চাঁপাইনবাবগঞ্জে টানা কয়েক দিন পানি বাড়ার পর অবশেষে পদ্মা নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। বিগত ১২ ঘণ্টায় পাঙ্খা পয়েন্টে পদ্মার পানি ৬ সেন্টিমিটার কমেছে। এতে নদীতীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলের মানুষের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরলেও জেলার মহানন্দা ও পুনর্ভবা নদীর পানি এখনো বাড়ছে। ফলে বন্যা পরিস্থিতির সামগ্রিক উন্নতি হলেও নিম্নাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ এখনো কাটেনি।
রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) সকালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত পাঙ্খা পয়েন্টে পদ্মার পানি ৬ সেন্টিমিটার কমেছে। বর্তমানে সেখানে পানির উচ্চতা ২১ দশমিক ৭৩ মিটার। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ২২ দশমিক ০৫ মিটার হওয়ায় পানি বিপৎসীমার ৩২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর আগের দিন পানির উচ্চতা ছিল ২১ দশমিক ৭৯ মিটার।
পানি কমার এই প্রবণতাকে স্বস্তির খবর হিসেবে দেখছেন নদীপাড়ের বাসিন্দারা। কারণ এর আগে টানা প্রায় ১০ দিন পদ্মার পানি বাড়ছিল। ৭ সেপ্টেম্বর পাঙ্খা পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ২১ দশমিক ৩২ মিটার। এরপর কয়েক দিনে তা ধাপে ধাপে বেড়ে ১১ সেপ্টেম্বর ২১ দশমিক ৭৬ মিটারে পৌঁছায়। অর্থাৎ পাঁচ দিনে পানি বেড়েছিল ৪৪ সেন্টিমিটার। এরপর প্রথমবারের মতো পানি কমার তথ্য পাওয়া গেল।
তবে পদ্মার পানি কমলেও জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি এখনো স্বস্তিদায়ক নয়। বিগত ২৪ ঘণ্টায় মহানন্দা নদীর পানি ৩ সেন্টিমিটার এবং পুনর্ভবা নদীর পানি ৪ সেন্টিমিটার বেড়েছে। ফলে একটি নদীতে পানি কমলেও অন্য দুই নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে নিম্নাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা ও শিবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ পরিবার এখনো পানিবন্দি রয়েছে। এর মধ্যে অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে তুলনামূলক উঁচু ও নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। আবার অনেক পরিবার এখনো বসতঘরেই অবস্থান করছে। কোথাও কোথাও ঘরের ভেতর হাঁটুপানি থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে।
পানিবন্দি মানুষের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে রান্না, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। দীর্ঘ সময় পানির মধ্যে থাকার কারণে দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন দিনমজুর ও নিম্নআয়ের অনেক মানুষ। ফলে পানি কিছুটা কমলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক দুর্ভোগ দ্রুত কমার সুযোগ নেই।
শনিবার জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে ৪ হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি থাকার তথ্য পাওয়া যায়। ফলে এক দিনের ব্যবধানে পানির পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা এখনো কয়েক হাজারে রয়েছে।
বন্যার পানি বসতবাড়ির পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও ঢুকে পড়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিকল্প স্থানে পাঠদান চালানোর চেষ্টা করলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
ফলে পানিবন্দি এলাকার শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে অংশ নিতে পারছে না। পানি না কমা পর্যন্ত এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এর আগে নদীর পানি বৃদ্ধির সময় জেলার নিম্নাঞ্চলের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্লাবিত হওয়ার খবরও পাওয়া যায়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা ও শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মারুফ আফজাল রাজন ও মাজহারুল ইসলাম জানান, চলতি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার গুলোকে ১০কেজি ১৫ কেজি ও ২০ কেজি করে চাউল বিতরণ অভ্যাহত রয়েছে। এছাড়া দু উপজেলায় মেডিকেল টিম কাজ করছেন।

নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে জেলার নিম্নাঞ্চলের কৃষিজমিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় রোপা আমনসহ মৌসুমি ফসলের জমিতে পানি ঢুকে পড়েছে। নিম্নাঞ্চলে পানি দীর্ঘস্থায়ী হলে এসব ফসলের ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। পানি কমতে শুরু করায় কৃষকেরা কিছুটা আশার আলো দেখলেও মাঠের পানি পুরোপুরি নেমে না যাওয়া পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে না।
পানিবন্দি মানুষের দুর্ভোগ কমাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। শিবগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দুই দিনে পানিবন্দি মানুষের মধ্যে প্রায় ২৬ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি খাবার স্যালাইন ও শুকনা খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
বন্যার পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সরিয়ে নিতে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে রোববার পর্যন্ত কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে অবস্থান নেয়নি বলে জানিয়েছেন উপজেলা প্রশাসন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবীব বলেন, পদ্মা নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। আশা করা হচ্ছে, রবিবার থেকে পদ্মার পানি ধারাবাহিকভাবে কমবে। বড় ধরনের বন্যার শঙ্কা নেই।
তবে জেলার অন্য দুই নদী মহানন্দা ও পুনর্ভবার পানি বাড়তে থাকায় নিম্নাঞ্চলের মানুষের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের ১৩ সেপ্টেম্বরের পূর্বাভাসে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকার পানি কমার প্রবণতার কথা বলা হলেও উত্তরাঞ্চলের রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের কিছু এলাকায় আগামী কয়েক দিনে নদীর পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি যাওয়ার এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে।
অর্থাৎ পদ্মার পানি ৬ সেন্টিমিটার কমে আপাতত স্বস্তির বার্তা দিলেও মহানন্দা ও পুনর্ভবার পানি বৃদ্ধি, পানিবন্দি কয়েক হাজার পরিবার, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিজমি ও ব্যাহত শিক্ষা কার্যক্রমের কারণে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতিকে এখনই পুরোপুরি স্বাভাবিক বলা যাচ্ছে না। নদীগুলোর পানি আরও কমলে তবেই নিম্নাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ স্থায়ীভাবে কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









