১ সেপ্টেম্বর অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হলো বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠার পর দলটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ, সংঘাতময় ও ঘটনাবহুল পথ অতিক্রম করেছে। এই সময়ে বিএনপি কখনো রাষ্ট্রক্ষমতায়, কখনো প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে, কখনো বা রাজপথের দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছে। তাই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু একটি দলের সাংগঠনিক কর্মসূচি নয়; এটি দলটির রাজনৈতিক ভূমিকা, অর্জন, সীমাবদ্ধতা এবং বর্তমান সরকারের কর্মক্ষমতা মূল্যায়নেরও সুযোগ।
বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এর সঙ্গে বহুদলীয় গণতন্ত্র, জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণাও যুক্ত। প্রতিষ্ঠার সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতায় দলটি বহুদলীয় রাজনীতির একটি নতুন পরিসর তৈরি করেছিল। তবে এটিও ইতিহাসের অংশ, বিএনপির জন্ম হয়েছিল ১৯৭৫-পরবর্তী সামরিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে।
ফলে, দলটির গণতান্ত্রিক ভূমিকা মূল্যায়নে তার প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বিবেচনায় নিতে হবে। বিএনপির নিজস্ব ইতিহাস-বয়ানেও ১৯৭৮ সালের প্রতিষ্ঠাকে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনর্প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী গণভিত্তিক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়।
আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য দলের সঙ্গে বিএনপির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতন এবং গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বিএনপির অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনর্প্রতিষ্ঠায় বিএনপি নেতৃত্ব দেয়। পরবর্তী রাজনৈতিক সংকটের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের ইতিহাসে এসব অধ্যায় বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবদান।
কিন্তু ইতিহাস কখনো একপাক্ষিক নয়। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বিএনপির জন্য বড় রাজনৈতিক বৈধতার সংকট তৈরি করেছিল। বিরোধী আন্দোলনের মুখে সেই ব্যবস্থা টেকেনি। ২০০১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসে। ওই সময়ে অর্থনীতি, কৃষি, অবকাঠামো ও বেসরকারি খাতে কিছু উদ্যোগ থাকলেও দুর্নীতি, রাজনৈতিক সহিংসতা, জঙ্গিবাদ ও প্রশাসনের দলীয়করণ নিয়ে গুরুতর সমালোচনা তৈরি হয়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা তৎকালীন সরকারের ভাবমূর্তিকে আরো গভীর সংকটে ফেলে।
রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা সরকারের জন্য এমন একটি ভয়াবহ ঘটনার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এরপর বিএনপি প্রবেশ করে দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতির অধ্যায়ে। নির্বাচনকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও ভোটাধিকারের প্রশ্নে দলটি আন্দোলন করেছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির অবস্থান নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে। তবে হরতাল, অবরোধ, সহিংসতা এবং নির্বাচন বর্জনের মতো কৌশলও দলটির আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। গণতন্ত্রের দাবি তখনই নৈতিক শক্তি পায়, যখন সেই দাবির পদ্ধতিও গণতান্ত্রিক থাকে।
তারপরও বিএনপির দীর্ঘ বিরোধী রাজনৈতিক অধ্যায়কে শুধু ব্যর্থতার ইতিহাস বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। মামলা, গ্রেপ্তার, দমন-পীড়ন, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং রাষ্ট্রীয় চাপের অভিযোগের মধ্যেও দলটি রাজনীতির মাঠে টিকে থেকেছে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে গেছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এই অধ্যায়ও গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আনে। সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। প্রায় দুই দশক পর ক্ষমতায় ফেরা বিএনপির জন্য বড় রাজনৈতিক অর্জন। কিন্তু এখানেই শুরু হয়েছে তার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। কারণ, বিরোধী দলে থাকা আর সরকার পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। বিরোধী দল সরকারের ব্যর্থতা চিহ্নিত করে; সরকারকে সেই ব্যর্থতার সমাধান করতে হয়। বিরোধী দল প্রতিশ্রুতি দেয়; সরকারকে তার মূল্য দিতে হয়। বিরোধী দল প্রশ্ন তোলে; সরকারকে জবাব দিতে হয়।
প্রথম ১৮০ দিনে বিএনপি সরকারের কিছু উদ্যোগ অবশ্যই আশাব্যঞ্জক। সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘ফার্মার কার্ড’, কৃষিঋণ সুবিধা, খাদ্য মজুত বৃদ্ধি, খাল পুনর্খনন কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মতো উদ্যোগ সরকারের কর্মপরিকল্পনায় এসেছে। অর্থনীতিতেও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহে কিছু ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে।
