নীল আকাশের বুকে ধবধবে সাদা মেঘের তুলোখেলা আর দিগন্তজোড়া সবুজ পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ভেসে যাওয়া রূপালী ক্যানভাস। শরতের আগমনী বার্তায় প্রকৃতির এমন স্বর্গীয় রূপ এখন সীতাকুণ্ডের আকাশে। বছরের অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে শরতের শুরুতেই যেন এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কয়েক গুণ বেড়ে যায়। উঁচু পাহাড়, বিশাল সমুদ্র আর তার মাঝখানে মেঘ-রোদ্দুরের এই খেলায় মেতে উঠেছে পুরো সীতাকুণ্ড। প্রতিদিনই প্রকৃতিপ্রেমী ও স্থানীয় মানুষ স্তব্ধ হয়ে দেখছেন সীতাকুণ্ডের আকাশের এই অসাধারণ মোহনীয় রূপ।
সীতাকুণ্ডের ভৌগোলিক অবস্থান একে এমনিতেই অন্যান্য অঞ্চল থেকে আলাদা করেছে। একদিকে বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি আর অন্যদিকে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের সুবিশাল বিস্তার। শরৎকালে এই পাহাড় এবং সমুদ্রের মধ্যবর্তী আকাশে ভেসে বেড়ায় শত শত মেঘের ভেলা। কখনো তুলার মতো ছোট ছোট মেঘ দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে, আবার কখনো পাহাড়ের চূড়াকে ছুঁয়ে যায় গাঢ় মেঘের স্তর। রোদের সোনালী আলো যখন ওই মেঘের খাঁজে পড়ে, তখন পুরো সীতাকুণ্ড এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। বিকেলের সূর্য যখন ধীরে ধীরে সমুদ্রের কোলে ঢলে পড়ে, তখন পাহাড় আর মেঘের আড়ালে আলো-ছায়ার এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর পরিবেশ তৈরি হয়।
উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ও গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত এলাকা এবং চন্দ্রনাথ পাহাড়ের শীর্ষদেশ থেকে শরতের এই মেঘের রূপ সবচেয়ে স্পষ্ট ও আকর্ষণীয় দেখায়। প্রতিদিন শেষ বিকেলে এসব স্থানে ভিড় জমাচ্ছেন অসংখ্য কৌতূহলী মানুষ। বিশেষ করে তরুণেরা প্রকৃতির এই অনন্য মুহূর্তগুলোকে ক্যামেরাবন্দি করতে ছুটে যাচ্ছেন উঁচু পাহাড়ে কিংবা সমুদ্রের পাড়ে। প্রকৃতি যেন প্রতিদিন নতুন এক ক্যানভাস এঁকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে দর্শনার্থীদের।
শরতের এই মেঘের রূপ দেখে মুগ্ধতা প্রকাশ করে স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা আলহাজ্ব আবুল কালাম বলেন, "আমি দীর্ঘ চার দশক ধরে সীতাকুণ্ডেই বসবাস করছি, কিন্তু প্রতি বছর শরতের আগমন ঘটে সম্পূর্ণ নতুন রূপ নিয়ে। পাহাড়ের চূড়ায় যখন সাদা মেঘের দল থমকে দাঁড়ায়, তখন মনে হয় যেন মেঘের দেশে হারিয়ে গেছি। বিকেলের নরম আলো আর সমুদ্রের ঠাণ্ডা বাতাসের সাথে এই মেঘের সৌন্দর্য সীতাকুণ্ডকে একদম স্বর্গের মতো বানিয়ে দেয়। এই সৌন্দর্য শুধু চোখে দেখেই উপলব্ধি করা যায়, মুখে বলে বোঝানো কঠিন।"
স্থানীয় তরুণ ও চিত্রগ্রাহক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, "সীতাকুণ্ডে সারা বছরই ছবি তোলার মতো সৌন্দর্য থাকে, তবে শরতের এই সময়টা একেবারেই আলাদা। বিশেষ করে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের সময় আকাশের রঙ যেভাবে পাল্টায় এবং মেঘের বিন্যাস যেভাবে বদলায়, তা যেকোনো আলোকচিত্রীর জন্য স্বপ্নের মতো। পাহাড়ের গায়ে মেঘ জমে থাকার দৃশ্যগুলো ক্যামেরাবন্দি করতে প্রতিদিন আমরা বিভিন্ন পয়েন্টে চলে যাই।"
সীতাকুণ্ডের এই প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এবং শরতের সৌন্দর্য নিয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: ফখরুল ইসলাম বলেন, "সীতাকুণ্ড হলো প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য ভূস্বর্গ। পাহাড়, সমুদ্র এবং শরতের মেঘের এই ত্রিবেণী সঙ্গম সীতাকুণ্ডের পরিবেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আমরা লক্ষ্য করছি শরতের এই সময়ে পরিবেশ উপভোগ করতে প্রচুর মানুষ বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে যাচ্ছেন। প্রকৃতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে দর্শনার্থীরা যাতে নিরাপদে এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন, সে জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক নজরদারি রয়েছে।"
তিনি আরও বলেন, "সীতাকুণ্ডের এই প্রাকৃতিক সম্পদ ও সৌন্দর্য আমাদের অহংকার। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি যারা এই রূপ উপভোগ করতে আসছেন, সকলের প্রতি অনুরোধ থাকবে যেন পরিবেশের কোনো ক্ষতি না হয়। এই প্রাকৃতিক রূপ ও পরিচ্ছন্নতা ধরে রাখা আমাদের সকলের দায়িত্ব।"
শরতের আকাশে এই অপরূপ মেঘের মেলা সীতাকুণ্ডের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় নিয়ে এসেছে একধরনের প্রশান্তি। ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি ভুলে স্থানীয় মানুষও বিকেলের কিছুটা সময় খোলা আকাশের নিচে কাটাচ্ছেন। প্রকৃতির এই অনাবিল সৌন্দর্য মানুষের মনকে যেন নতুন উদ্যমে ভরিয়ে দিচ্ছে। পাহাড় আর সমুদ্রের সীমানায় শরতের আকাশের এই মুক্ত রূপকাব্য উপভোগ করতে আগামী দিনগুলোতে সীতাকুণ্ডে প্রকৃতির সমঝদারদের আনাগোনা আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









