নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের (সোনারগাঁও জাদুঘর) ঐতিহাসিক বড় সরদার বাড়ির বাণিজ্যিক ব্যবহার ও ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগসহ প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত, কারুপল্লীতে প্রকৃত কারুশিল্পীদের বঞ্চনা ও দোকান বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ‘সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটি’।
শনিবার (২৯ আগস্ট) নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন 'সোনারগাঁয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ কমিটি'র আহ্বায়ক কবি ও প্রাবন্ধিক শাহেদ কায়েস, বক্তব্য রাখেন চিত্রশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বি, অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক কবি রহমান মুজিব, নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোট-এর সহ-সভাপতি ধীমান সাহা জুয়েল, সোনারগাঁও সাহিত্য নিকেতন-এর শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক লেখক মোয়াজ্জেনুল হক।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দীর্ঘদিন জরাজীর্ণ অবস্থায় থাকা বড় সরদার বাড়ির পুনরুদ্ধার কাজ ২০১২ সালে শুরু হয়ে ২০১৭ সালে শেষ হয়। ২০১৮ সালে ভবনটি দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। সম্প্রতি চার দিনের জন্য ‘কোক স্টুডিও বাংলা সিজন ৪’-এর ভিডিও ধারণ ও কোকা-কোলার বিজ্ঞাপন তৈরির কাজে ঐতিহাসিক ভবনটি ব্যবহার করা হয়। এ সময় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটর, ভারী ক্যামেরা, আলোকসজ্জা ও সাউন্ড সিস্টেমসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণে ভবনটির ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
শুটিংয়ের পর ভবনের দেয়াল, অলংকরণ ও নকশার বিভিন্ন স্থানে ক্ষয়ক্ষতি এবং দ্বিতীয় আঙিনার কাছে একটি অংশ ভেঙে যাওয়ার অভিযোগ তুলে সংগঠনটি জানতে চায়, শুটিংয়ের আগে হেরিটেজ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট করা হয়েছিল কি না এবং প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় মতামত ও অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না। শুটিংয়ের অনুমোদন, আর্থিক লেনদেন এবং ভবনের শুটিং-পূর্ব ও পরবর্তী অবস্থার নথিও প্রকাশের দাবি জানানো হয়। কারুপল্লীর দোকান বরাদ্দ নিয়েও অভিযোগ তোলা হয়। সংগঠনটি জানায়, প্রকৃত কারুশিল্পীদের দোকান পেছনের দিকে রাখা হলেও এক নম্বর গেট ও পার্কিংয়ের পাশে অর্থের বিনিময়ে কিছু ব্যক্তিকে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, যাদের অনেকেই প্রকৃত কারুশিল্পী নন। দোকান বরাদ্দের নীতিমালা, বরাদ্দপ্রাপ্তদের পরিচয় ও আর্থিক লেনদেন তদন্তের দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ফাউন্ডেশনের পরিচালক কাজী মাহবুবুল আলম, সহকারী পরিচালক মো. সাখাওয়াত হোসেন, গাইড লেকচারার আশরাফুল আলম নয়ন এবং প্রকৌশলী হানিফ আহমেদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতির অভিযোগও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে উন্মুক্ত টেন্ডার ছাড়া প্রায় অর্ধকোটি টাকার অনুষ্ঠান আয়োজন, ভুয়া বিল ও চেকের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ, অনুমোদন ছাড়া তিন কোটি টাকার বেশি ব্যয়, নির্মাণ ও মেরামতে অতিরিক্ত বিল এবং শ্রমিক ও কাঁচামালের নামে ভুয়া বিল তৈরির অভিযোগ রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে ১২ দফা দাবি জানানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে ফাউন্ডেশনের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিচার বিভাগীয় বা সমপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত, বড় সরদার বাড়িতে বাণিজ্যিক শুটিংয়ের অনুমোদন ও আর্থিক লেনদেনের নথি প্রকাশ, শুটিং বাবদ অর্থের নিরীক্ষা এবং স্বাধীন সংরক্ষণ স্থপতি ও প্রত্নসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে ভবনটির জরুরি কারিগরি পরিদর্শন। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থাপনা ও ঐতিহাসিক ভবনে বাণিজ্যিক শুটিং, বিজ্ঞাপন ও ভারী সরঞ্জাম ব্যবহারের আগে হেরিটেজ ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট বাধ্যতামূলক করা, বিভিন্ন নির্মাণ ও ক্রয়সংক্রান্ত ব্যয়ের বিশেষ নিরীক্ষা, দোকান বরাদ্দের নথি প্রকাশ এবং প্রকৃত কারুশিল্পীদের সুবিধাজনক স্থানে দোকান দেওয়ার দাবি জানানো হয়। তদন্তে কেউ দায়ী সাব্যস্ত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সরকারি অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকলে তা পুনরুদ্ধারের দাবিও জানায় সংগঠনটি।
সংবাদ সম্মেলনে রফিউর রাব্বি বলেন, ঐতিহাসিক সোনারগাঁ জাদুঘর ও বড় সর্দারবাড়ির গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সময়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের অবহেলা ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে এর ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি ঐতিহাসিক জাদুঘর বাণিজ্যিক কাজে ভাড়া দিয়ে সেখানে স্টুডিও নির্মাণ, শুটিং ও ভারী স্থাপনা বসানোর ঘটনায় বড় সর্দারবাড়ির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি এবং অনুমতি দেওয়া হয়ে থাকলে তার কারণ প্রকাশের আহ্বান জানান। বড় সর্দারবাড়ির ক্ষতি ও সংশ্লিষ্ট অনিয়মের অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন তদন্ত সংস্থা গঠনের দাবি জানান তিনি।
শাহেদ কায়েস বলেন, তাদের এই উদ্যোগ কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রকৃত কারুশিল্পী এবং জনগণের সম্পদ রক্ষার জন্য। বড় সরদার বাড়ির ক্ষতি হলে তা পুনরায় নির্মাণ করে শত শত বছরের ইতিহাস ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। একইভাবে প্রকৃত কারুশিল্পীদের বঞ্চিত রেখে দেশের লোক ও কারুশিল্পের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা কঠিন। সোনারগাঁয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ রক্ষায় গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, সংস্কৃতিকর্মী, প্রত্নতত্ত্ববিদ, স্থপতি, গবেষক, কারুশিল্পী ও সচেতন নাগরিকদের পাশে থাকার আহ্বান জানানো হয় সংবাদ সম্মেলন থেকে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