কিন্তু সরকারের সাফল্য কর্মসূচির সংখ্যা দিয়ে মাপা যাবে না; মাপতে হবে মানুষের জীবনে তার প্রভাব দিয়ে। বাজারে দ্রব্যমূল্য কমেছে কিনা, কর্মসংস্থান বেড়েছে কিনা, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে কিনা, আইনশৃঙ্খলা উন্নত হয়েছে কিনা, বিনিয়োগের পরিবেশ ফিরেছে কিনা- সাধারণ মানুষের কাছে এগুলোই সরকারের সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি।
এই জায়গাতেই বিএনপি সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। মূল্যস্ফীতি, দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যাংক খাতের সংকট, কম বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ঘাটতি এখনো অর্থনীতির বড় সমস্যা। আইনশৃঙ্খলা ও জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়েও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। স্বাস্থ্য খাতে হাম, টিকাদান কর্মসূচির দুর্বলতা এবং ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের অভাব প্রশ্ন তুলেছে রাষ্ট্রের জনসেবা সক্ষমতা নিয়ে। প্রশাসনিক সমন্বয়, রাজনৈতিক নিয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়েও সরকারকে সতর্ক হতে হবে।
এখানে বিএনপির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো- ক্ষমতার পরিবর্তন আর রাষ্ট্র পরিচালনার পরিবর্তন এক নয়। জনগণ শুধু নতুন মুখ, নতুন মন্ত্রী কিংবা নতুন স্লোগান চায় না; তারা পুরনো রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কৃতির পরিবর্তন চায়। তারা চায় দুর্নীতি কমুক, প্রশাসন দলীয় আনুগত্যের বদলে নাগরিকের প্রতি দায়বদ্ধ হোক, বাজার সিন্ডিকেট ভাঙুক, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক এবং রাজনৈতিক পরিচয় যেন কারো অধিকার নির্ধারণের মাপকাঠি না হয়।
জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা আরো গভীর। তারা শুধু সরকার পরিবর্তন করেনি; রাষ্ট্রের চরিত্র ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ করেছে। বিএনপির সামনে এখন সেই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে জনগণের হতাশা শুধু সরকারের বিরুদ্ধে যাবে না, বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের দাবিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলবে।
বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ তাই বিরোধী দলের সমালোচনা নয়; ক্ষমতার পুরনো সংস্কৃতিতে ফিরে যাওয়া। দলীয়করণ, প্রশাসনে আনুগত্য, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি অসহিষ্ণুতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার এবং নেতা-কর্মীদের অনিয়ন্ত্রিত দাপট- এসব যদি আবার ফিরে আসে, তাহলে পরিবর্তনের যে স্বপ্ন নিয়ে মানুষ নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু করেছে, তা দ্রুতই ভেঙে পড়তে পারে।
৪৮ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বিএনপিকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। এখন প্রশ্ন, দলটি সেই শিক্ষা কাজে লাগাতে পারবে কিনা। যে দল দীর্ঘদিন গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করেছে, তাকে এখন প্রমাণ করতে হবে- গণতন্ত্র তার কাছে শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি নয়, ক্ষমতা ব্যবহারের নীতিও। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার রক্ষা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং সংসদের কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করেই সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- দলটি কতবার ক্ষমতায় এসেছে তা নয়; এবার ক্ষমতায় এসে কী করেছে, সেটিই।
আন্দোলনের রাজনীতি থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার রাজনীতিতে উত্তরণই বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা কিংবা প্রশাসনকে জনবান্ধব করা- এসব ব্যর্থ হলে কোনো রাজনৈতিক সাফল্যের গল্পই জনগণের কাছে টিকবে না।
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস বিএনপির ৪৮ বছরকে বিচার করবে না শুধু তার অতীতের আন্দোলন দিয়ে। বিচার করবে এই প্রশ্নে- দীর্ঘ সংগ্রামের পর যখন রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ এলো, তখন বিএনপি কি ক্ষমতার চরিত্র বদলাতে পেরেছিল?
ক্ষমতায় আসা ছিল বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি অর্জন। কিন্তু ক্ষমতাকে জনগণের অধিকার, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারাই হবে তার প্রকৃত বিজয়।
লেখক : অধ্যাপক, কবি ও কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









