিতা একটি বিকল্প আর্কাইভে পরিণত হয়।
ভাষার উপনিবেশমুক্তি
কিউবার নিকোলাস গিয়েন আফ্রো-কিউবান জীবন, সংগীত ও ছন্দকে কবিতার কেন্দ্রে এনেছিলেন। নজরুলের ভাষাতেও একই ধরনের এক বিস্ফোরণ ঘটে। আরবি-ফারসি শব্দ বাংলা কবিতায় নতুন শক্তি পায়। ইসলামী সংগীত ও গজল বাংলা গানের পরিসরকে বদলে দেয়। শাক্ত ও বৈষ্ণব সুরের সঙ্গে ইসলামী সুরের সংলাপ ঘটে। লোকসংস্কৃতি ও উচ্চাঙ্গ সংগীতের মধ্যে সেতু তৈরি হয়।
নজরুল বাংলা গানের বহু ধারাকে গ্রহণ করে সেগুলোকে উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ভিত্তির সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন এবং বাংলা গানের আধুনিকতার নতুন পরিসর তৈরি করেছিলেন। এটি কেবল সংগীতের বৈচিত্র্য নয়। এটি ভাষার ওপর ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস। কোন শব্দ ‘শুদ্ধ’? কোন সুর ‘উচ্চ’? কোন সংস্কৃতি ‘বাংলা’? নজরুল এসব প্রশ্নের প্রচলিত উত্তর মেনে নেননি। তার বাংলা একটি সংকর, বহুস্বরিক, চলমান বাংলা।
আইমে সেজার এবং মানুষের ‘বস্তু’ হয়ে যাওয়া
সেজারের ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে উপনিবেশিত মানুষকে মানবিক বিষয় থেকে বস্তুতে নামিয়ে আনার প্রক্রিয়া। নজরুলের কবিতায় শ্রমজীবী মানুষের উপস্থিতি এই ধারণাকে অন্য ভূগোলে পুনরায় হাজির করেন।
শ্রমিকের শরীর আছে, কিন্তু ক্ষমতা নেই। কৃষকের শ্রম আছে, কিন্তু জমির ওপর অধিকার নেই। দরিদ্রের ক্ষুধা আছে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব সীমিত। এই পরিস্থিতিতে ‘সাম্যবাদী’র মানুষ কোনো বিমূর্ত মানুষ নয়।
সে ঘামতে থাকা শরীর। সে ক্ষুধার্ত শরীর। সে প্রেম করতে চাওয়া শরীর। সে বিদ্রোহী শরীর। নজরুলের কবিতা এই শরীরকে আবার ইতিহাসের কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনে।
ল্যাংস্টন হিউজ: স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি এবং বাদ পড়া মানুষ
ল্যাংস্টন হিউজের কবিতায় মার্কিন স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের ঘোষণার পাশে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা দাঁড়িয়ে থাকে
এই দ্বৈততা নজরুলের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত স্বাধীন হবে—কিন্তু কারা স্বাধীন হবে? জাতীয় পতাকা উঠবে—কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষ কি খেতে পাবে? স্বাধীন রাষ্ট্র হবে—কিন্তু নারী কি স্বাধীন হবে? ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকবে—কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা কি থাকবে না? এই প্রশ্নগুলো নজরুলের সাহিত্যকে কেবল ব্রিটিশবিরোধী করে না; তাকে করে তোলে স্বাধীনতার সমালোচক। নজরুল স্বাধীনতা চান এবং একই সঙ্গে জিজ্ঞাসা করেন—স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতদূর পৌঁছেছে? এই দ্বৈত অবস্থানই তাকে আধুনিক কবি করে তুলে।
নারী—মাতৃভূমির প্রতীক থেকে জীবন্ত মানুষ
উপনিবেশবিরোধী জাতীয়তাবাদে ‘মাতৃভূমি’ একটি শক্তিশালী প্রতীক। কিন্তু এখানেই একটি প্রশ্ন জন্মায়— যে সমাজ দেশকে ‘মা’ বলে পূজা করে, সেই সমাজের নারীর বাস্তব স্বাধীনতা কতখানি? নজরুলের ‘নারী’ কবিতা এই দ্বন্দ্বের ভেতরে প্রবেশ করে। নারী কেবল জাতীয়তার প্রতীক নয়। সে ইতিহাসের নির্মাতা। সে শ্রমের অংশীদার। সে প্রেমের মানুষ। সে রাজনৈতিক সত্তা। এ কবিতার মধ্য দিয়ে নজরুলের সাম্যবাদ শ্রেণি ও ধর্মের বাইরে লিঙ্গের প্রশ্নে পৌঁছায়।
