একটি ভ্যানই ছিল পরিবারের আয়ের প্রধান ভরসা। সেই ভ্যানটি হারিয়ে রাস্তার পাশে অসহায়ের মতো কাঁদছিল মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী রেজওয়ান রহমান (১৩)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই কান্নার দৃশ্য এবার বদলে গেছে হাসিতে। মানবিক উদ্যোগে রেজওয়ানের পরিবারের হাতে ইউএনও তুলে দিয়েছেন একটি নতুন ব্যাটারিচালিত ভ্যান। পাশাপাশি তার পড়াশোনার দায়িত্বও নিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইটস হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নীলফামারীর সৈয়দপুর পৌর কমিউনিটি চত্বরে রেজওয়ানের বাবা ওলিয়ার রহমান ও মা লায়লা বেগমের হাতে নতুন ভ্যানটি তুলে দেন সৈয়দপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌরসভার প্রশাসক ফারাহ ফাতেহা তাকমিলা। এ সময় পরিবারের জন্য খাদ্যসামগ্রী ও শিক্ষাসামগ্রীও দেওয়া হয়।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৭ আগস্ট। বাবার অসুস্থতার কারণে পরিবারের জীবিকার তাগিদে রিকশাভ্যান নিয়ে বের হয়েছিল সপ্তম শ্রেণির ছাত্র রেজওয়ান। তারাগঞ্জ হাট থেকে দুই যাত্রী তাকে সৈয়দপুরে যাওয়ার কথা বলে ভাড়া করে। ৫০০ টাকা ভাড়ার প্রস্তাবে রাজি হয়ে তাদের নিয়ে সৈয়দপুরে আসে সে।
সৈয়দপুরে পৌঁছানোর পর দুই যাত্রী কিছু কেনাকাটার কথা বলে রেজওয়ানকে সঙ্গে নিয়ে ফেরার কথা জানায়। এক পর্যায়ে তার হাতে ৫০ টাকার নোট দিয়ে পান আনতে পাঠানো হয়। পান নিয়ে ফিরে এসে রেজওয়ান দেখতে পায়, সেখানে আর ভ্যানটি নেই। পরিবারের একমাত্র উপার্জনের মাধ্যম হারিয়ে সেখানেই কান্নায় ভেঙে পড়ে শিশুটি।
রেজওয়ানের সেই কান্নার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নজরে আসে ইউএনও ফারাহ ফাতেহা তাকমিলার। তিনি পুলিশকে ভ্যান উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি রেজওয়ানকে নতুন ভ্যান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবে রূপ নেয় বুধবার। প্রায় ৬৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি নতুন ব্যাটারিচালিত ভ্যান তুলে দেওয়া হয় রেজওয়ানের পরিবারের হাতে। সঙ্গে দেওয়া হয় ৪০ কেজি চাল, ৫ কেজি সয়াবিন তেল, দুটি কম্বল, তৈজসপত্র, স্কুলব্যাগ ও জুতা। ভ্যান ও অন্যান্য সামগ্রী অনুদানে ইউএনও এর পাশাপাশি সার্বিক সহযোগিতা করেন ইটস হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আদনান হোসেন।
তবে নতুন ভ্যান হাতে পেলেও রেজওয়ানকে আর ভ্যান চালাতে হবে না। ইউএনওর পক্ষ থেকে তার বাবা-মাকে বলা হয়েছে, ছেলের হাতে যেন ভ্যানের চাবি না দেওয়া হয়। পরিবারের জীবিকার জন্য ভ্যানটি চালাবেন তার বাবা অথবা ভাড়া দিবেন আর রেজওয়ানের দায়িত্ব হবে পড়াশোনা করা।
এ উদ্যোগে আর্থিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইটস হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন।
সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক মো. আদনান হোসেন জানান, প্রায় ৬৫ হাজার টাকা খরচে উন্নতমানের ব্যাটারি চালিত নতুন ভ্যান তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া রেজওয়ানের পড়াশোনার সম্পূর্ণ দায়িত্বও তারা নিয়েছেন। সংগঠনটি দীর্ঘদিন ১৬ বছর ধরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
ইউএনও ফারাহ ফাতেহা তাকমিলা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রেজওয়ানের কান্নার দৃশ্য দেখে তিনি আবেগাপ্লুত হন। শিশুটির পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়, সে বিষয়টিকেই তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এজন্য রেজওয়ানের বাবা-মাকে ছেলের হাতে ভ্যানের চাবি না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভ্যানটি তার বাবা চালাবেন, রেজওয়ান মনোযোগ দেবে পড়াশোনায়।
রেজওয়ান নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার বাহাগিলি ইউনিয়নের ময়নাগুড়ি দাখিল মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
ভ্যান চুরির কিছুদিন আগেই তার বোন জামাই একটি দুর্ঘটানা মারা যায়। তাদের পরিবারটি খুব অভাবী। নতুন ভ্যান পাওয়ার পর আনন্দে মুখে হাসি ফুটেছে তার। যে শিশুটি কয়েকদিন আগেও নিজের পরিবারের একমাত্র উপার্জনের অবলম্বন হারিয়ে কাঁদছিল, এবার সেই শিশুটির সামনে খুলে গেল আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