সাঈদের দৃষ্টিতে সাহিত্যকে পড়ার একটি শক্তি এখানেই—একটি পাঠ কেবল তার প্রকাশিত রাজনৈতিক বক্তব্যে থেমে থাকে না; বরং দেখতে হয় তার ভেতরে কোন কোন সামাজিক সম্পর্ক দৃশ্যমান, কোনগুলো অদৃশ্য, এবং কোনগুলো প্রতিরোধী কণ্ঠ হিসেবে ফিরে আসে।
নজরুলের ‘আমি’ এবং সাঈদের ‘নির্বাসিত বুদ্ধিজীবী’
নজরুল ও সাঈদের জীবনের মধ্যে একটি আকর্ষণীয় ধারণাগত সম্পর্ক তৈরি করা যাক।
সাঈদ নিজেকে প্রায়ই নির্বাসিত বা ‘এক্সাইল’-এর অবস্থান থেকে চিন্তা করেছেন। তাঁর কাছে নির্বাসন কেবল ভৌগোলিক বিচ্ছেদ নয়; এটি এমন এক সমালোচনামূলক অবস্থান, যেখান থেকে ব্যক্তি কোনো একক জাতীয় বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মধ্যে সম্পূর্ণভাবে স্থির হতে পারেন না।
নজরুল নির্বাসিত ছিলেন না; কিন্তু তার সাহিত্যিক অবস্থানও ছিল অস্বস্তিকরভাবে সীমান্তবর্তী। তিনি একসঙ্গে মুসলমান এবং বাঙালি। ভারতীয় এবং আন্তর্জাতিক। ধর্মীয় এবং ধর্মের সমালোচক। জাতীয়তাবাদী এবং শ্রেণিসচেতন লোকঐতিহ্যের কবি এবং আধুনিকতাবাদী। এই ‘মাঝখানে থাকা’ তাকে কখনো দুর্বল করেনি। বরং এটি তাকে দেখতে দিয়েছে একাধিক পৃথিবী একসঙ্গে।
নজরুলের সাহিত্য, একটি ‘কনট্রাপান্টাল’ পাঠ
সাঈদের পদ্ধতিতে নজরুলকে পড়লে তার প্রতিটি বড় রচনার মধ্যে একাধিক সুর শুনতে পাই।
‘বিদ্রোহী’তে—ব্যক্তির বিদ্রোহ + উপনিবেশিত জাতির বিদ্রোহ।
‘সাম্যবাদী’তে—শ্রেণিসংগ্রাম + মানবতাবাদ + ধর্মীয় বহুত্ব।
‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’-এ—জাতীয় সংকট + সাম্প্রদায়িক বিভাজনের বিরুদ্ধে সতর্কতা।
‘নারী’-তে—সাম্য + পিতৃতন্ত্রের প্রশ্ন।
‘ধূমকেতু’-তে—সাংবাদিকতা + বিপ্লব + ঔপনিবেশিক সেন্সরশিপ।
‘লাঙল’-এ—কৃষক + শ্রমিক + পূর্ণ স্বাধীনতা + শ্রেণিসমতা।
এই বহুস্বরিক পাঠ ছাড়া নজরুলের প্রকৃত রাজনৈতিক আধুনিকতা ধরা পড়ে না।
সাম্রাজ্যের বিপরীতে স্মৃতি
সাঈদের চিন্তায় স্মৃতি একটি রাজনৈতিক শক্তি। কারণ সাম্রাজ্য শুধু ভূখণ্ড দখল করে না; ইতিহাসের ব্যাখ্যাও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। নজরুলের সাহিত্য এই অর্থে স্মৃতির পুনর্দখল। তিনি ইসলামী ইতিহাসকে বাংলা কবিতায় ফিরিয়ে আনেন। তিনি হিন্দু পুরাণকে নতুন রাজনৈতিক অর্থে ব্যবহার করেন। তিনি কারবালাকে সমকালীন অন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত করেন। তিনি কৃষক ও শ্রমিকের জীবনকে সাহিত্যিক স্মৃতিতে স্থান দেন। অর্থাৎ তিনি এমন এক বাংলা সাংস্কৃতিক স্মৃতি নির্মাণ করেন যা কোনো একক ধর্মীয় বা ঔপনিবেশিক ইতিহাসের অধীন নয়।
এটি এক ধরনের ‘কাউন্টার-মেমরি’।
নজরুলকে কেন বিশ্বসাহিত্যে নতুনভাবে পড়া দরকার
নজরুলের আন্তর্জাতিকতা কোনো বিদেশি লেখকের সঙ্গে তার সরাসরি প্রভাবের সম্পর্ক দিয়ে প্রমাণ করতে হবে না। বরং তাকে এমন এক বিশ্বসাহিত্যিক মানচিত্রে স্থাপন করা দরকার যেখানে—
মার্তির কিউবা, নেরুদার চিলি, গিয়েনের কিউবা, সেজারের ক্যারিবীয় বিশ্ব, হিউজের আমেরিকা, ফ্যাননের আলজেরিয়া, এবং নজরুলের ভারত। একটি বৃহত্তর প্রতিরোধী কথোপকথনের মধ্যে প্রবেশ করে।
তারা একই কথা বলেন না। এবং ঠিক এই কারণেই তুলনাটি গুরুত্বপূর্ণ। তুলনামূলক সাহিত্য যদি কেবল ‘মিল’ খোঁজে, তবে তা দুর্বল হয়ে যায়। সাঈদীয় অর্থে শক্তিশালী তুলনামূলক পাঠ বরং মিল ও অমিলকে একই সঙ্গে ধরে। নজরুল নেরুদা নন। নজরুল মার্তি নন। নজরুল সেজার নন। কিন্তু তাদের সাহিত্য পরস্পরের কাছে প্রশ্ন নিয়ে যেতে পারে। এই প্রশ্নের আদানপ্রদানই বিশ্বসাহিত্য।
একটি কণ্ঠ, বহু প্রতিস্বর
এডওয়ার্ড সাঈদের আলোয় নজরুলকে পড়ার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো—তখন নজরুল আর কেবল ‘বিদ্রোহী কবি’ থাকেন না। তিনি হয়ে ওঠেন সাম্রাজ্য, সংস্কৃতি এবং প্রতিরোধের সংযোগস্থলে দাঁড়ানো এক সাহিত্যিক। তার জীবন একাধিক ভূগোল অতিক্রম করেছে। তার ভাষা একাধিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে একত্র করেছে। তার কবিতা একাধিক সামাজিক শ্রেণিকে কণ্ঠ দিয়েছে। তার রাজনীতি জাতীয় স্বাধীনতাকে সামাজিক সাম্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে। তার ধর্মচেতনা পরিচয়ের গণ্ডিকে অতিক্রম করেছে। তার সাংবাদিকতা মুদ্রিত শব্দকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করেছে। আর তার কারাবাস প্রমাণ করেছে—রাষ্ট্র যখন কবিতাকে ভয় পায়, তখন কবিতা আর কেবল নান্দনিক বস্তু থাকে না।
সাঈদের ‘কনট্রাপান্টা’ পাঠে আমরা জানতে পারি, একটি ইতিহাসের সঙ্গে আরেকটি ইতিহাসকে পাশাপাশি শুনতে। সাম্রাজ্যের সুরের সঙ্গে উপনিবেশিতের প্রতিসুর; বিজেতার ইতিহাসের সঙ্গে পরাজিতের স্মৃতি; রাজধানীর সঙ্গে উপনিবেশ; রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্দী; মালিকের সঙ্গে শ্রমিক; পুরুষের সঙ্গে নারী; ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে মানবিক পরিচয়।
নজরুলের সাহিত্য ঠিক এই বহুস্বরের সাহিত্য। তার ‘বিদ্রোহী’ একক কণ্ঠ নয়—তার মধ্যে বহু সভ্যতার প্রতিধ্বনি। তার ‘সাম্যবাদী’ শুধু শ্রেণির কবিতা নয়—তার মধ্যে ধর্ম, মানবতা ও সামাজিক ন্যায়ের বহু সুর। ‘ধূমকেতু’ শুধু ব্রিটিশবিরোধী সংবাদপত্র নয়—এটি মুদ্রিত জনপরিসরে সাম্রাজ্যের বৈধতার বিরুদ্ধে একটি পাল্টা-ভাষা। ‘লাঙল’ শুধু কৃষকের প্রতীক নয়—এটি ইতিহাসের মালিকানা পুনর্বণ্টনের কল্পনা। এবং নজরুলের জীবন—শুধু একজন কবির জীবন নয়; এটি উপনিবেশিত বাংলার মধ্য দিয়ে একজন মানুষের ক্রমাগত সীমানা অতিক্রমের ইতিহাস। এই কারণেই নজরুলকে বিশ্বসাহিত্যের কেন্দ্রে বসানোর জন্য ইউরোপীয় কোনো অনুমোদনের দরকার নেই। বরং নজরুলকে পড়লে আমাদের বিশ্বসাহিত্যের ধারণাটিই পুনর্গঠন করতে হয়। তখন বিশ্বসাহিত্য আর কেবল লন্ডন, প্যারিস, রোম বা নিউইয়র্কের সাহিত্য নয়। বিশ্বসাহিত্য হয়ে ওঠে চুরুলিয়া, কলকাতা, কায়রো, হাভানা, সান্তিয়াগো, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ, আলজিয়ার্স, ঢাকা—অসংখ্য ইতিহাসের পরস্পরকে শোনা।
সেই বৃহত্তর ভূগোলে নজরুলের কণ্ঠ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিস্বর— “মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই।”
এই একটি বাক্যেই তার কবিতা সাম্রাজ্যকে অস্বীকার করে, ধর্মীয় একচেটিয়াতাকে অস্বীকার করে, শ্রেণিগত অহংকারকে অস্বীকার করে, সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে অস্বীকার করে। আর শেষ পর্যন্ত এটাই নজরুলের সবচেয়ে বড় সাহিত্যিক বিপ্লব।তিনি স্বাধীনতার জন্য কেবল একটি দেশকে কল্পনা করেননি। তিনি কল্পনা করেছিলেন—একটি মুক্ত মানুষ। আর সেই মানুষকে কল্পনা করার মুহূর্তেই তার কবিতা বাংলা থেকে বিশ্বসাহিত্যের দিকে যাত্রা শুরু করে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









